বন্ধুবরের মুখে এসব কথা শুনে ভাবতে ভাবতে আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করত, আমি ধাঁধায় পড়ে যেতাম। বারবার একই কথা আমার মাথায় চক্কর মারত–কি ব্যাপার, ওয়াটের মাথাটাথা কি খারাপ হয়ে গেল!’
কিন্তু এ ছাড়া তো আমার মাথায় অন্য কিছুই আসছে না, ভাবতেই পারছি না। মাথার দোষ দেখা না দিলে এমন কথা তো অন্তত ওয়াটের মতো রুচিবান যুবকের মুখে আশা করাই যায় না। আরও আছে, তাকে যে আমি কেবলমাত্র রুচিবান মনে করি তা-ই নয়। বিচক্ষণ আর খুঁত খুঁতে মেজাজেরও বটে।
সবচেয়ে বড় কথা, ওয়াট একজন শিল্পী। সে শিল্পের একজন রীতিমত সমঝদার। তার পক্ষে ব্যুৎ! আর ভাবতে পারছি না।
তবে এটাও মিথ্যা নয় যে, মহিলাটি তাকে খুবই পছন্দ করত, মনে-প্রাণে ভালোবাসে। কথায় কথায় সে ওয়াটকে ‘প্রেমিক প্রবর’ আর ‘প্রেমিক স্বামী’ প্রভৃতি বিশেষণ ব্যবহার করে সম্বোধন করে। আর এও সত্য, তার এ ধরনের সম্বোধনকে নিয়ে সবাই হাসিঠাট্টা করে, কেউ কেউ তো সামনাসামনি রসিকতা করে বহুরকম মন্তব্য করতেও ছাড়ে না। কিন্তু আর একটা ব্যাপার কেবলমাত্র আমার চোখেই পড়েনি, জাহাজের অন্যান্য যাত্রীরাও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করেছে, আমার বন্ধুবর খোলাখুলিভাবেই তার স্ত্রী-রত্নটাকে এড়িয়ে চলতেই বেশি উৎসাহি। সব চেয়ে বেশি করে লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, অধিকাংশ সময়ই মি. ওয়াট নিজের শোবার কামরাটার মধ্যে একেবারে নিঃসঙ্গ অবস্থাতে কাটায়। আর তার সহধর্মিণী? সে মর্জিমাফিক বড়। কেবিনে বসে খুশিমনে সবার সঙ্গে বসে হাসিঠাট্টা গল্পগুজবে মেতে থাকে। স্বামী দেবতাটি কোথায়, কি অবস্থায় আছে সেদিকে কিছুমাত্র খেয়াল তার থাকে না। দরকারও মনে করে না। অবাক হবার মতো ব্যাপার নয় কি? ব্যাপারটাকে কেন্দ্র করে জাহাজের অন্য সবাই কিভাবে জানি না। আমি কিন্তু কিছুতেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে তিলমাত্র উৎসাহও পাই না।
আমি ঘুরে ঘুরে অনুসন্ধিৎসু চোখে সবকিছু দেখে শুনে যা বুঝেছি তাতে শেষমেশ এ সিদ্ধান্তই নিয়েছি অদৃষ্টের বিড়ম্বনাবশত বা আবেগ উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে আমার শিল্পমনস্ক বন্ধুবর ওয়াট এমন এক মহিলার সংস্পর্শে এসেছে, নিজেকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিয়েছে যার ফলে তাকে যারপরনাই নিম্নস্তরে নেমে যেতে হয়েছে। আর এর পরিণতি যা হওয়া স্বাভাবিক এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আর আজ তা স্বাভাবিক বিরক্তির উদ্রেক করছে, তাকে অতিষ্ট করে তুলছে।
সবকিছু দেখে-শুনে আজ আমার মনে বন্ধুবর ওয়াটের জন্য করুণার উদ্রেক হচ্ছে, কিছুমাত্রও সন্দেহ নেই। কিন্তু, কিন্তু শেষ ভোজের ব্যাপারে এমন লুকোচুরি ধান্ধাবাজিকে মার্জনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, কিছুতেই নয়।
এক বিকেলে আমি ডেকে রেলিং ধরে উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের দিকে আনমনে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হাজারো ভাবনা চিন্তা মাথার চারদিকে ভিড় জমাচ্ছে।
এমন সময় বন্ধুবর ওয়াট ধীর পায়ে ডেকে এলো।
আমি স্বভাবসুলভ আবেগ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলাম–‘আরে, ওয়াট যে!
সেও মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে আমার সঙ্গে করমর্দন সারতে সারতে বলল ভালো। তারপর তুমি কেমন আছ, বল?
আমি তার হাত ধরে বহুদিনের অভ্যাসমত ডেকে পায়চারি করতে লাগলাম। আমি গোপনে তার ভাবগতিক লক্ষ্য করতে লাগলাম। বুঝতে অসুবিধা হলো না, তার মানসিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেনি, অর্থাৎ বিমর্ষ ভাবটা একই রকম রয়েছে। সে আগাগোড়া মুখ গোমড়া করেই আমার সঙ্গে পায়চারি করতে লাগল।
আমি তার মানসিক পরিস্থিতির কিছুটা অন্তত পরিবর্তন ঘটানোর জন্য বহুভাবে হাসিঠাট্টা শুরু করলাম। বহু চেষ্টা করে হলেও সে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল। খুবই সংক্ষেপে হলেও সাধ্যমত আমার রসিকতার জবাবও দিতে লাগল–
অদৃষ্ট বিড়ম্বিত ওয়াট! বেচারা ওয়াট! শেষপর্যন্ত ভাগ্য ঠুকে, সাহস করে তাকে ছোট্ট করে একটা ধাক্কা মারলাম। আগেই ভেবে রেখেছি, কেশ রসান দিয়ে দিয়ে দু চার কথার মাধ্যমে তার মনটাকে একটু হালকা করে নিয়ে তারপর কৌশলে ‘আয়তাকার কাঠের বাক্সটার প্রসঙ্গ তার কাছে পাড়ব। প্রসঙ্গক্রমে তাকে খুবই কৌশলে বুঝিয়ে দেব যে, তার বাক্সটার রহস্য আমি অবগত আছি, অর্থাৎ ওটার ভিতরে কি রক্ষিত আছে, সে ব্যাপারে আমি একেবারে অজ্ঞ নই। তবে খুবই সতর্কতার সঙ্গে খুবই ধীরে ধীরে এবং মেপে মেপে কথা বলে আমাকে অগ্রসর হতে হবে। সামান্য অসাবধানতা বা তড়িঘড়ি কাজ করতে গেলে পুরো ব্যাপারটাই ভেস্তে যেতে পারে।
যাক্, ভাগ্য ঠুকে আমি কাজে লেগে গেলাম। প্রসঙ্গটা শুরু করতে গিয়ে আমি বাক্সটার আয়তন, গঠন ও প্রকৃতির কথা পাড়লাম–‘বন্ধু, তোমার ওই বাক্সটার আকার কিন্তু বাস্তবিকই অদ্ভুত।’
সে মুচকি হাসল।
এবার আমি খুবই ধীরগতিতে এবং সতর্কতার সঙ্গে রসিকতার ভান করে প্রসঙ্গটাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলাম। কখনও বেশ রসান দিয়ে দিয়ে, কখনও কথার ফাঁকে ফাঁকে সর্বজ্ঞের ভাব দেখিয়ে, কখনও একটু-আধটু চোখ রাঙিয়ে আবার কখনও বা হাসতে হাসতে তার বুকে ছোট্ট করে টোকা দিয়ে কথা বলতে লাগলাম।
বন্ধুবর ওয়াটের আচরণ ও কথাবার্তার ধরন-ধারণ দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমি কয়েকমুহূর্ত বজ্রাহতের মতো নিশ্চল-নিথরভাবে, নীরব চাহনি মেলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আসলে সে আমার নির্জল ও নির্দোষ রসিকতাকে যেভাবে গ্রহণ করল, তা দেখে আমি ভাবতে বাধ্য হলাম, বুঝি বা বন্ধু ওয়াটের মস্তিষ্ক বিকৃতিই ঘটেছে, বুঝি পাগলই হয়ে গেছে।
