সাড়ে বারোটা থেকে পৌনে একটার মধ্যে যখন রাইটার্সের অলিন্দ দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তিন বঙ্গসন্তান, পুলিশ আক্ষরিক অর্থেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। লালবাজার থেকে বাড়তি সশস্ত্র পুলিশ এসে পজিশন নেওয়ার আগে পর্যন্ত ইনস্পেকটর জেনারেল ক্রেগ এবং সার্জেন্ট ফোর্ড ছাড়া কারও সাহসে কুলোয়নি যুবক ত্রয়ীর মোকাবিলা করার। অথচ তিনতলাতেই ছিল এক ডজন পদস্থ পুলিশ অফিসারের ঘর। দোতলায় নেমে আসার একাধিক সিঁড়িও ছিল। ত্রাস সঞ্চারিত হয়েছিল এতটাই, কর্তাদের কেউ নামেননি। নামার চেষ্টাও করেননি।
পরিস্থিতি বদলাল বাড়তি বাহিনী আসার পর। পাসপোর্ট অফিসের সংলগ্ন যে ঘরটিতে তখন বিনয়-বাদল-দীনেশ, তা কার্যত ঘিরে ফেলল পুলিশ। দীনেশ দরজা ফাঁক করে দু’রাউন্ড গুলি চালালেন পুলিশকে লক্ষ্য করে। পুলিশ সতর্ক ছিল, গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। পালটা ফায়ার করলেন পুলিশ অফিসার জোনস। দীনেশের গলা থেকে যন্ত্রণাকাতর ‘উঃ’ ছিটকে বেরল। গুলি সম্ভবত লেগেছে কাঁধে।
ঘরের ভিতর তিন যুবক। বাইরে দরজার দু’দিকে সশস্ত্র পুলিশ। দীর্ঘ অলিন্দের দখল নিয়ে ফেলেছে উর্দিধারীরা। পরস্পরের মধ্যে দৃষ্টিবিনিময় হয় বিপ্লবীত্রয়ীর। প্রাণ নিয়ে বেরনো দুঃসাধ্য হবে, জানাই তো ছিল। ধরা পড়া যখন প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে, শেষ হয়ে এসেছে গুলির ভাণ্ডার, প্রস্তুতি শুরু হল মৃত্যুবরণের।
বাদল পকেট থেকে বের করলেন পটাশিয়াম সায়ানাইডের শিশি। ঢেলে দিলেন গলায়। মিনিটখানেকের মধ্যেই নিষ্প্রাণ দেহ ঝুঁকে পড়ল টেবিলের উপর। বাইরে দাঁড়ানো পুলিশ পরপর দুটো গুলির আওয়াজ শুনল ঘরের ভিতর থেকে। বিনয় আর দীনেশ দু’জনেই গুলি চালিয়েছেন নিজেদের মাথা লক্ষ্য করে।
পূর্ব দিকের দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে ডেপুটি কমিশনার বার্টলে দেখলেন, দুটি দেহ পড়ে আছে মাটিতে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে। পুলিশ ঢুকল দরজা ঠেলে।
ঘরের উত্তর-পূর্ব কোণে একটা টেবিল। যার সামনের চেয়ারে বাদল গুপ্তের প্রাণহীন দেহ। মাথা ঢলে পড়েছে টেবিলে। বিনয় আর দীনেশ, দু’জনেই পড়ে আছেন মেঝেতে। দীনেশ সংজ্ঞা হারিয়েছেন। বিনয়ের জ্ঞান রয়েছে তখনও। দীনেশের শুধু মাথা নয়, কাঁধেও বুলেটের ক্ষত, জোনসের ছোড়া গুলিতে।
দীনেশের পাশে পড়ে .৪৫৫ বোরের Webley রিভলভার। চেম্বারে দুটো কার্তুজের খোল। একটা ‘মিসফায়ারড’, অন্যটা ‘ফায়ারড’। বিনয়ের ট্রাউজারের পিছনের পকেটে একটা পাঁচ চেম্বারের .৩৪ বোরের Ivor Johnson রিভলভার। চেম্বারে পাঁচটি ‘ফায়ারড’ কার্তুজের খোল। বাদলের দেহের পাশে পড়ে দুটো .৩২ বোরের ছ’ঘরা আমেরিকান রিভলভার, কিছু কার্তুজ এবং পটাশিয়াম সায়ানাইডের শিশি।
মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও বেশ কিছু কার্তুজের খোল। তিনটি বিদেশি টুপি। জাতীয় কংগ্রেসের দুটি পতাকা ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর একটি পতাকা বিনয়ের ট্রাউজারের পিছনের পকেটে। রাইটার্সের অলিন্দ থেকেও উদ্ধার হল প্রায় গোটা কুড়ি বুলেট হেড।
বাদলের দেহ রওনা দিল মর্গে। বিনয় আর দীনেশকে নিয়ে ছুটল পুলিশের গাড়ি, গন্তব্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। লালবাজারের কর্তারা দিব্যি বুঝতে পারছিলেন, এদের বাঁচিয়ে রাখা দরকার, সুস্থ হলে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে অনেক অজানা তথ্য।
বাংলা তথা ভারত কাঁপিয়ে দেওয়া এই ঘটনা পরের দিন দেশের সমস্ত খবরের কাগজের প্রথম পাতার সিংহভাগ দখল করে নিল। ৯ ডিসেম্বরের আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন তুলে দিলাম নীচে।
[মঙ্গলবার, ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৩৩৭; ইং ৯-১২-১৯৩০]
‘গুলির আঘাতে বাঙ্গলার কারা-বিভাগের ইন্সপেক্টর-জেনারেল নিহত
গতকাল বেলা ১২টার সময় কলিকাতার বুকের উপর রাইটার্স বিল্ডিংয়ে এক বিষম দুঃসাহসিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়া গিয়াছে। ৩ জন বাঙ্গালী যুবক বাঙ্গলার কারা-বিভাগের ইন্সপেক্টর-জেনারেল লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিমসনকে গুলি করিয়া হত্যা করিয়াছে।
বেলা ১২-১৫ মিঃ —১২-৩০ মিনিটের মধ্যে ৩ জন বাঙ্গালী যুবক কারাগার-বিভাগের ইন্সপেক্টর-জেনারেলের অফিসে (রাইটার্স বিল্ডিং) আসিয়া উপস্থিত হয়। কর্নেল সিমসন তখন তাঁহার খাস মুন্সির (পারসন্যাল এ্যাসিস্ট্যান্ট) সঙ্গে তাঁহার অফিসে বসিয়া কথা বলিতেছিলেন। যুবকত্রয় তাঁহার সহিত সাক্ষাতের অভিলাষ ব্যক্ত করিলে চাপরাশি তাহাদিগকে উপরোক্ত কারণে অপেক্ষা করিতে বলে এবং কী কাজের জন্য তাহারা দেখা করিতে চায়, তাহা যথারীতি এক টুকরা কাগজে লিখিয়া দিতে বলে। কিন্তু যুবকগণ ইহা করিতে অস্বীকৃত হয় এবং তাহাকে এক পার্শ্বে ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করে এবং দ্রুতগতিতে কর্নেল সিমসনের প্রতি ৫/৬ বার গুলি নিক্ষেপ করে। গুলির আঘাতে কর্নেল সিমসন তৎক্ষণাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হন। …
কর্নেল সিমসনের ঘর হইতে বাহির হইয়া আততায়ীরা বারান্দা দিয়া চলিয়া আসে। দৌড়াবার সময় তাহারা অফিসগুলির কাঁচের জানালায় এবং সিলিং-এ গুলি করিতে থাকে। রাজস্ব-সচিব মিঃ মারের অফিসের জানালায় গুলির চিহ্ন রহিয়াছে। মিঃ জে. ডব্লিউ. নেলসনের অফিসে গুলির চিহ্ন রহিয়াছে।
অতঃপর তাহারা পাসপোর্ট অফিসে প্রবেশ করে এবং একজন আমেরিকানকে গুলি করে। কিন্তু গুলি ব্যর্থ হয়। কোন চাপরাশীর গায়ে গুলি লাগে নাই।
