৮ ডিসেম্বর, ১৯৩০।
রাইটার্স বিল্ডিং-এর মেন গেটের সামনে যখন ট্যাক্সিটা এসে থামল, ঘড়িতে সোয়া বারোটা। গেটে প্রহরারত পুলিশ অফিসার দেখলেন, ট্যাক্সি থেকে নামছেন তিন যুবক। ধোপদুরস্ত ইউরোপিয়ান সাজপোশাক ত্রয়ীর। টুপি-কোট-টাই-ট্রাউজার-বুটজুতো। ড্রাইভারের ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তিনজন সপ্রতিভ ভঙ্গিতে যখন ঢুকলেন, সন্দেহের উদ্রেক হওয়ার ন্যূনতম কারণ পেলেন না পুলিশ অফিসার বা তাঁর সহযোগী কনস্টেবলরা।
সিঁড়ি দিয়ে যখন প্রত্যয়ী পদক্ষেপে দোতলায় উঠছেন বিনয়-বাদল-দীনেশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিম্পসন তখন নিজের চেয়ারে বসে একটি চিঠি লিখছেন। পাশে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত আপ্তসহায়ক জে সি গুহ আর হেড চাপরাশি ভাগল খান। দরজার বাইরে সহকারী চাপরাশি ফাগু সিং।
রাইটার্সের দোতলার বারান্দা। লম্বা, পশ্চিম থেকে চলে গেছে পূর্বে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডান দিকে বেশ কিছুটা গিয়ে পশ্চিমপ্রান্তের শেষে সিম্পসনের অফিস। অন্য দিনের মতোই চেহারা সেদিনের করিডরের। সার দিয়ে অফিসঘর সাহেবদের, যার সামনে ভাবলেশহীন মুখে দাঁড়িয়ে আরদালিরা। ফাইলপত্র বগলে করণিকদের হেঁটে যাওয়া ধীরেসুস্থে। অফিসারদের দর্শনপ্রার্থী যাঁরা, তাঁরা ঘরগুলির সামনে বেজার মুখে অপেক্ষমাণ। কে জানে কখন ডাক আসবে!
তিন যুবক দ্রুতপায়ে হেঁটে এসে থামলেন সিম্পসন সাহেবের ঘরের সামনে। ফাগু সিং তাকাল জিজ্ঞাসু চোখে।
—সাব সে মিলনা হ্যায় আপ লোগো কো?
বিনয় উত্তর দিলেন।
—হ্যাঁ, সাহেব আছেন?
—আছেন, তবে ব্যস্ত। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল আপনাদের? ভিজিটিং কার্ড থাকলে দিন। না থাকলে ওই রেজিস্টারে নাম লিখুন। আমি জানিয়ে রাখছি সাহেবকে। ওঁর সময় হলে ডাকবেন। ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।
আর অপেক্ষা! ভাগল খান বেরিয়ে এসেছেন ভিতর থেকে তখন। দুই চাপরাশিকেই ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়লেন ত্রয়ী। কোটের ভিতরে থাকা রিভলভার উঠে এল হাতে।
সিম্পসন মুখ তুলে দেখলেন, তিন যুবক টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে, রিভলভার তাক করে। আপ্তসহায়ক গুহমশাই আতঙ্কে পিছিয়ে গেলেন কয়েক পা। এবং দাঁড়িয়ে দেখলেন বজ্রাহত, তিন মূর্তির রিভলভার থেকে ছিটকে আসা একঝাঁক গুলি ঝাঁঝরা করে দিয়েছে সিম্পসনের শরীর। নড়ারও সুযোগ পাননি আইজি প্রিজ়নস। টেবিলেই ঢলে পড়েছেন, নিমেষে নিঃশেষিত হয়েছে প্রাণবায়ু।
সংবিৎ ফিরে পেয়ে গুহবাবু দৌড়লেন দরজার দিকে, ভয়ার্ত আর্তনাদ সমেত। দীনেশ রিভলভার তাক করলেন, কিন্তু ট্রিগারে চাপ দিলেন না। পড়িমরি করে দরজা ঠেলে বারান্দায় বেরিয়েই আপ্তসহায়ক ছুটলেন পশ্চিম দিকে। গলা ফাটিয়ে ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার করতে করতে। ফাগু সিং ছুটলেন পাশের ঘরের এক অফিসারের কাছে। নাম মিস্টার টাফনেল ব্যারেট। যিনি ফোন করলেন ঢিলছোড়া দূরত্বের লালবাজারে, ‘Shootout here in Writers! Simpson shot dead. Armed reinforcement needed at the earliest.’
কলকাতা পুলিশের নগরপাল তখন স্যার চার্লস টেগার্ট। গাড়ি ডাকা মানে অমূল্য কয়েক মিনিট বরবাদ। লালবাজারে উপস্থিত রিজার্ভ ফোর্সের সশস্ত্র জওয়ানদের নিয়ে নগরপাল দৌড়লেন রাইটার্সে। লালবাজার থেকে রাইটার্স পায়ে হেঁটেই লাগে বড়জোর দু’-তিন মিনিট। দৌড়লে তো মিনিটখানেক। বাহিনীসহ পৌঁছে গেলেন টেগার্ট।
বাংলার ইনস্পেকটর জেনারেল অফ পুলিশ ক্রেগের অফিস ছিল তিনতলায়। রিভলভার হাতে তিনিও ততক্ষণে নেমে এসেছেন দোতলায়। কোথায় আততায়ীরা? যারা অবলীলায় খুন করল সিম্পসনকে?
কার্যসিদ্ধির পর বিনয়-বাদল-দীনেশ তখন হেঁটে চলেছেন রাইটার্সের বারান্দা দিয়ে। পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে। হাতে রিভলভার তিনজনেরই। করিডরের ঘরে ঘরে তখন ‘সেই বার্তা রটি গেছে ক্রমে’। শুনশান হয়ে গেছে বারান্দা। যে যেখানে পেরেছেন, ঢুকে পড়েছেন। কোনও ঘর থেকে কৌতূহলী মুখ উঁকিঝুঁকি মারলেই গুলি চালাছেন তিন বিপ্লবী। বেশ কয়েকটি ঘরের কাঁচের শার্সি ভেঙে পড়েছে ঝনঝন করে। স্তব্ধ বারান্দায় বীর ত্রয়ীর কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ‘বন্দে মাতরম’। ব্রিটিশরাজের প্রশাসনিক ভরকেন্দ্র মুখরিত জাতীয়তাবাদী স্লোগানে, যা দূরতম কল্পনাতেও কেউ কখনও ভাবেনি।
ফোর্ড নামের এক সার্জেন্ট সেদিন রাইটার্সে এসেছিলেন ব্যক্তিগত কাজে। সঙ্গে অস্ত্র ছিল না। সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে লক্ষ করছিলেন সব। ইনস্পেকটর জেনারেল ক্রেগ দোতলায় নেমে এসে গুলি চালালেন তিন যুবককে লক্ষ্য করে। গুলি লাগল না। ফোর্ড রিভলভার কেড়ে নিলেন ক্রেগের হাত থেকে। ফায়ার করলেন। নিশানাভ্রষ্ট।
বিনয়-বাদল-দীনেশ গতি বাড়ালেন। চেম্বারের গুলি শেষ হয়ে এসেছে। রি-লোড করা প্রয়োজন। থামলেন একটা ঘরের সামনে, যেখানে বসেন পদস্থ আধিকারিক মিস্টার নেলসন। পাশেই ছিল পাসপোর্ট অফিস। বিনয়-বাদল রিভলভারে গুলি ভরতে সেখানে ঢুকলেন। যে কয়েকজন কর্মী ছিলেন ঘরে, ছুটে বেরিয়ে এলেন ভয়ে।
দীনেশ যখন মিস্টার নেলসনের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে রিভলভার রি-লোড করছেন দ্রুত, দরজা ঠেলে উঁকি দিলেন নেলসন। ঝটিতি ফায়ার করলেন দীনেশ, গুলি লাগল নেলসনের ঊরুতে। তাড়া করে নেলসনের ঘরে ঢুকে পড়লেন দীনেশ। নেলসন শক্তসমর্থ চেহারার অধিকারী ছিলেন, আহত অবস্থাতেই ধস্তাধস্তি শুরু হল দীনেশের সঙ্গে। কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন রিভলভার। গুলির আওয়াজে পাশের পাসপোর্ট অফিস থেকে লোডেড রিভলভার নিয়ে বেরিয়ে এলেন বিনয়-বাদল। নেলসনের মাথায় রিভলভারের বাঁট দিয়ে সজোরে আঘাত করলেন বিনয়। নেলসন মাটিতে পড়ে গেলেন। এবং দ্রুত সামলে নিয়ে রক্তাক্ত অবস্থাতেই কোনওমতে বেরলেন ঘর থেকে।
