—কিন্তু কার কবিতা তুমি স্থির হয়ে পড়ো?
—রবীন্দ্রনাথের।
—কেন?
—রবীন্দ্রনাথের কবিতার মধ্যেই আমি ‘গীতা’র বাণী আমার মাতৃ-কণ্ঠে খুঁজে পাই, আরও পাই এই পৃথিবী ও তার অগণিত মানুষকে, পাই আলো-বাতাস জীব-জন্তু ও সবুজ গাছগুলোকে।
—রবীন্দ্রনাথের কবিতা তোমাকে চঞ্চল করে না?
—অভিভূত করে, ক্ষিপ্ত করে না। ভাল লাগে এত বেশি যে, আমার রক্তধারা বিবশ হয়ে আসে, মনে রোমাঞ্চ লাগে। আমি স্থির হই।
.
সাহিত্যরস উপভোগের থেকে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ অবশ্য তখন বাকি রয়েছে দীনেশের।নেতৃস্থানীয়রা দীনেশ আর বাদলকে ডেকে পাঠালেন কলকাতায়। বিনয় আগেই এসে পৌঁছেছেন। বিনয়-বাদল-দীনেশের উপর দায়িত্ব দেওয়া হল দুঃসাহসিক কাজের। এমন কাজ, যা আগামীতে দুঃস্বপ্নেও তাড়া করবে ইংরেজদের।
কী কাজ? বাংলার আইজি (প্রিজ়নস) তখন লেফটেন্যান্ট কর্নেল নরম্যান সিম্পসন। কারাবন্দি বিপ্লবীদের উপর নির্মম নির্যাতন করে পৈশাচিক আনন্দ পেতেন সিম্পসন। রাজদ্রোহের মামলায় কেউ জেলে এলেই তাঁকে যথেচ্ছ লাঠিপেটা করা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল আইজি সাহেবের। কখনও কখনও দাগি কয়েদিদের লেলিয়ে দিতেন বিপ্লবীদের উপর। তাঁর নির্দেশেই রাজবন্দি সুভাষচন্দ্র বসুকে একবার জেলের গুন্ডা-কয়েদিরা নির্মম ভাবে মেরেছিল। সুভাষের সহবন্দি তখন দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন, কিরণশংকর রায়, সত্য গুপ্ত প্রমুখ। সকলেই সেদিন মার খেয়েছিলেন অল্পবিস্তর।
এই সিম্পসনের কী করে আর বাঁচার অধিকার থাকে? জল্লাদ সাহেবকে প্রাণে মারতে হবে, কিন্তু কোথায়, কী ভাবে? যাতায়াতের পথে বা অন্য কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে মারাই যায় নিখুঁত ছক কষতে পারলে, কিন্তু সেটা স্রেফ আর পাঁচটা বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র আক্রমণের মতোই বিবেচিত হবে। লক্ষ্য তো তা নয়। লক্ষ্য এমন তীব্রতম অভিঘাত তৈরি করা, যাতে থরহরিকম্প হবে ব্রিটিশ সরকার, যাতে আপাদমস্তক নড়ে যাবে অত্যাচারী শাসকের মনোবল।
সিদ্ধান্ত হল অভূতপূর্ব। সিম্পসনকে হত্যা করা হবে তাঁর অফিসে, খোদ রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। সেই রাইটার্সে, যা বাংলায় ব্রিটিশরাজের প্রশাসনিক সদর দফতর, যা ইংরেজ প্রভুত্বের সদম্ভ প্রতীক হয়ে বিরাজমান তৎকালীন ডালহৌসি স্কোয়ারে। বার্তা দিতে হবে, অন্যায় অত্যাচারের ক্ষমা নেই। প্রয়োজনে শাসকের রাজদরবারেই অভিনীত হবে প্রতিশোধের নাট্যরূপ। ক্ষমতা থাকলে বাঁচাক সিম্পসনকে।
জানাই ছিল, কাজ সম্পন্ন হলেও অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। মৃত্যু বা গুরুতর আহত হওয়া নিশ্চিত বিনয়-বাদল-দীনেশের, যাঁরা সম্ভাব্য ঘাতক হিসাবে নিজেদের নির্বাচনে আপাদমস্তক রোমাঞ্চিত তখন। যাঁদের তখন ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য, চিত্ত ভাবনাহীন।’
পরিকল্পনার খুঁটিনাটি জানলেন মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। কেনা হল বিদেশি সাজপোশাক। জোগাড় হল আগ্নেয়াস্ত্র এবং যথেষ্ট পরিমাণে কার্তুজ। ওয়ালিউল্লা লেন থেকে বিনয়কে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল মেটিয়াবুরুজে রাজেন্দ্রনাথ গুহের বাড়িতে। রাজেন্দ্রনাথ যে গোপনে বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, খুব বেশি লোক জানতেনই না। বিপ্লবী রসময় শূর রাতের অন্ধকারে বিনয়ের সঙ্গে দেখা করে আসতেন।
বাদল আর দীনেশকে রাখা হল নিউ পার্ক স্ট্রিটের এক গোপন আস্তানায়। তত্ত্বাবধানে থাকলেন নিকুঞ্জ সেন, বাদলের স্কুলের ‘মাস্টারমশাই’।
‘অপারেশন সিম্পসন’-এর দিন স্থির হল ৮ ডিসেম্বর। খিদিরপুরের পাইপ রোডের কাছে মিলিত হবেন ত্রিমূর্তি, এমনই ঠিক হল। নিকুঞ্জ নির্দিষ্ট সময়ে নিউ পার্ক স্ট্রিটের ডেরায় পৌঁছলেন এবং স্তব্ধ হয়ে গেলেন ঘরের দৃশ্য দেখে। অভাবনীয়!
ইউরোপীয় সাজে সজ্জিত হয়ে তৈরি বাদল-দীনেশ। একটু পরেই রওনা হওয়ার কথা মৃত্যুযাত্রায়, অথচ ভ্রুক্ষেপহীন দীনেশ পাঠ করছেন রবীন্দ্র-কবিতা। বাদল শুনছেন মন্ত্রমুগ্ধ।
‘যে মস্তকে ভয় লেখে নাই লেখা, দাসত্বের ধূলি
আঁকে নাই কলঙ্কতিলক।’
….
‘তার পরে দীর্ঘ পথশেষে
জীবযাত্রা-অবসানে ক্লান্তপদে রক্তসিক্ত বেশে
উত্তরিব একদিন শ্রান্তিহরা শান্তির উদ্দেশে
দুঃখহীন নিকেতনে।’
নিকুঞ্জের উপস্থিতি টের পেতেই সচকিত হয়ে ওঠেন বাদল।
—মাস্টারমশাই, আমরা রেডি।
দীনেশ বন্ধ করলেন কাব্যগ্রন্থ। দুই বন্ধু উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার ছেড়ে। কোটের পকেটে রাখা রিভলভার আর গুলি ঠিকঠাক রয়েছে কিনা শেষবারের মতো দেখে নিলেন। বাদল পকেটে ঢুকিয়ে নিলেন পটাশিয়াম সায়ানাইডের শিশি। হ্যাঁ, প্রস্তুতি সম্পূর্ণ। এবার রওনা দেওয়া যেতে পারে।
নিকুঞ্জ সেনের সুহৃদ বিপ্লবী ভূপেন্দ্রকিশোর রক্ষিত-রায়ের ‘ভারতে সশস্ত্র বিপ্লব’ বইটিতে বিস্তারে লিপিবদ্ধ আছে রাইটার্স যাত্রার প্রাক্মুহূর্তে দীনেশের কবিতাপাঠের অনুপুঙ্খ বর্ণনা।
যাত্রা হল শুরু। ঘড়িতে বেলা বারোটা। পাইপ রোডে বিনয়কে নিয়ে পৌঁছলেন রসময় শূর। তার কয়েক মিনিটের মধ্যে বাদল-দীনেশকে নিয়ে হাজির হলেন নিকুঞ্জ। তিন যুবক উঠে বসলেন একটি ট্যাক্সিতে। রওনা দিল ট্যাক্সি। গন্তব্য রাইটার্স। তিন বিপ্লবীর ‘The last ride together’।
.
বাকি ইতিহাস বহুপঠিত-বহুচর্চিত-বহুআলোচিত। যার ইতিবৃত্ত সবিস্তার নথিভুক্ত রয়েছে সে যুগের স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের ফাইলে। ‘Shooting outrage in Writers Buildings on 8.12.30, Murder of IG Prisons’। ফাইল নম্বর 59/19/30। সেই ফাইল এবং সংশ্লিষ্ট প্রামাণ্য নথি থেকে রইল ঘটনাপ্রবাহ। ঠিক কী ঘটেছিল, কখন ঘটেছিল, এবং কী ভাবে?
