অতিরিক্ত শোবার ঘরের রহস্যটা ছাড়া আরও ব্যাপারের প্রতি দৃষ্টি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হল। এটাও আমার মধ্যে কম রহস্যের সঞ্চার করেনি। আমি নিজের কানে শুনেছি, মিসেস ওয়াট বন্ধুবর ওয়াটের কামরা থেকে বেরিয়ে অতিরিক্ত কামরাটায় চলে যাবার পর তার ঘরের ভেতর থেকে সাবধানী চাপা শব্দ বার কয়েক বেরিয়ে এলো।
আমি উকর্ণ হয়ে শব্দটা শুনে ব্যাপারটা সম্বন্ধে ধারণা করার চেষ্টা করলাম। অচিরেই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, হাতুড়ি দিয়ে একের পর এক আঘাত হেনে আয়তাকার বাক্সটাকে খোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আরও কয়েক মুহূর্ত রুদ্ধশ্বাসে লক্ষ্য করার পর নিঃসন্দেহ হলাম, আমার অনুমানই অভ্রান্ত, বাক্সটাই খোলার চেষ্টা চলছে। বটে। আর একটা ব্যাপারও আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, হাতুড়িটার মাথায় পশম বা তুলা জড়িয়ে দেওয়ার ফলেই শব্দটা এখন অস্পষ্ট ও চাপা শোনাচ্ছে।
যা-ই হোক, বার কয়েক এরকম শব্দটা হবার পর সেটা থেমে গেল। তারপর সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটা শব্দ আমার কানে এলো যাতে আমি বুঝতে পারলাম বাক্সের ডালাটা এবার খোলা হয়েছে। এবার বাক্সটার সঙ্গে বার্থের ঠোকর লাগায় বুঝতে পালাম সেটাকে তো নিচের কাঠের তলায় ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হল।
ব্যস, এবার আর কোনো শব্দই নেই। একেবারেই সুনসান। কয়েক মুহূর্ত নিরবচ্ছিন্ন নীরবতার মধ্য দিয়ে কাটার পর এমন চাপা একটা শব্দ কানে আসতে লাগল যাকে ভাষায় প্রকাশ করতে হলে ফোঁপানো শব্দটাই ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এও বলে রাখছি, সবটাই আমার কল্পনার ব্যাপার কি না নিশ্চিত করে বলতে পারি না।
কিন্তু শব্দটা যদি ফোঁপানোর না-ও হয়ে থাকে তবে বার বার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার শব্দ হওয়াও বিচিত্র নয়। তবে ঠিক এরকম একটা শব্দ আমার কানে দীর্ঘসময় ধরে অনবরত বেজেই চলল।
আমি একটা ব্যাপারে নিঃসন্দেহ যে, আমার বন্ধুবর শিল্পমনস্ক মি. ওয়াট তার শিল্পী মনের খেয়াল মেটাতে, চোখের তৃপ্তিলাভের জন্যই বাক্সটাকে খুলেছে। কিন্তু অবাক হবার মতো ব্যাপার যেটা তা হচ্ছে, এর জন্য এমন করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার কোনো যুক্তি থাকতে পারে?
আমি আবারও স্বীকার করে নিচ্ছি, আমার এরকম ধারণা জন্মানোর কারণ হিসেবে হয়তো বা ক্যাপ্টেন হার্ডির সবুজ কড়া চা-ই কাজ করছে।
একটা মাত্র রাতেই নয়, দু-দুটো রাতেই আমার স্পষ্ট কানে এসেছে বন্ধুবর মি. ওয়াট আয়তাকার বাক্সটার ঢাকনাটাকে জায়াগামত বসিয়ে হাতুড়ির দিয়ে আঘাত করে পেরেকগুলোকে আবার বসিয়ে দিয়েছে। আর আমি এও লক্ষ্য করেছি, বাক্সটার ব্যবস্থা করার পরই বন্ধুবর পোশাক বদলে নিয়েছে। তারপর শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে মিসেস ওয়ার্টকে ডেকে ভেতরে নিয়ে গেছে।
এভাবে আমাদের জাহাজটা উত্তাল-উদ্দাম সাগরের বুকে সাত-সাতটা দিন অনবরত এগিয়ে চলতে লাগল। জাহাজটা অগ্রসর হতে হতে যখন হাতেরাস অন্তরীপের কাছাকাছি পৌঁছালো, তখন দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ভয়ঙ্কর ঝড় ধেয়ে এলো।
আকাশের অবস্থা আবহাওয়ার পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে আমরা আগে থেকেই এরকম অনুমান করেছিলাম।
ঝড়ের আশঙ্কা করে জাহাজের ক্যাপ্টেন পাল-হাল সবকিছুরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। ভয়ঙ্কর সে ঝড়ের তীব্রতা ক্রমে বেড়েই চলল। আর আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই সেটা পুরোপুরি ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিল।
ব্যস, শুরু হয়ে গেল এক প্রলয়ঙ্কর কাণ্ড। চোখের পলকে জাহাজের পিছনের পালটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সমুদ্র যেন ক্রমেই উন্মাদনায় মেতে উঠল। একের পর এক পর্বত প্রমাণ ঢেউ ধেয়ে এসে জাহাজের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগল। ঠিক সে মুহূর্তেই ঘটে গেল একেবারেই অপ্রত্যাশিত এক দুর্ঘটনা। অতর্কিতে তিনজন লোক জাহাজ থেকে ছিটকে ক্রোধোন্মত্ত সমুদ্রের পানিতে পড়ে গেল।
অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন বহু চেষ্টা করে পরিস্থিতিটাকে একটু সামাল দেবার আগেই সামনের দিককার পালটা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সেটার ব্যবস্থা করতে গিয়েই আমাদের তিনটি ঘণ্টা চলে গেল। জাহাজও আগের চেয়ে অনেক মন্থর হয়ে এলো। সেটা যেন কোনোরকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে আরম্ভ করল।
ঝড়ের উন্মাদনা সমান তালেই চলতে আরম্ভ করেছে। ঝড়ের বেগ কমবার বা থামবার কোনো লক্ষণই নজরে পড়ছে না। ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে-যাওয়া পাল আরও ছিঁড়তে শুরু করল।
জাহাজের সবাই যখন পালটা মেরামত করতে ব্যস্ত ঠিক তখনই জাহাজের কাঠমিস্ত্রি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। সে বলল–‘জাহাজের খোলে পানি ঢুকে চারফুট দাঁড়িয়ে গেছে। এখনই পানি সরাতে না পারলে প্রমাদ ঘটবে।
বিপদ কখনও একা আসে না। খোলের পানি সরাতে গিয়ে পাম্পযন্ত্রগুলো প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। জাহাজের সবার মধ্যে আতঙ্কের সঞ্চার হল। শুরু হয়ে গেল চিৎকার চাঁচামেচি। দারুণ হতাশায় সবাই ভেঙে পড়ার যোগাড় হল। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে ভারী মালপত্র দমাদম পানিতে ফেলে দিয়ে জাহাজটা হালকা করার কাজে সবাই মেতে গেল। তখনও দুজন অক্ষত রয়েছে। তাড়াতাড়ি সে দুটোর মাথাও কেটে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হল।
দীর্ঘসময় ধরে চেষ্টা করেও পাম্পগুলো মেরামত করা গেল না। আবার এদিকে ক্রমাগত পানির চাপে খোলের তলদেরে চিত্রটাও ক্রমে বড় হতে লাগল। একের পর এক প্রতিকূল পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ায় ক্যাপ্টেনের মুখে হতাশার ছাপ ফুটে উঠল।
