রিভাসের সাথে আমার সম্পর্ক আপনি আবিষ্কার করলেন কীভাবে?
ছাড়ানো চামড়ার ভেতর ভদ্রলোকের আইডি কার্ড ছিল। তার অফিসে গিয়ে সেক্রেটারিকে জেরা করি। সেখান থেকে জানতে পারি, এয়ারপোর্টের উদ্দেশে রওনা হবার আগে প্রেসিডেন্ট ও আপনার সাথে দুঘণ্টা কথা বলেছেন তিনি। কোথায় গিয়েছিলেন, সেক্রেটারি বলতে পারেনি। ধরে নিলাম ক্লাসিফায়েড কোনো মিশনে গিয়েছিলেন। তারপর আপনার সাথে যোগাযোগ করি।
টেপ করা কথা কিছুই তুমি বোঝোনি?
একেবারে কিছু বুঝিনি তা নয়। চামড়া ছাড়ানোর সময় মি. রিভাস যে চিৎকার করেন তাও টেপে আছে।
চোখ বুজলেন ডেইল নিকোলাস, মন থেকে ছবিটা মুছে ফেলার চেষ্টা করলেন।
তাঁর পরিবারকে জানাতে হবে, বলল গেরহার্ট। স্ত্রী আছেন?
চার-চারটে ছেলেমেয়ে নিয়ে একা হয়ে গেল বেচারি। নিঃশব্দে কেঁদে ফেললেন নিকোলাস।
এই প্রথম গেরহার্টের পাথুরে চেহারা নরম হলো। আমি দুঃখিত, স্যার।
তার কথা ডেইল নিকোলাস শুনতে পেলেন না। দুঃস্বপ্ন দেখার আতঙ্ক কাটিয়ে উঠেছেন তিনি। এখন আর তার বমি পাচ্ছে না। গাই রিভাস তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিলেন। তার এই পরিণতি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে তাঁর। এত রাগ কখনও তার হয়নি। হঠাৎ করে ডেইল নিকোলাস উপলব্ধি করলেন, তিনি দুর্বল নন। হোয়াইট হাউসের মুষ্টিমেয় যে কজন লোক প্রচণ্ড ক্ষমতার অধিকারী, তিনি তাদেরই একজন। অনেক অবিশ্বাস্য ঘটনা তিনি ঘটাতে পারেন, অনেক স্বাভাবিক ঘটনা তিনি ঘটতে না দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, এই নিমর্ম হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তার সবটুকু ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। এমনকি দরকার হলে অন্যায়ভাবেও।
টপিটজিনকে মরতে হবে।
১৫. মিসরীয় শহর
১৫.
মিসরীয় শহর আলেকজান্দ্রিয়া থেকে বিশ কিলোমিটার দক্ষিণে এটা একটা ব্যক্তি মালিকানাধীন এয়ারপোর্ট। ছোট্ট একটা বিচক্রাফট এক্সিকিউটিভ জেট ল্যান্ড করল। সবুজ একটা ভোলভো গাড়ির পাশে থামল প্লেন, গাড়ির দরজায় ইংরেজিতে ট্যাক্সি লেখা। ইঞ্জিনের শব্দ থেমে যাবার সাথে সাথে ওপর দিকে উঠে খুলে গেল প্যাসেঞ্জার ডোর।
সাদা স্যুট পরা লোকটা নেমে এল নিচে। গাঢ় নীল শার্টের সাথে ম্যাচ করা টাই পরেছে সে। ছয় ফুটের সামান্য কম হবে লম্বায়, একহারা গড়ন, এক মুহূর্ত থেকে টাকা শুরু হওয়া চওড়া কপাল রুমাল দিয়ে মুছল, একটা আঙুল দিয়ে সিধে করে নিল লম্বা আর ঘন গোফ জোড়া। গাঢ় রঙের সানগ্লাসের আড়ালে রয়েছে চোখ দুটো, হাতে পরেছে সাদা লেদার গ্লাভস।
লন্ডন থেকে একশো ছয় ফ্লাইটে যে পাইলট উঠেছিল, তার সাথে সুলেমান আজিজের চেহারার কোনো মিল নেই।
শান্ত, দৃঢ় পদক্ষেপে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়াল সে। হুইলের পেছন থেকে সদ্য নেমে আসা ড্রাইভারকে বলল, গুড মর্নিং, ইবনে। ফেরার পর কোনো সমস্যা হয়েছে?
সব ঠিকঠাক আছে, সুলেমান আজিজ, উত্তর দিয়ে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ধরল সে, শোল্ডার হোলস্টারের পিস্তলাকৃতি শটগানটা গোপন করার কোনো চেষ্টা করল না।
ইয়াজিদের কাছে নিয়ে চলো আমাকে। গাড়িতে উঠে নির্দেশ দিল সুলেমান আজিজ। নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকাল ইবনে।
গাঢ় টিনটেড গাড়ির কাঁচ আর বডি বুলেটপ্রুফ। আরামদায়ক নিচু একটা চেয়ার বসেছে সুলেমান আজিজ, তার সামনে একটা ডেস্ক কেবিনেট, তাতে একগাদা ইলেকট্রনিক ইকুইপমেন্ট, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে একজোড়া টেলিফোন, একটা রেডিও ট্র্যান্সমিটার ও টিভি মনিটর, একটা কম্পিউটর। ভেতরে বার আর একজোড়া রাইফেলসহ র্যাকও রয়েছে।
আলেকজান্দ্রিয়ার জনাকীর্ণ পথে এঁকে-বেঁকে চলে সমুদ্রতীরবর্তী রাস্তায় পড়ল গাড়ি, প্রতিটি মুহূর্তে টেলিফোন ব্যস্ত থাকল সুলেমান আজিজ। ডজনখানেকের ওপর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে তার পুঁজি খাটছে। তার সম্পদের হিসাব একমাত্র সেই জানে। বুদ্ধিমত্তার চেয়ে নিষ্ঠুরতাই বরং তাকে ব্যবসায়িক সাফল্য এনে দিয়েছে। যদি কোনো সরকারি অফিসার বা প্রতিদ্বন্দ্বী তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, হঠাৎ করে একদিন নিখোঁজ হয়ে যায় লোকটা, তারপর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় না।
বিশ কিলোমিটার ছুটে এসে একটা গেটের সামনে থামল ভলভো গাড়ি। ভেতরে ছোটো একটা ভিলা, পাহাড়ের গায়ে। ভিলা থেকে বালুময় সৈকত দেখা যায়।
কম্পিউটরের লাভের হিসাব করছিল সুলেমান আজিজ, বোতাম টিপে সেটা বন্ধ করল সে, দরজা খুলে নেমে দাঁড়াল। বালি রঙের ইউনিফর্ম পরা চারজন গার্ড ঘিরে ধরল তাকে, খুঁটিয়ে সার্চ করল। তারপর তাকে একটা এক্স-রে ডিটেকটর-এর সামনে দিয়ে হাঁটতে বলা হলো। এ ধনের ডিটেকটর শুধু এয়ারপোর্টগুলোতেই দেখা যায়।
গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার সিঁড়ি বেয়ে ভিলায় উঠল সুলেমান আজিজ। ধাপ বেয়ে ওঠার সময় কংক্রিটের ছোট একটা উঠানকে পাশ কাটাল সে। উঠানে বসে রয়েছে ইয়াজিদের দেহরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। অলংকৃত খিলানটাকে পাশ কাটিয়ে এগোবার সময় আপনমনে হাসল সুলেমান আজিজ। খিলানের দরজা শুধুমাত্র সম্মানিত অতিথিদের জন্য খোলা হয়। পাশের ছোট্ট একটা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হলো তাকে। অপমানবোধ করলেও মন থেকে তাড়াতাড়ি মুছে ফেলল অনুভূতিটা। সে জানে, কোনো কোনো ব্যাপার অত্যন্ত নীচ মানসিকতার পরিচয় দেয় আখমত ইয়াজিদ। যারা তার নোংরা কাজগুলো করে দেয়, তাদের প্রতি নির্লিপ্ত অবহেলাসূচক আচরণ করে সে, তাকে ঘিরে প্রিয় ফ্যানাটিকদের যে বৃত্তটা আছে সেখানে তাদের স্থান হয় না।
