আমি যখন তার সঙ্গে রসিয়ে রসিয়ে কথা বলে চলেছি তখন সে চোখে মুখে এমন। হতাশার ছাপ এঁকে আমার মুখের দিকে নীরবে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল যেন আমার কথার বিন্দু বিসর্গও সে বুঝতে পারেনি, অর্থাৎ আমার রসিকতাটুকু তার কাছে নিতান্ত অবোধ্য।
আমি তার মুখের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই কথা বলতে লাগলাম। লক্ষ্য করলাম, আমার বক্তব্যের অর্থ তার কাছে ক্রমে যত পরিষ্কার হতে লাগল ততই যেন তার চোখের মণি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে শুরু করল।
আমার রসিকতার সম্পূর্ণ অর্থটা যখন তার হৃদয়ঙ্গম হলো তখন সে এমন গলা ছেড়ে হাসতে আরম্ভ করল যা আমাকে অবাকই করল। অবাক হবার মতো ব্যাপারই বটে। সে একটানা দশ মিনিট বা তার বেশি সময় ধরে এমন হো হো করে হাসল যা দেখলে যে কেউ অবাক না হয়ে পারবে না।
দীর্ঘসময় ধরে সরবে হেসে আমার বন্ধুটি এক সময় দুম্ করে ডেকের মেঝের ওপর বসে পড়ল। ডেকে রেলিং না থাকলে হয়তো বা সে হাসতে হাসতে উত্তাল সমুদ্রের বুকেই আছাড় খেয়ে পড়ে যেত। ভাগ্য ভালো যে, সেরকম কোনো অঘটন ঘটেনি।
বন্ধুর কাণ্ড দেখে আমি তো রীতিমত হকচকিয়ে গেলাম। তাকে ধরে মেঝে থেকে তুলতে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল। মুহূর্তে ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। স্বগতোক্তি করলাম–‘হায় ঈশ্বর! বেচারা ওয়াট কি তবে মরেই গেল!
আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। আমার আর্তস্বর শুনেই লোকজন ছুটে ডেকে এলো। সবাই মিলে ধরাধরি করে বন্ধুবর ওয়াটকে তার শোবার ঘরে নিয়ে গেলাম। বহু চেষ্টার মাধ্যমে তার সম্বিৎ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হল।
সে চোখ মেলে তাকাল। স্থির তার দৃষ্টি। কয়েক মুহূর্ত নীরবে চোখের মণি দুটোকে বার বার এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে উপস্থিত সবার মুখের দিকে তাকাল। তারপর আরও সামান্য বিশ্রামের মাধ্যমে একটু ধাতস্থ হতে পারল। এবার সে কিছুক্ষণ অর্থহীন বুলি আওড়াল। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তাকে একা থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে আমরা কামরা ছেড়ে বেরিয়ে ছিলাম।
পরদিন সকালে তার ঘরে গিয়ে দেখি, সে মোটামুটি সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সুস্থ ও স্বাভাবিক বলতে আমি কিন্তু তার দৈহিক সুস্থতার কথাই বলতে চাইছি, অবশ্যই মানসিক নয়।
ব্যাপারটা নিয়ে জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে দু-চার কথা হতেই তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন, আমি যেন তার সংস্রব থেকে দূরে থাকি। আমি করলামও তাই। আসলে ক্যাপ্টেন বন্ধুবর ওয়াটের পাগলামির ব্যাপারে আমার মতামতকে সমর্থন করেই এরকম পরামর্শ দিয়ে সাবধান করে দিলেন। তিনি সব শেষে আমাকে সতর্ক করে দিতে গিয়ে বললেন-দেখুন মিস্টার, এ ব্যাপারে জাহাজের অন্য কোনো যাত্রীর কোনো কথা না বলাই উচিত বলে আমি মনে করছি। আশা করি আপনিও আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করবেন, কী বলেন?
আমি ঘাড় নেড়ে তার বক্তব্য সমর্থন করলাম।
আমি বন্ধুবরের সংস্রব এড়িয়ে চললেও তার প্রতি পুরোপুরি উদাসীন হতে পারলাম না। ফলে গোপনে সাধ্যমত তার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলতে লাগলাম। লক্ষ্য করলাম, সে সম্বিৎ হারিয়ে ফেলার ঘটনাটার পর তার এমনকিছু ঘটনা একের পর এক ঘটতে লাগল যার ফলে তার সম্পর্কে আমার কৌতূহল উত্তরোত্তর বেড়েই চলল।
আমার নিজের স্নায়বিক উত্তেজনা দেখা দিল। ফলে আমি সবুজ চা পান করা শুরু করে দিলাম। আমার রাতের গভীর নিদ্রা ঘুচে গেল। মাঝে-মধ্যে ঘুম চটে যাওয়ায় বিছানায় বসেই বাকি রাতটুকু কাটিয়ে দিই। সত্যিকথা বলতে কি, দুটো রাততো নির্ঘুম অবস্থাতে নিদারুণ অস্থিরতার মধ্যে কাটাতে হয়েছে।
জাহাজের অন্য সব যাত্রীর শোবার ঘরের মতোই আমার কামরাটাও প্রধান কামরা বা খাবার ঘরের ভেতর দিয়ে খোলার ব্যবস্থা করা আছে। আর ওয়াটের কামরা তিনটি রয়েছে প্রধান কামরাটার পিছনে। মাঝখানে একটা ঠেলা-দরজার মাধ্যমে যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং এটা দিয়েই প্রধান কামরাটা থেকে সেটাকে পৃথক করে নেওয়ার ব্যবস্থা। রাতেও ঠেলা-দরজাটা খোলাই থাকে, তালা লাগানো হয় না।
রাতে দমকা হাওয়ার চাপে ওই ঠেলা দরজাটা একবার খুলে গেলে সারা রাত খোলাই থাকে। কেউ সেটাকে বন্ধ করতে উৎসাহি হয় না, করেও না। আমার শোবার কামরাটা এমন জায়গায় যে, ওই ঠেলা দরজাটা আমার আসার ঘরের দরজাটা খোলা থাকলে আমি তার ঘরের সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পাই। আর গরমের জন্য আমার দরজাটা অধিকাংশ সময় খুলেই বসতে হয়।
আমি যে দু-রাতের কথা বলেছি তা কিন্তু অবশ্যই পর পর দু-রাত নয়। যা-ই হোক, সে রাত দুটোতে নিঘুম অবস্থায় কাটানোর সময় রাত এগারোটা নাগাদ আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম, মিসেস ওয়াট খুবই সন্তর্পণে বন্ধুবর ওয়াটের শোবার কামরাটা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
স্বামীর কামরা থেকে বেরিয়ে মিসেস ওয়াট অতিরিক্ত ঘরটায় বাকি রাতটুকু নির্বিবাদে কাটাল। ভোরের আলো ফোঁটা অবধি সে সেখানেই কাটাল। ভোর হলে স্বামীর তলব পেয়ে আবার তার কামরাটায় ফিরে গেল। তারা যে পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এ ঘটনাটা চাক্ষুষ করার পর আমার মনে তিলমাত্র সন্দেহও রইল না। তবে কি এটা বিবাহ-বিচ্ছেদেরই প্রস্তুতিপর্ব চলছে? নইলে আলাদা ঘরে রাত কাটাতে যাবেই বা কেন?
আমি আপন মনে বলে উঠলাম–‘উফ’! ব্যাপারটা যে এমন সহজ-সরল তা-তো ভুলেও ভাবিনি! অতিরিক্ত শোবার ঘরের রহস্যভেদ তো হয়েই গেল।
