চোখে সন্দেহ আর অবিশ্বাস নিয়ে রুডির দিকে ঝুঁকে পড়ল কর্নেল। আপনারা মাত্র চারজন পঁচিশ-তিরিশজনের মতো ট্রেনিং পাওয়া আতঙ্কবাদীকে ঘায়েল করেছেন, বলতে চান?
কাঁধ ঝাঁকাল রুডি। পিট আর অন্যরা আরবদের ঠেকিয়ে রাখছিল বেশ সফলতার সাথে।
আপনি শেষটা দেখে আসেনিনি, তাই না?
কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেল রুডি।
একজনের বিরুদ্ধে প্রায় দশজন, বিড়বিড় করে বলল মেজর ডিলিঞ্জার।
শেষমেষ, হোলিন বললেন, চলো দেখা যাক, কী পাই ওখানে গিয়ে।
এগিয়ে এলেন সিনেটর পিট। কর্নেল, রুডি বলছে, খনিতে আমার ছেলে, পিটকে দেখে এসেছে ও। তোমার সাথে ওখানে আমি যেতে চাই।
দুঃখিত, সিনেটর। গোটা এলাকা দখলে না এনে ওদিকে ভিআইপি কাউকে আমি যেতে দিতে পারি না।
এক হাতে সিনেটরকে জড়িয়ে ধরল রুডি। ওদিকেটা আমি দেখব, স্যার। ডার্ককে নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমাদের সবার চেয়ে বেশিদিন বাঁচবে ও।
কর্নেল অতটা আশাবাদী হতে পারল না। ওরা বোধ হয় কচুকাটা হয়ে গেছে, ডিলিঞ্জারের কানে কানে বলল সে।
সায় দিয়ে মাথা ঝাঁকানো জন ডিলিঞ্জার। সন্ত্রাসবাদীরা অভিজ্ঞ, সংখ্যায় সাত আট গুণ বেশি, মাত্র তিনজন লোক তাদের সাথে পারেই বা কীভাবে।
কর্নেলের সঙ্কেত পেয়ে তার লোকেরা ভূতের মতো নিঃশব্দে এগোল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, এক আড়াল থেকে বেরিয়ে আরেক আড়ালে পৌঁছুল, ভালো করে চারদিকে দেখে নিয়ে পরবর্তী আশ্রয়ের দিকে পা বাড়াল। যত এগোল, লাশের সংখ্যা ততই বাড়তে লাগল। ক্রাশিং মিলের বাইরে পাওয়া গেল তেরোটা মৃতদেহ।
ক্রাশিং মিল ভবনটা বুলেট আর গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। একটা জানালাতেও কোনো কাঁচ নেই। প্রতিটি দরজা উড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
দেয়ালে তৈরি বিশাল একটা গর্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকল কর্নেল, সাথে পাঁচজন লোক। এই সময় যেখানে মেইন ডোর ছিল, এখন সেখানে মুখ ব্যাদান করে আছে। বিশাল একটা গুহামুখ, সেটা দিয়ে ঢুকল জন ডিলিঞ্জার আরও কয়েকজনকে নিয়ে। চারদিক থেকে এখনও ধোয়া উঠছে, নিস্তেজ আগুন জ্বলছে এখানে-সেখানে।
মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে লাশের স্তূপ। ওর-ক্রাশারের সামরে স্তূপটা সবচেয়ে বড়। একটার ওপর আরেকটা, লাশের গাদা গুনতে গিয়ে দুবার ভুল হলে কর্নেলের। চৌদ্দ, নাকি ষোলো? বিশাল ঘরটার ভেতর যেন একটা মহাযুদ্ধ ঘটে গেছে, অথচ অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা হেলিকপ্টারটা একদম নতুন আর ঝকঝকে দেখল, শুধু লেজের দিকটা বিধ্বস্ত হয়েছে ওটার।
বধ্যভূমিতে বেঁচে আছে শুধু তিনজন লোক। এতই রক্তাক্ত তারা, ধোঁয়া আর কালি মেখে এমনই ভূতের মতো দেখতে হয়েছে, কোনো মানুষ এ রকম করুণ আকৃতি পেতে পারে বলে বিশ্বাস হতে চাইল না কর্নেলের। একজন শুয়ে আছে মেঝেতে, তার মাথা আরেকজনের কোলের ওপর, দ্বিতীয় লোকটার একটা হাত রক্ত ভেজা স্লিংয়ে ঝুলছে। আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে নিজের পায়ে; রক্ত ঝরছে পা, কাঁধ আর ঘাড়ের সংযোগস্থল, খুলির কিনারা আর মুখের পাশ থেকে।
একেবারে কাছে এসে ঝুঁকে পড়ার আগে ওদের কাউকে চিনতেই পারল না কর্নেল। বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গেছে সে। ভেবে কূল পেল না, এই বিকৃত আকৃতি নিয়ে তিনজন লোক কীভাবে মনোবল বজায় রাখলো, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে কীভাবে পরাস্ত করল পেশাদার তিন ডজন খুনিকে।
এখানে সেখানে জড়ো হয়ে প্রশংসার দৃষ্টিতে চারদিকে চোখ বুলালো স্পেশাল ফোর্সের লোকজন। দুকান পর্যন্ত বিস্তৃত হলো রুডি গানের হাসি। কর্নেল হোলিস আর মেজর ডিলিঞ্জার দাঁড়িয়ে থাকল, একদম যেন বোবা।
তারপর ব্যথায় মুখ বিকৃত করে করে পুরোপুরি সিধে হলো পিট, বলল, ঠিক সময়েই পৌঁছেছেন আপনারা। কিছু করার থাকলে বলুন, আমাদের হাতে এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই।
.
চতুর্থ পর্ব – স্যামের রোমান সার্কাস
২৭ অক্টোবর, ১৯৯১, ওয়াশিংটন, ডি সি
৬২.
ডেইল নিকোলাস ও মারটিন ব্রোগান হোয়াইট হাউসের ভেতর সিঁড়ির একটা ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন, হেলিকপ্টার থেকে নেমে সবুজ লনের ওপর দিয়ে ওঁদের দিকে হেঁটে এলেন প্রেসিডেন্ট। আমার জন্য কিছু আছে নাকি? করমর্দনের সময় জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
উত্তেজনা চেপে রাখতে ব্যর্থ হলেন ডেইল নিকোলাস। জেনারেল ডজের কাছ থেকে এইমাত্র একটা মেসেজ পেয়েছি আমরা। তার স্পেশাল অপারেশনস ফোর্স, দক্ষিণ চিলি থেকে অক্ষত অবস্থায় পুনরুদ্ধার করেছে লেডি ফ্ল্যামবোরোকে। সিনেটর পিট, হে’লা কামিল, প্রেসিডেন্ট হাসান ও দো লরেঞ্জো, সবাই তারা ভালো আছেন।
অটোয়ায় কানাডিয়ার প্রাইম মিনিস্টারের সাথে পরপর কয়েকটা বৈঠক করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট, তবু মেঘ থেকে বেরিয়ে আসা চাঁদের মতো উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তার চেহারা। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। দারুণ ভালো খবর। কেউ হতাহত হয়নি তো?
স্পেশাল ফোর্সের কয়েকজন আহত হয়েছে, সিরিয়াস নয়। তবে নুমার তিনজন সদস্য শরীরের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আঘাত পায়নি, রিপোর্ট করলেন মার্টিন ব্রোগান।
নুমা দৃশ্যপটে ছিল নাকি?
প্রমোদতরী লেডিকে খুঁজে বের করেছে ডার্ক পিট। তিনজন সঙ্গীকে নিয়ে আতঙ্কবাদীদের বাধা দেয় সে, ফলে নিয়ে পালাতে পারেনি তারা।
তো, বাপকে নিজেই উদ্ধার করল বেটা।
দুই তালু একসাথে ঘষে মনের আনন্দ প্রকাশ করলেন প্রেসিডেন্ট।
