চালিয়ে নিই। কিন্তু আপনি বললেন, জাহাজটা গ্রিক।
গ্রিকই, পিটের বদলে জবাব দিল লিলি। তবে ক্যাপটেন মোম ট্যাবলেটে তাঁর লগ লিখেছেন ল্যাটিনে। ছয়টা ট্যাবলেটে অক্ষর পেয়েছি। সাত নম্বরটায় একটা ম্যাপ। জাহাজের ভেতর প্রথমবার ঢুকে এগুলো উদ্ধার করেছে পিট। অক্ষরগুলো কাগজে টুকেছি আমি।
একটা চেয়ারে বসে একটা মোম ট্যাবলেট তুলে নিলেন ড. রেডফার্ন। নেড়েচেড়ে দেখে রেখে দিলেন। তারপর চোখ বুলালেন লিলির লেখা কাগজটায়।
গরম চকোলেট আর অ্যাপ দিয়ে গেল স্টুয়ার্ড। অনুবাদ করায় এতই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন ড. রেডফার্ন, যে তার আর খিদে থাকল না। যন্ত্রচালিত রোবটের মতো কাপটা মুখে তুললেন, চোখ স্থির হয়ে আছে হাতে লেখা কাগজটার ওপর। দশ মিনিট পর নিঃশব্দে চেয়ার ছাড়লেন তিনি, পায়চারি শুরু করলেন, বিড়বিড় করে ল্যাটিন শব্দ আওড়াচ্ছেন, বিস্মৃত দর্শকদের উপস্থিতি সম্পর্কে কোনো ধারণাই যেন নেই।
চুপচাপ বসে থাকল পিট আর লিলি। এক চুল নড়ল না কেউ, শুধু চোখ দুটো অনুসরণ করল ড. রেডফার্নকে। টেবিলে ফিরে এসে কাঁপা হাতে কাগজগুলো আবার পরীক্ষা করলেন ড. রেডফার্ন। প্রত্যাশায় আর উত্তেজনায় টান টান হয়ে উঠল পরিবেশ। আরও প্রায় পাঁচ মিনিট পর কাগজগুলো টেবিলে রেখে ধীরে ধীরে দেয়ালের দিকে তাকালেন ড. রেডফার্ন, তার চোখে আচ্ছন্ন দৃষ্টি।
কী ব্যাপার, ড. রেডফার্নং জিজ্ঞেস করল পিট।
কী? রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল লিলি। কী পেয়েছেন আপনি?
ড. রেডফার্নের গলা কোনো রকমে শুনতে পেল ওরা। মাথা নিচু করলেন তিনি, ফিসফিস করে বললেন, সম্ভব। হ্যাঁ, সম্ভব। আপনারা সম্ভবত দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সাহিত্য আর শিল্পকর্মের সংগ্রহ আবিষ্কার করেছেন।
.
২১.
আরেকটু খুলে বলবেন, প্লিজ? শুকনো গলায় তাগাদা দিল পিট।
বারকয়েক ঘন ঘন নেড়ে মাথাটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করলেন ড. রেডফার্ন। গল্পটা…গল্প না বলে রূপকথা বললেই যেন বেশি মানায়। গোটা ব্যাপারটা এমনই অবিশ্বাস্য আর অদ্ভুত অথচ বাস্তব সত্য যে আমার ঠিক হজম হচ্ছে না।
লিলি জানতে চাইল, ট্যাবলেটগুলো কী বলছে, গ্রিক-রোমান একটা জাহাজ বাড়ির পানি ছেড়ে এত দূর কেন চলে এল?
গ্রিক-রোমান নয়, বাইজেন্টাইন, রেডফার্ন সংশোধন করলেন। সেরাপিস যখন নোঙর তুলে রওনা হয়, তার আগেই সাম্রাজ্যের সিংহাসন কনস্ট্যানটাইন দ্য গ্রেটের দ্বারা রোম থেকে বসফরাসে স্থানান্তর করা হয়ে গেছে-বসফরাস, এক সময় যেখানে বাইজেন্টিয়াম শহর দাঁড়িয়ে ছিল।
পরে যেটা কনস্টানটিনোপল হয়, বলল পিট।
তারপর ইস্তাম্বুল, লিলির দিকে ফিরে বললেন ড. রেডফার্ন। সরাসরি উত্তর দিচ্ছি না বলে দুঃখিত। তবে হ্যাঁ, ট্যাবলেটগুলো বলছে বটে কেন ও কীভাবে জাহাজটা এদিকে আসে। পুরোটা কাহিনী ব্যাখ্যা করতে হলে আগে আমাদের মঞ্চটা সাজাতে হবে, সেই মঞ্চে যে নাটকটা আমরা দেখব তার সূচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব তিনশো তেইশ সাল, যে বছর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ব্যাবিলনে মারা গেলেন। তার সাম্রাজ্য নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিলেন জেনারেলরা। তাদের একজন, টলেমি, সাম্রাজ্য থেকে। কেটে নিলেন মিসরকে হলেন রাজা। তিনি আলেকজান্ডারের লাশও দখল করতে সমর্থ হলেন, সোনা আর স্কটিক দিয়ে তৈরি কফিনে মুড়ে রাখলেন সেটা। পরে লাশটা তিনি একটা মন্দির তৈরি করে সমাধিস্থ করলেন, মন্দিরের চারদিকে গড়ে তুললেন আশ্চর্য সুন্দর একটা শহর, যে সৌন্দর্য এথেন্সকেও হার মানিয়ে দিল। টলেমি শহরটা নাম রাখলেন আলেকজান্দ্রিয়া।
কিন্তু এসবের সাথে সেরাপিসের কী সম্পর্ক? অবাক হয়ে জানতে চাইল লিলি।
প্লিজ, আমাকে শেষ করতে দিন, আবেদনের সুরে বললেন ড. রেডফার্ন। ছিটেফোঁটা সংগ্রহ থেকে বিশাল একটা মিউজিয়াম আর লাইব্রেরি গড়ে তুললেন টলেমি। সংগ্রহের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে উঠল। তার উত্তরসূরিরা, ক্লিওপেট্রাসহ বাকি সবাই, এই মিউজিয়াম আর লাইব্রেরিতে নিজেদের সংগ্রহ জমা করেছেন। মিউজিয়ামটা হয়ে উঠল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংগ্রহশালা। শুধু শিল্পকর্ম নয়, তৎকালীন ও অতীত যুগের বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, কারিগরি বিদ্যা ইত্যাদির সমস্ত নিদর্শন এই লাইব্রেরি ও মিউজিয়ামে ঠাই পেল। জ্ঞানের এই বিশাল ভাণ্ডার কিন্তু মাত্র তিনশো একানব্বই খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টিকল।
সে বছর, সম্রাট থিয়োডাসিয়াস ও আলেকজান্দ্রিয়ার গির্জাপতি থিয়োডোসিয়াস সিদ্ধান্ত নিলেন, সদ্য প্রবর্তিত খ্রিস্টান নীতি ও আদর্শের সাথে মেলে না এমন সমস্ত শিল্পকর্ম সাহিত্য পৌত্তলিকতা দোষে দুষ্ট বলে মনে করতে হবে এবং তা অবশ্যই ধ্বংস করে ফেলতে হবে। লাইব্রেরি ও মিউজিয়ামে ছিল পাথর ও ধাতব মূর্তি, মার্বেল ও ব্রোঞ্জের তৈরি শিল্পকর্ম, সোনা আর আইভরির তৈরি খেলনা, অবিশ্বাস্য নৈপুণ্যের সাথে তৈরি পেইন্টিং, ভেড়ার চামড়া বা প্যাপিরাস কাগজে লেখা অসংখ্য বই, বহু জ্ঞানী গুণীর সংরক্ষিত লাশ, এমনকি সম্রাট আলেকজান্ডারের লাশও ছিল-ঠিক হলো, সব ধ্বংস করে ফেলা হবে। হয় ভেঙেচুরে ধুলোর সাথে মিলিয়ে ফেলা হবে নয়তো পুড়িয়ে ছাই করা হবে।
ঠিক কী ধরনের হবে সংখ্যায়?
শুধু বই ছিল কয়েক লাখ।
