অতঃপর আততায়ীগণ নেলসন সাহেবের ঘরে প্রবেশ করে এবং তাঁহার ঊরুদেশে গুলি করে। তাঁহার আঘাত গুরুতর নহে।…
।। শেষ খবর ।।
শেষ খবরে জানা যায়, একজন আততায়ী আত্মহত্যা করিয়া মরিয়াছে, অপর দুইজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় অবস্থান করিতেছে। একজনকে বিনয়কৃষ্ণ বসু বলিয়া নিশ্চিতরূপে জানা গিয়াছে। সে নাকি এই মর্মে এক মৃত্যুকালীন জবানবন্দী দিয়াছে যে, সে-ই বিনয়কৃষ্ণ বসু এবং সে-ই মিঃ লোম্যানকে হত্যা করিয়াছে। আততায়ীগণ তিনজনই ইউরোপীয় পোশাকে ভূষিত হইয়াছিল। বারান্দা দিয়া গুলি করিতে করিতে অগ্রসর হইবার সময় উহারা বন্দে মাতরম্ ধ্বনি করিতেছিলেন।…’
.
ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও বিনয় বাঁচলেন না। শহিদ হলেন ১৩ ডিসেম্বর। মৃত্যুর দু’দিন আগে বিনয়ের বাবা ব্রিটিশ সরকারের কাছে ছেলেকে শেষ দেখার আর্জি জানালেন। ছেলের মৃত্যু যে অবশ্যম্ভাবী, বুঝে গিয়েছিলেন। আর্জি মঞ্জুর করেছিল সরকার।
দীনেশকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টার কসুর করলেন না চিকিৎসকরা। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন দীনেশ। স্পেশ্যাল ট্রাইব্যুনাল গঠিত হল সেশনস জজ Ralph Reynolds Garlick-এর নেতৃত্বে। শুরু হল মামলার বিচারপর্ব। নামেই বিচার, আসলে প্রহসন। যে প্রহসনের অনিবার্য পরিণতি ছিল মৃত্যুদণ্ড।
গার্লিক তাঁর রায়ের শেষাংশে লিখলেন, ‘The punishment of murder is death. We are asked to refrain from passing the death sentence on the ground that the case is not free from doubt. But though there is some doubt about particular incidents of the story, we have no doubt at all that Dinesh was one of the three men who murdered Col Simpson…… We unanimously find Dinesh Chandra Gupta guilty of murder and sentence him under Sec 302 IPC to be hanged by the neck until he is dead.’
আলিপুর জেলে ১৯৩১-এর ৭ জুলাই ভোর পৌনে চারটেয় ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়েছিলেন উনিশ বছরের দীনেশ। জেলের কুঠুরি থেকে ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত রাস্তাটুকু অতিক্রমের পথে দৃপ্ত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল ‘বন্দে মাতরম!’
দীনেশের ফাঁসির আদেশ বঙ্গজ বিপ্লবীদের ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতির কাজ করেছিল। ফাঁসির হুকুম রদ করার আবেদন জানিয়ে গণস্বাক্ষরিত আর্জি গভর্নরের কাছে জমা পড়েছিল অসংখ্য। প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল সে আর্জি।
আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় দীনেশের ফাঁসির দিনক্ষণ গোপন রাখতে মরিয়া চেষ্টা করেছিল ব্রিটিশ প্রশাসন। সে চেষ্টা সফল হয়নি। পরের দিন সকালে দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের ‘Advance’ কাগজের হেডিং, ‘Dauntless Dinesh Dies at Dawn!’ শিরোনামটি দিয়েছিলেন পত্রিকার তৎকালীন চিফ সাব-এডিটর শ্রীইন্দু মিত্র।
আনন্দবাজার পত্রিকার ৭-৭-৩১, ২২শে আষাঢ়, ১৩৩৮-এর সংস্করণেও ছাপা হয়েছিল খবর, ‘সোমবার শেষরাত্রিতে দীনেশ গুপ্তের ফাঁসি হইয়া গিয়াছে। মঙ্গলবার প্রাতে কলিকাতার প্রতি রাস্তার মোড়ে বহু পুলিশ দেখা যায়। ইহা হইতেই প্রবল অনুমান হয় যে, ফাঁসি হইয়া গিয়াছে।’
দীনেশের মৃত্যুদণ্ডের নেপথ্যে যিনি ছিলেন পুরোধা, সেই Ralph Reynolds Garlick-কে অচিরেই প্রাণ দিতে হয়েছিল। জয়নগরের বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য ১৯৩১-এর ২৭ জুলাই, দীনেশের ফাঁসির কুড়ি দিনের মধ্যে, ভরা এজলাসে গুলি করে খুন করেছিলেন গার্লিক সাহেবকে।
কারাবাস চলাকালীন আত্মীয়পরিজনদের একাধিক চিঠি লিখেছিলেন দীনেশ। যাতে ধরা রয়েছে উনিশের যুবকের চিন্তার ব্যাপ্তি, জীবনদর্শনের গভীরতা।
বউদিকে যেমন লিখছেন, ‘যে দেশে মানুষকে স্পর্শ করিলে মানুষের ধর্ম নষ্ট হয়, সে দেশের ধর্ম আজই গঙ্গার জলে বিসর্জন দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত’, ভাই-কে তেমনই দিশা দেখাচ্ছেন জীবনবোধের, ‘যুগ যুগ ধরিয়া এই যাওয়া-আসাই বিশ্বকে সজীব করিয়া রাখিয়াছে, তাহার বুকের প্রাণস্পন্দনকে থামিতে দেয় নাই।’ আর সান্ত্বনার পরশ দিতে চাইছেন শোকাচ্ছন্ন মা-কে, ‘তাঁহার বিচার চলিতেছে। তাঁহার বিচারের উপর অবিশ্বাস করিও না, সন্তুষ্ট চিত্তে সে বিচার মাথা পাতিয়া নিতে চেষ্টা করো।’
ফাঁসির আগের সন্ধ্যায় গর্ভধারিণীকে লেখা শেষ চিঠি তুলে দিলাম হুবহু।
আলিপুর সেন্ট্রাল জেল,
কলিকাতা
৫টা সন্ধ্যা
৬.৭.৩১
মা,
তোমার সঙ্গে আর দেখা হইবে না। কিন্তু পরলোকে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করিব।
তোমার জন্য কিছুই কোনওদিন করিতে পারি নাই। সে না-করা যে আমাকে কতখানি দুঃখ দিতেছে, তাহা কেউ বুঝিবে না, বুঝাইতে চাই-ও না।
আমার যত দোষ, যত অপরাধ দয়া করিয়া ক্ষমা করিও।
আমার ভালবাসা ও প্রণাম জানিও।
—তোমার নসু।
বিনয়-বাদল-দীনেশ। স্বাধীনতার পর ডালহৌসি স্কোয়ার নতুন ভাবে চিহ্নিত হওয়া যাঁদের নামে, ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে যাওয়া যাঁদের অসমসাহসী রাইটার্স অভিযান।
বিনয়কৃষ্ণ বসু। জন্ম: ১৯০৮, সুধীর (বাদল) গুপ্ত। জন্ম: ১৯১১, দীনেশচন্দ্র গুপ্ত। জন্ম: ১৯১২
প্রয়াত ব্যক্তিদের মৃত্যুকাল লেখাই রীতি। এই লেখায় যা অনুসরণ করার কোনও প্রয়োজন দেখছি না। ওঁরা মৃত্যুঞ্জয়ী। কী এসে যায় শারীরিক পূর্ণচ্ছেদে, অমরত্বের আশ্বাস যখন বিস্তৃত স্থান-কাল-পাত্রের সীমানা ছাড়িয়ে?
০৯. বিচারপতি তোমার বিচার
জঙ্গল ঠিক বলা যায় না। গাছগাছালি আর ঘন ঝোপঝাড় বেশ কিছুটা অংশ জুড়ে। তপসিয়া থেকে পায়ে হেঁটে লাগল মাত্র মিনিট সাতেক। সবে আলো ফুটেছে ভোরের। রাতের গন্ধ এখনও মুছে যায়নি পুরো। চারদিকে একবার তাকায় উনিশ বছরের যুবক। কলকাতায় সে এসেছে আগে বেশ কয়েকবার। এই জায়গাটার কথা জানাই ছিল না। শহরের মধ্যেই, অথচ কে বলবে শহর? এত শান্ত, এত সবুজ? কিন্তু সুনীলদা এই কাকভোরে এখানে নিয়ে এল কেন?
