—একটা পরীক্ষা নেব আজ… দেখি পাশ করতে পারিস কিনা… ওই গাছটা দ্যাখ…
বেশ দশাসই চেহারা গাছটার। লম্বায় যেমন, চওড়াতেও। একবার দেখলে বেশ একটা সমীহ জাগে। আরেকবার দেখতে ইচ্ছে হয়, সময় নিয়ে। সুনীল সোজা চলে গেলেন গাছের সামনে। পকেট থেকে বার করলেন চক, প্রকাণ্ড গুঁড়ির গায়ে বৃত্ত আঁকলেন একটা।
—এই হল তোর চাঁদমারি। চেম্বারে ছ’টা গুলি আছে। মানে চান্স ওই ছ’টাই। দূরে গিয়ে দাঁড়া… আরও পিছনে… হ্যাঁ… এইবার ঠিক আছে…
সুনীল রিভলভার হাতে তুলে দেন যুবকের। পিঠ চাপড়ে দেন একটু। আগ্নেয়াস্ত্র হাতে পজিশন নেন যুবক, সাতপাঁচ চিন্তা ধেয়ে আসে। স্নায়ু চঞ্চল হয়ে ওঠে।
লক্ষ্যভেদের পরীক্ষা? সুনীলদা আগে বলেনি কেন? বললে মানসিকভাবে কিছুটা প্রস্তুত থাকা যেত। এভাবে হুট করে বললে হয়? নাকি ইচ্ছে করেই আগে বলেনি? কত তাড়াতাড়ি মনকে তৈরি করতে পারি, পরখ করছে? তবে করছে যখন, নিশ্চয়ই কোনও দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবছে। শিরা-ধমনীতে উত্তেজনার স্রোত টের পান যুবক। এবং নিজেই নিজেকে তিরস্কার করেন নিরুচ্চার… এখন উত্তেজিত হলে টার্গেট মিস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা… মনঃসংযোগ দরকার। নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে রিভলভার তাক করেন। পাখির চোখ ওই চক দিয়ে আঁকা বৃত্ত।
সুনীল পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। দেখছেন।
ছ’টার মধ্যে দুটো লক্ষ্যভ্রষ্ট। চারটে ‘বুলস আই’। বিঁধেছে একদম সাদা বৃত্তের মাঝখানে। সুনীল গুঁড়ির কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। শান্ত পায়ে ফিরে এসে জড়িয়ে ধরেন যুবককে… ‘সাবাশ!’
—আমি তা হলে অ্যাকশনের জন্য ফিট, সুনীলদা?
সুনীল হেসে পিঠে হাত রাখেন, ‘অত উতলা হলে চলে?’
.
বিয়েবাড়ির ব্যস্ততাকেও যেন হার মানিয়ে দেবে আয়োজন। সাতসকালেই ভিড় জমিয়েছে ছাত্র-যুবকেরা। তেরঙা পতাকায় সাজানো হচ্ছে সমিতির ঘর। কিন্তু মাঝারি আয়তনের ঘরে কী করে অত লোক ধরবে? খবর তো ছড়িয়েই পড়েছে, আশেপাশের গ্রাম থেকেও ছেলেছোকরারা আসবে দল বেঁধে। বাইরে মঞ্চ বাঁধা ছাড়া উপায় নেই। কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে কাঠের পাটাতন তৈরির, সাদা চাদরে মুড়ে দিয়ে চেয়ার-টেবিল পাতার।
হন্তদন্ত হয়ে তদারকিতে সমিতির কর্তাব্যক্তিরা, যাঁদের বিয়েবাড়ির আগের সন্ধ্যার কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মতো দেখাচ্ছে। হ্যাঁ রে, মাইক তো এখনও এল না? রাস্তায় যে কাগজের পতাকা দিয়ে চেন ঝোলানোর কথা ছিল একটাও তো দেখছি না? আখড়ার ঘরটা ভাল করে ঝাঁট দেওয়ার সময় হল না কারও? তাড়াতাড়ি কর বাবা তোরা, উনি আর ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে এসে পড়বেন যে!
‘উনি’-ই প্রধান অতিথি আজ জয়নগর ব্যায়াম সমিতির বার্ষিক সভায়। ‘উনি’ আসছেন শুনেই উৎসাহের বান ডেকেছে এলাকার সর্বত্র। ‘ওঁকে’ স্বাগত জানাতেই সীমিত সাধ্যে আয়োজনের আড়ম্বর।
গাড়ি যখন ঢুকল ব্যায়াম সমিতির অপ্রশস্ত রাস্তায়, কালো মাথায় ঢেকে গিয়েছে যেদিকে দু’চোখ যায়। জয়ধ্বনি উঠছে মুহুর্মুহু। সৌম্যকান্তি দীর্ঘদেহী মানুষটি গাড়ি থেকে নামলেন। দৃঢ় পদচারণায় উঠলেন মঞ্চে। শুরুতেই উচ্চারণ করলেন, ‘বন্দে মাতরম!’
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু! পরিচিত চেহারাটা দেখে উল্লাসে ফেটে পড়ল জনতা, সহস্র কণ্ঠের আওয়াজে ধ্বনিত হল ‘বন্দে মাতরম’!
ব্যায়াম সমিতির কর্তা সুনীল চ্যাটার্জীর নজর আটকে যায় একেবারে সামনের সারিতে জয়ধ্বনি দিতে থাকা যুবকের উপর। শক্তসমর্থ চেহারা, উজ্জ্বল দুটি চোখ। গলার শিরা ফুলিয়ে স্লোগান দিচ্ছে মুষ্টিবদ্ধ হাত ঝাঁকিয়ে। কে ছেলেটা? মুখটা চেনা লাগছে, এলাকারই নিশ্চয়ই, কিন্তু সমিতির আখড়ায় দেখেননি কখনও। এর মতো ছেলেই দরকার এখন। নেতাজি ফিরে যাওয়ার পর খোঁজ নিতে হবে। কে ছেলেটা?
.
—মা.. কলকাতার বাইরে যাচ্ছি কয়েকদিনের জন্য। ফিরতে দেরি হতে পারে।
—কোথায় যাচ্ছিস? ফিরতে দেরি হবে মানে? কত দেরি, কী কাজ? সঙ্গে কে যাচ্ছে? মায়ের প্রশ্নবাণে বিরক্তই বোধ করে ছেলে।
—এখনই বলা যাবে না কত দেরি হবে। সমিতির কাজ আছে।
মধ্যবয়সি মহিলা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, কথা বাড়ান না আর। এতদিনে বুঝে গেছেন, হাজারবার জিজ্ঞেস করলেও আর জবাব পাওয়া যাবে না। মাসকয়েক হল এই এক নতুন হুজুগে মেতেছে ছেলে। কী? না, সমিতি!
টানাটানির হতদরিদ্র সংসার, স্বামী গত হয়েছেন। বড়ছেলে তবু কলকাতায় একটা মোটামুটি চাকরি জুটিয়েছে। যত চিন্তা এখন ছোটছেলেকে নিয়েই। পড়াশুনোয় কোনওদিনই বিশেষ মনোযোগ ছিল না, কিন্তু বয়স আঠারো পেরিয়ে উনিশ। চাকরিবাকরির কিছু একটা চেষ্টাচরিত্র তো করতে হবে এবার। তা না, দিনরাত ওই সমিতিতে পড়ে থাকা। পাড়ার লোকে বলাবলি করে, ওটা নামেই ব্যায়াম সমিতি। আসলে নাকি ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের আখড়া।
শোনার পর থেকেই ভয় আরও গাঢ় হয়েছে মনে। ছেলে ছোট থেকেই যা ডাকাবুকো প্রকৃতির, কোনও বিপদে জড়িয়ে পড়বে না তো ওই স্বদেশিদের পাল্লায় পড়ে? এই যে বলছে, ফিরতে দেরি হবে…কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কিচ্ছুটি বলবে না। ভয় হবে না? ছেলের অবশ্য তাতে থোড়াই কেয়ার।
—চিন্তা কোরো না মা.. বলছি তো..বেশি দেরি হলে চিঠি লিখব..
.
‘Lt. Col. Simpson was shot dead. Mr J W Nelson, judicial secretary, was wounded in the leg. Another bullet narrowly missed Mr. A. Marr, Finance member….’
