তোমার স্নেহের গোপী।’
০৮. ৮ ডিসেম্বর, ১৯৩০
পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ নয়। গুলি ছিটকে এল প্রায় পনেরো মিটার দূরত্ব থেকে। অব্যর্থ নিশানায় যাঁর শরীরে বিঁধল বুলেট, তিনি মুখ থুবড়ে পড়লেন মাটিতে। এবং আর উঠলেন না।
দ্বিতীয় বুলেট নিশানাচ্যুত হল। এবার যাঁকে লক্ষ্য করে ছোড়া, তাঁর বুকে নয়, লাগল কাঁধে। যিনি ক্ষতস্থানে হাত চেপে বসে পড়তে পড়তেই সশস্ত্র রক্ষীদের উদ্দেশে চিৎকার করে উঠলেন, ‘There he is! Get him!’
কর্তাদের একজন মাটিতে পড়ে গুলিবিদ্ধ। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, প্রাণহীন। আরেকজনের কাঁধে আঘাত করেছে বুলেট। হতভম্ব রক্ষীরা আতঙ্কের ঘোর কাটিয়ে যতক্ষণে তাড়া করলেন সাদামাটা ফতুয়া আর ধুতি পরা আততায়ীকে, দেরি হয়ে গেছে কিছুটা। উল্কাবেগে ছুটেছেন যুবক, চলে গেছেন নাগালের বাইরে। আপ্রাণ ধাওয়া করেও ব্যর্থ হল বাহিনী। কাউকে তাড়া করা নেহাত সহজও নয় ওই থিকথিকে ভিড়ের মধ্যে।
ভিড় অবশ্য স্বাভাবিকই। ঢাকা মেডিক্যাল স্কুল এবং হাসপাতালের জনাকীর্ণ প্রাঙ্গণ। আশেপাশের জেলা থেকে আসা রোগীদের ভিড় অবিশ্রান্ত। যা সামলাতে হিমশিম ডাক্তারবাবুরা। অ্যাম্বুলেন্স ঢুকছে-বেরচ্ছে, স্ট্রেচার নিয়ে ব্যস্তসমস্ত চলাচল হাসপাতালের কর্মীদের। আর বইখাতা নিয়ে ছাত্রদের আসা-যাওয়া তো আছেই। আছে এদিক-সেদিক পড়ুয়াদের জটলা-আড্ডা-হইহল্লা। যেমন হয়ে থাকে।
ওই ভিড়ের মধ্যে দিয়েই পালিয়ে গেলেন যুবক। এমন কাণ্ড ঘটিয়ে, যা কল্পনাতীত ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের। যা বাংলায় তো বটেই, সাড়া ফেলে দিল সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্বাসী বিপ্লবীদের মধ্যে আসমুদ্রহিমাচল।
হত্যাকারী অজ্ঞাতপরিচয় থাকলেন না। নামধাম জানা গেল সহজেই। পাওয়া গেল ছবি। খোঁজখবর দিতে পারলে আর্থিক পুরস্কারের প্রতিশ্রুতিসহ ‘সন্ধান চাই’-এর হাজার হাজার ছবি ছাপানো হল ফেরারি যুবকের। ছবির নীচে বড় বড় অক্ষরে পলাতকের নাম।
বিনয়কৃষ্ণ বসু।
.
আলিপুর সেন্ট্রাল জেল
কলিকাতা
১৮ জুন, ১৯৩১
বউদি,
তোমার দীর্ঘ পত্র পাইলাম। অ-সময়ে কাহারও জীবনের পরিসমাপ্তি হইতে পারে না। যাহার যে কাজ করিবার আছে, তাহা শেষ হইলেই ভগবান তাহাকে নিজের কাছে টানিয়া লন। কাজ শেষ হইবার পূর্বে তিনি কাহাকেও ডাক দেন না।
তোমার মনে থাকিতে পারে, তোমার চুল দিয়া আমি পুতুল নাচাইতাম। পুতুল আসিয়া গান গাহিত, ‘কেন ডাকিছ আমার মোহন ঢুলী?’ যে পুতুলের পার্ট শেষ হইয়া গেল, তাহাকে আর স্টেজে আসিতে হইত না। ভগবানও আমাদের নিয়া পুতুল নাচ নাচাইতেছেন। আমরা এক একজন পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে পার্ট করিতে আসিয়াছি। পার্ট করা শেষ হইলে প্রয়োজন ফুরাইয়া যাইবে। তিনি রঙ্গমঞ্চ হইতে আমাদের সরাইয়া লইয়া যাইবেন। ইহাতে আপশোস করিবার আছে কি?
ভারতবাসী আমরা নাকি বড় ধর্মপ্রবণ। ধর্মের নামে ভক্তিতে আমাদের পণ্ডিতদের টিকি খাড়া হইয়া উঠে। কিন্তু তবে আমাদের মরণকে এত ভয় কেন? বলি ধর্ম কি আছে আমাদের দেশে? যে দেশে মানুষকে স্পর্শ করিলে মানুষের ধর্ম নষ্ট হয়, সে দেশের ধর্ম আজই গঙ্গার জলে বিসর্জন দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত। সবার চেয়ে বড় ধর্ম মানুষের বিবেক। সেই বিবেককে উপেক্ষা করিয়া আমরা ধর্মের নামে অধর্মের স্রোতে গা ভাসাইয়া দিয়াছি। একটা তুচ্ছ গোরুর জন্য, না হয় একটু ঢাকের বাদ্য শুনিয়া আমরা ভাই-ভাই খুনোখুনি করিয়া মরিতেছি। এতে কি ‘ভগবান’ আমাদের জন্য বৈকুণ্ঠের দ্বার খুলিয়া রাখিবেন, না ‘খোদা’ বেহেস্তে স্থান দিবেন?
যে দেশ জন্মের মত ছাড়িয়া যাইতেছি, যার ধূলিকণাটুকু পর্যন্ত আমার কাছে পরম পবিত্র, আজ বড় কষ্টে তার সম্বন্ধে এসব কথা বলিতে হইল।
আমরা ভাল আছি। ভালবাসা ও প্রণাম লইবে।
স্নেহের ছোট ঠাকুরপো।
.
আলিপুর সেন্ট্রাল জেল
কলিকাতা
৩০ জুন, ১৯৩১
মা,
যদিও ভাবিতেছি কাল ভোরে তুমি আসিবে, তবু তোমার কাছে না লিখিয়া পারিলাম না।
তুমি হয়তো ভাবিতেছ, ভগবানের কাছে এত প্রার্থনা করিলাম, তবুও তিনি শুনিলেন না! তিনি নিশ্চয় পাষাণ, কাহারও বুক-ভাঙা আর্তনাদ তাঁহার কানে পৌঁছায় না। ভগবান কি আমি জানি না, তাঁহার স্বরূপ কল্পনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তবু এ-কথাটা বুঝি, তাঁহার সৃষ্টিতে কখনও অবিচার হইতে পারে না। তাঁহার বিচার চলিতেছে। তাঁহার বিচারের উপর অবিশ্বাস করিও না, সন্তুষ্ট চিত্তে সে বিচার মাথা পাতিয়া নিতে চেষ্টা কর। কি দিয়া যে তিনি কি করিতে চান, তাহা আমরা বুঝিব কি করিয়া?
মৃত্যুটাকে আমরা এত বড় করিয়া দেখি বলিয়াই সে আমাদিগকে ভয় দেখাইতে পারে। এ যেন ছোট ছেলের মিথ্যা জুজুবুড়ির ভয়। যে মরণকে একদিন সকলেরই বরণ করিয়া লইতে হইবে, সে আমাদের হিসাবে দুই দিন আগে আসিল বলিয়াই কি আমাদের এত বিক্ষোভ, এত চাঞ্চল্য?
যে খবর না দিয়া আসিত, সে খবর দিয়া আসিল বলিয়াই কি আমরা তাহাকে পরম শত্রু মনে করিব? ভুল, ভুল। ‘মৃত্যু’ মিত্ররূপেই আমার কাছে দেখা দিয়াছে। আমার ভালোবাসা ও প্রণাম জানিবে।
—তোমার নসু
.
আলিপুর সেন্ট্রাল জেল
৩০. ৬. ৩১. কলিকাতা।
স্নেহের ভাইটি,
তুমি আমাকে চিঠি লিখিতে বলিয়াছ, কিন্তু লিখিবার সুযোগ করিয়া উঠিতে জীবন-সন্ধ্যা হইয়া আসিল।
