সূর্য পাটে বসল। সমুদ্রের বুকে নেমে এলো আলো-আঁধারি। এবার ঝড়ের তাণ্ডব অনেকাংশে কমে গেল। সমুদ্রও শান্ত-স্বাভাবিক হয়ে এলো।
আমরা নতুন করে আশার আলো দেখতে লাগলাম।
রাত আটটায় আকাশ মেঘমুক্ত হল। চাঁদ দেখা দিল। ভাগ্য সামান্য সুপ্রসন্ন হওয়ায় আমাদের মনে খুশির জোয়ার দেখা দিল।
অস্বাভাবিক পরিশ্রমের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় নৌকাটাকে মেরামত করা সম্ভব হল। এবার জাহাজের সব কর্মচারী আর বেশিরভাগ যাত্রীকে তাতে তুলে সেটাকে ছেড়ে দেওয়া হল।
নৌকার যাত্রীরা বহু কষ্ট স্বীকার করে তিনদিন ক্রমাগত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ওক্লাকোক খাড়িতে উপস্থিত হল।
জাহাজের পিছনে বাঁধা ছোট্ট নৌকাটা সম্বল করে ক্যাপ্টেন চৌদ্দজন যাত্রীকে নিয়ে তাতে রয়ে গেলেন। বহু কষ্টে সেটাকে সমুদ্রে ভাসানো সম্ভব হল। পানিতে নামিয়ে দেওয়া মাত্র নৌকাটা যে তলিয়ে গেল না সেটাকে অলৌকিক ব্যাপার ছাড়া আর কী-ই বা বলা যেতে পারে?
যা-ই হোক, ছোট নৌকাটায় আশ্রয় নিয়েছেন, ক্যাপ্টেন আর তাঁর সহধর্মিণী, দলবলসহ আমার বন্ধুবর মি. ওয়াট, আমি নিজে, চারজন ছেলে-মেয়ে নিয়ে একজন মেক্সিকান অফিসার আর তার সহধর্মিনী আর একজননিগ্রো খানসামা।
অত্যাবশ্যক কিছু যন্ত্রপাতি, কিছু খাদ্যবস্তু, পিঠের ওপর পোশাক-পরিচ্ছদের গাড়ি নিয়ে বসে থাকার জায়গা ছাড়া নৌকটায় আর জায়গা ছিল না। এ ছাড়া অন্য কিছু রক্ষা করার কথা আমারা ভাবিনি।
কিন্তু নৌকাটা জাহাজ ছেড়ে কিছুটা দূরে যেতেই আমার বন্ধুবর মি.ওয়াট ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে ক্যাপ্টেন হার্ডিকে বলল–‘নৌকাটাকে জাহাজের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’
ক্যাপ্টেন সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকালেন।
মি. ওয়াট এবার বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলল–‘নৌকাটাকে জাহাজের কাছে নিয়ে যেতেই হবে। কারণ, আমার একটা আয়তাকার বাক্স জাহাজে রয়ে গেছে।’
তার কথায় সবাই বিস্ময়ে হতবাক্ হয়ে গেল।
ক্যাপ্টেন একটু রাগত স্বরেই বললেন–আপনি করছেন কি মি. ওয়াট! শান্ত হয়ে বসুন। আপনি কি এতগুলো প্রাণীকে ডুবিয়ে মারতে চান! সমুদ্রের পানি যে জাহাজের একেবারে কাণায় উঠে গেছে তা-তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন।
‘কিন্তু হায়! আমার আয়তাকার বাক্সটা! ক্যাপ্টেন হার্ডি দয়া করে আপত্তি করবেন না। বাক্সটার ওজন তো সামান্য-খুবই সামান্য। আপনার গর্ভধারিণীর দোহাই, পরম পিতার ভালোবাসার দোহাই আর আপনার মুক্তি-আশার দোহাই–আমার বাক্সটা ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করে অশেষ উপকার করুন।
আমার শিল্পী বন্ধু মি. ওয়াটের কাতর অনুরোধে ক্যাপ্টেন হার্ডির মন মুহূর্তের জন্য একটু দুর্বল হলেও পরমুহূর্তেই গম্ভীর স্বরে বললেন–‘মি. ওয়াট, আমি আপনার কথায় কেবল অবাকই হচ্ছি না, বলতে বাধ্য হচ্ছি–আপনি কী পাগল হয়েছেন! আপনার অনুরোধ রক্ষা করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। আপনি বসুন! আপনি নৌকাটা ডুবিয়ে ছাড়বেন না দেখছি!’
এবার আমাদের সবাইকে লক্ষ্য করে ক্যাপ্টেন হার্ডি বলে উঠলেন–‘আপনারা ওনাকে ধরুন, জোর করে বসিয়ে দিন–আটকান! নইলে তিনি হয়তো পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন! আরে আরে, এই রে! আমি আগেই আশঙ্কা করেছিলাম। উফ শেষ–সব শেষ হয়ে গেল!
ক্যাপ্টেন হার্ডির মুখের কথাটা শেষ হবার আগেই আমার বন্ধুবর মি. ওয়াট সমুদ্রে ঝাঁপ দিল।
জাহাজ থেকে দড়ি ঝোলানো রয়েছে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করে সাঁতরে কোনোরকমে দড়ির শেষ প্রান্তটা ধরে ফেলল। তারপর উন্মাদের মতো দড়িটা বেয়ে বেয়ে জাহাজে উঠে গেল। জাহাজে পা দিয়েই লম্বা-লম্বা পায়ে তার শোবার ঘরের দিকে ছুটে চললেন।
ইতিমধ্যে আমরা ঝড়ের ধাক্কায় নৌকার একেবারে শেষ প্রান্তে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের বুকে আমরা নিতান্তই অসহায় বোধ করতে লাগলাম। আমরা দাঁতে দাঁত চেপে নৌকাটাকে ফেরাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম।
আমি এত বিপদের মধ্যেও ঘাড় ঘুরিয়ে মি. ওয়াটের অবস্থা সম্বন্ধে আঁচ করে নেবার চেষ্টা করলাম। তার বাঁচার কিছুমাত্র আশাও যে নেই, এ ব্যাপারে কিছু মাত্র সন্দেহও রইল না।
শঙ্কটাপন্ন ধ্বংসপ্রায় জাহাজটা থেকে আমাদের নৌকাটার দূরত্ব দ্রুত বেড়ে যেতে লাগল।
আমি আবারও ঘাড় ঘুরিয়ে জাহাজটার দিকে তাকালাম। দেখলাম, আমার বন্দুবর, যাকে বদ্ধ পাগল ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না। সে আয়তাকার বাক্সটাকে। টেনে হিঁচড়ে জাহাজের ডেকের ওপরে উঠছে। ব্যাপারটা আমার বিস্ময়কে তুঙ্গে নিয়ে গেল। আর যা দেখলাম তা হচ্ছে তিন ব্যাসযুক্ত দড়িটা দিয়ে প্যাঁচ দিয়ে দিয়ে বাক্সটাকে আচ্ছা করে বাঁধল। তারপর সেটার সঙ্গে নিজের শরীরটাকেও বেঁধে ফেলল।
ব্যস, এবার মুহূর্তের মধ্যে বাক্সসহ আমার বন্ধুটি দুম্ করে সমুদ্রের বুকে পড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই সে চিরতরে বেপাত্তা হয়ে গেল।
আমরা কয়েকমুহূর্ত সে দিকে নীরবে, অপলক চোখে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৈঠা হাতে তুলে নিলাম। ঘণ্টাখানেক কারো মুখে রা সরল না। সবাই নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল।
আমিই চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রথম মুখ খুললাম–‘ক্যাপ্টেন হার্ডি, তারা কত অল্পক্ষণের মধ্যে তলিয়ে গেল লক্ষ্য করেছেন কী?
