বিনয়কৃষ্ণ বসুর জন্ম ১৯০৮-এর ১১ সেপ্টেম্বর। মুনশিগঞ্জ জেলার রোহিতভোগ গ্রামে। ম্যাট্রিকুলেশনের পর ডাক্তারি পড়তে পড়তেই বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের সংস্পর্শে আসা এবং গুপ্ত সংগঠন ‘মুক্তিসংঘ’-য় যোগদান। বিপ্লবী কার্যকলাপে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ায় শেষ হয়নি ডাক্তারি পড়া।
পলাতক বিনয়ের সন্ধান পেতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করল ব্রিটিশরাজ। প্রকাশ্যে খুন করেছে আইজি-কে, একে ধরতেই হবে যে করে হোক। ছবি ছাপিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হল রাজ্যের সর্বত্র। বাসস্ট্যান্ডে-রেলস্টেশনে-হাটেবাজারে-রাস্তাঘাটে, কোথায় নয়? বিনয় ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন, খবর ছিল পুলিশের কাছে। ঢাকা থেকে ছাড়া প্রতিটি ট্রেন স্টেশনে স্টেশনে থামিয়ে শুরু হল মরিয়া চিরুনিতল্লাশি।
ওই নিশ্ছিদ্র নজরদারির মধ্যে যেভাবে বিনয় ঢাকা থেকে পালিয়ে এলেন কলকাতায়, রোমহর্ষক। পুলিশের নজর এড়িয়ে লোম্যান-নিধনের নায়ককে কলকাতায় নিয়ে আসার দায়িত্ব নিলেন বিনয়ের সতীর্থ বিপ্লবী সুপতি রায়।
গ্রাম্য চাষির সাজে সুপতি সাজালেন বিনয়কে। ছেঁড়া লুঙ্গি, ছেঁড়া গেঞ্জি, মাথায় নোংরা গামছা জড়ানো। বিনয় ছিলেন গৌরবর্ণ, সুপুরুষ। চেহারায় আভিজাত্যের সিলমোহর। ছদ্মবেশ যতই নিখুঁত হোক, চাষির বেশে বেমানানই লাগছিল বিনয়কে। কিন্তু কী আর করা! নকল সাজে কতটাই বা বদলানো যায় আসল চেহারা?
সুপতি নিজেও বারকয়েক সাজ বদলালেন। কখনও জমিদারপুত্রের বেশভূষা, কখনও চাষির। পুলিশের ট্রেন-তল্লাশি থেকে বাঁচতে কখনও দু’জনে গা ঢাকা দিলেন প্ল্যাটফর্মের ওয়েটিং রুমে, কখনও ট্রেনযাত্রায় চাদরমুড়ি দিয়ে অসুস্থ রোগীর ভূমিকায় অভিনয় করতে হল বিনয়কে। কিছু পথ ট্রেনে, কিছু পথ স্টিমারে অতিক্রম করে দু’জনে পৌঁছলেন দমদম স্টেশনে। শিয়ালদহে নামার ঝুঁকি নেওয়া গেল না। বিনয়ের ছবিতে ছবিতে স্টেশন-চত্বর ছয়লাপ, খবর পাঠিয়েছিলেন কলকাতার বিপ্লবীরা।
সুপতির কাজ ছিল নিরাপদে বিনয়কে কলকাতাস্থিত নেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করলেন নিখুঁত। ৩ সেপ্টেম্বর বেলা দশটা নাগাদ বিনয়কে নিয়ে সুপতি উপস্থিত হলেন ওয়েলেসলি স্কোয়ারের উত্তর দিকে ৭নং ওয়ালিউল্লা লেনে। যেখানে একটি দোতলা বাড়িতে গোপন আস্তানায় অপেক্ষায় ছিলেন বিপ্লবী হরিদাস দত্ত এবং রসময় শূর। যাঁরা সোল্লাসে জড়িয়ে ধরলেন বিনয়কে।
.
স্বাধীনতা আন্দোলনে বাদল গুপ্তের হাতেখড়ি Bengal Volunteers থেকেই। ঢাকার বিক্রমপুর অঞ্চলের পূর্ব শিমুলিয়া গ্রামে জন্ম ১৯১২ সালে। ছাত্রাবস্থা কেটেছিল বানারিপাড়া হাইস্কুলে। যে স্কুলের মাস্টারমশাই নিকুঞ্জ সেন নিজে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে এবং যাঁর প্রভাবেই বাদলের যোগ দেওয়া B.V.-র সংগঠনে। যাঁর কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিপ্লবীদের গল্প শুনতেন বাদল।
—মাস্টারমশাই, ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকীর ঘটনাটা আর একবার বলুন না…
ওই কিশোর বয়সেই বাদল পরিচয় দিলেন চমকপ্রদ সাংগঠনিক ক্ষমতার। ক্রমে সমিতিতে উন্নীত হলেন পদমর্যাদার গুরুত্বে। নিকুঞ্জ সেন এবং অন্য নেতারা বুঝে গেলেন, বয়স আঠারো না ছাড়ালে কী হয়, এ ছেলে বড় দায়িত্ব নেওয়ার জন্য তৈরি।
তৈরি ছিলেন দীনেশ গুপ্তও। ১৯১১ সালে তদানীন্তন ঢাকা জেলার যশোলং গ্রামে জন্ম দীনেশের। ডাকনাম নসু। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে দীনেশ ছিলেন তৃতীয়। ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বেড়াতে আসেন মেদিনীপুরে কর্মরত দাদা যতীশচন্দ্র গুপ্তের বাড়িতে। মেদিনীপুর শহরে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার স্বপ্ন লালনের শুরু তখন থেকেই।
স্বপ্ন পরিণতি পেয়েছিল বছরদুয়েক পর, যখন পরম যত্নে মেদিনীপুরে Bengal Volunteers-এর শাখা গড়ে তুলেছিলেন একক প্রচেষ্টায়। অসামান্য সংগঠক ছিলেন দীনেশ। শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহসই হোক বা বিপ্লবী আদর্শের গ্রামভিত্তিক প্রচার, মেদিনীপুর B.V. ছিল তখনকার বাংলায় অগ্রগণ্য। দীনেশ গুপ্তের প্রশিক্ষিত বিপ্লবীরাই ডগলাস, বার্জ এবং জেমস পেডি— এই তিনজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছিলেন স্থানীয় প্রশাসনকে।
সাহিত্য বড় প্রিয় ছিল দীনেশের। পড়তে ভালবাসতেন আশৈশব। রবীন্দ্রনাথের অন্ধ অনুরাগী। রবিঠাকুরের অজস্র কবিতা-গান ছিল মুখস্থ।
এক অগ্রজ বিপ্লবীর গ্রন্থিত স্মৃতিচারণায় ধরা আছে দীনেশ গুপ্তের নিখাদ রবীন্দ্রপ্রেম। কথোপকথন চলছে অগ্রজের সঙ্গে অনুজের।
—দীনেশ, তুমি কবিতা ভালবাসো?
—বাসি।
—লেখো না কেন?
—ভালবাসি বলেই লিখি না। কারণ, দু’-একটা লিখে দেখেছি, ও আমার হয় না।
—আচ্ছা দীনেশ, তুমি তো ভীষণ চঞ্চল ছেলে, কোন বস্তু পড়বার সময় তুমি শান্ত হয়ে যাও?
—কবিতা।
—গীতার শ্লোকগুলোও কবিতা। তবে একদিন বলেছিলে কেন যে, গীতা পড়বার সময় তোমায় কষ্ট করে মন বসাতে হয়?
—গীতা পড়তে ভাল লাগে, কিন্তু দু’লাইন পড়লেই কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের কথা মনে পড়ে, আর তখুনি ভাবতে বসি, কবে আমাদের যুদ্ধ শুরু হবে, কবে আমি সে যুদ্ধের সৈনিক হব! ব্যস, গীতাপাঠ খতম হয়ে যায়।
