যাবার বেলায় তোমাকে কি বলিব? শুধু এইটুকু বলিয়া আজ তোমাকে আশীর্বাদ করিতেছি, তুমি নিঃস্বার্থপর হও, পরের দুঃখে তোমার হৃদয়ে করুণার মন্দাকিনী-ধারা প্রবাহিত হউক।
আমি আজ তোমাদের ছাড়িয়া যাইতেছি বলিয়া দুঃখ করিও না, ভাই। যুগ যুগ ধরিয়া এই যাওয়া-আসাই বিশ্বকে সজীব করিয়া রাখিয়াছে, তাহার বুকের প্রাণস্পন্দনকে থামিতে দেয় নাই। আর কিছু লিখিবার নাই। আমার অশেষ ভালবাসা ও আশিস জানিবে।
তোমার দাদা
বউদির কাছে তিনি ‘স্নেহের ঠাকুরপো’। ছোটভাইয়ের কাছে ‘স্নেহশীল দাদা’। আর মায়ের কাছে আদরের ‘নসু’।
দীনেশচন্দ্র গুপ্ত।
.
—মাস্টারমশাই, ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকীর ঘটনাটা আর একবার বলুন না…
শিক্ষক সস্নেহে হাসেন কিশোর ছাত্রের দিকে তাকিয়ে।
—গত পরশুই তো শুনলি। আর কতবার শুনবি?
—আর একবার শুধু… দোহাই আপনার…
মাস্টারমশাই ফের বলতে শুরু করেন অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ক্ষুদিরাম-প্রফুল্ল চাকীর অকুতোভয় অভিযানের কথা। ছাত্র শুনতে থাকে নিষ্পলক। বিপ্লবীদের উপর ইংরেজদের অত্যাচারের বিবরণ শুনে কখনও রাগে থমথম করে মুখ, কখনও কেঁদেই ফেলে।
এই ছাত্রটিকে বিশেষ স্নেহ করেন মাস্টারমশাই। আর পাঁচজনের থেকে আলাদা। ভারী ডাকাবুকো। স্কুল শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও আবদার করে বিপ্লবীদের গল্প শোনার। আর শুনতে শুনতে যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে যায়।
মাস্টারমশাই বড় একটা অবাক হন না। শুনেছেন ছেলেটির পরিবারের কথা। জানেন, তাঁর এই কিশোর ছাত্রটির দুই কাকা, ধরণীনাথ গুপ্ত এবং নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত আলিপুর বোমা মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে। বোঝেন, এ ছেলের শিরা-ধমনীতে স্বদেশব্রতের স্রোত বইছে।
ক্ষুদিরাম কীভাবে হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে উঠলেন, সেই কাহিনির পুনর্কথনের মধ্যেই মনে হয় মাস্টারমশাইয়ের, এই ছেলেটিকে সমিতিতে ভর্তি করে নিলে হয় না? বয়স কম, কিন্তু সমিতির কাজে যা দরকার, সেটা তো আছে পূর্ণ মাত্রায়। দেশের জন্য নিখাদ আবেগ। আর বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস।
—এই শোন, সমিতিতে আসিস তো কাল সন্ধের দিকে একবার…
চোখে খুশি উপচে পড়ে ছেলেটির। সমিতির কাজ করার ভীষণ ইচ্ছে তার। মাস্টারমশাইকে বলতে সাহসে কুলোচ্ছিল না এতদিন। যদি না বলে দেন!
হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে বাড়ির দিকে রওনা দেয় কিশোর।
আসল নাম সুধীর গুপ্ত। সে নামে কেউ ডাকে না অবশ্য। সবাই ডাকনাম ধরেই ডাকে। বাদল।
বাদল গুপ্ত।
.
সাল, ১৯২৮। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে স্বাধীনতাকামী তরুণদের নিয়ে গঠিত হল ‘Bengal Volunteers’। সামগ্রিক নেতৃত্বে থাকলেন মেজর সত্য গুপ্ত। সর্বাধিনায়ক (GOC—General Officer Commanding) সুভাষচন্দ্র বসু স্বয়ং। ক্রমে Bengal Volunteers (B.V.) হয়ে উঠল বাংলার সবচেয়ে সক্রিয় বিপ্লবী সংগঠন। যার শাখা ছড়িয়ে পড়ল জেলায়-জেলায়, শহরে-শহরে, গ্রাম-গ্রামান্তরে।
শৌর্যের অনুশীলন, শৃঙ্খলার পাঠ এবং দেশের জন্য যে-কোনও ত্যাগস্বীকারে প্রস্তুত থাকা—এই ত্রিমুখী লক্ষ্যেই পথ চলা শুরু B.V.-র। বঙ্গজ বিপ্লবীদের মধ্যে নেতৃস্থানীয়দের অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন এই সংগঠনের সঙ্গে।
কাকে ছেড়ে কার কথা লিখি? চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী। ময়মনসিংহে সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ। ঢাকায় মদনমোহন ভৌমিক। কলকাতায় বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী, ভূপেন্দ্রকুমার দত্ত প্রমুখ। বরিশালে সতীন সেন এবং মনোরঞ্জন গুপ্ত। রাজশাহিতে প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী এবং আরও অনেকে।
তিরিশের দশকের শুরুর দিক তখন। বিপ্লবীদের উপর পুলিশের দমন-পীড়ন নীতি ক্রমশ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গিয়েছে। চলছে কথায় কথায় ধরপাকড়, মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়ে জেলবন্দি রাখা, জেলে পাশবিক নির্যাতন। Bengal Volunteers-এর শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রতিবাদ প্রয়োজন, প্রয়োজন সশস্ত্র প্রত্যাঘাতের।
প্রত্যাঘাতের সূচনা ১৯৩০-এর ২৯ অগস্ট সকালে। ঢাকা মেডিক্যাল স্কুল এবং হাসপাতালে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন এক পুলিশ অফিসারকে দেখতে এসেছিলেন ঢাকার তৎকালীন ইনস্পেকটর জেনারেল অফ পুলিশ মিস্টার লোম্যান। সঙ্গে ছিলেন সুপারিন্টেেন্ডন্ট অফ পুলিশ মিস্টার হডসন।
দুই উচ্চপদস্থ পুলিশকর্তা যখন হাসপাতালের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন সশস্ত্র রক্ষী-পরিবেষ্টিত, ঢাকা মেডিক্যাল স্কুলেরই এক ছাত্র সবার অলক্ষ্যে কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন। পনেরো মিটার দূরত্ব থেকে পরপর দুটো গুলি ছুড়লেন। যার প্রথমটা লক্ষ্যভেদ করল অব্যর্থ। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারালেন লোম্যান, যিনি বিপ্লবীদের উপর অকথ্য অত্যাচারে চার্লস টেগার্টের সমকক্ষ হয়ে উঠেছিলেন প্রায়। দ্বিতীয় গুলির নিশানা ছিলেন হডসন। যাঁর কাঁধে বিঁধল বুলেট। ক্ষতস্থান চেপে মাটিতে বসে পড়তে পড়তে যিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘There he is! Get him!’
হাসপাতালের প্রতিটি ইঞ্চি-সেন্টিমিটার হাতের তালুর মতো চিনতেন বিনয়। পুলিশের সাধ্য কী, তাঁকে ধরে, তা-ও আবার ওই ভিড়ের মধ্যে? ফেরার হলেন বাইশ বছরের বিনয়।
