স্নায়ু হঠাৎই সজাগ হয়ে ওঠে গোপীর। আরে, মোড়ের বড় দোকান ‘Hall and Anderson’-এর সামনে কে দাঁড়িয়ে উনি? দোকান খোলেনি এখনও, বাইরে থেকেই কাচের শো-কেসে সাজিয়ে রাখা জিনিসপত্রে চোখ বোলাচ্ছেন দীর্ঘদেহী ভদ্রলোক। কে উনি? ভীষণ চেনা লাগছে তো!
কাছে গিয়ে পিছন থেকে এক ঝলক দেখেই নিশ্চিত হয়ে যান গোপী। আরে, যা ভেবেছি তা-ই, এ তো স্বয়ং টেগার্ট! দাঁড়ানোর ওই ভঙ্গি তার ভীষণ পরিচিত। খয়েরি রঙের লম্বা ওভারকোটটাও। অবশেষে! অবশেষে নাগালের মধ্যে প্রবল পরাক্রমী পুলিশ কমিশনার! যাঁকে খতম করা মানে ব্রিটিশরাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়া।
উত্তেজনার বশে এক মুহূর্তও দেরি করলেন না গোপীমোহন। সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন কয়েক হাত পিছনে, তড়িঘড়ি চাপলেন ট্রিগার। টেনশনে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। আওয়াজে সচকিত সাহেব ঘুরে তাকানোর আগেই ফের ছুটল বুলেট। এবার লক্ষ্যভেদ। ফুটপাথে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা দেহে বুলেটবৃষ্টি করলেন গোপী। ঝুঁকি নেওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। মৃত্যু নিশ্চিত করতেই হবে।
ততক্ষণে লোক জমে গেছে আশেপাশে। পার্ক স্ট্রিট ধরে ছুটলেন গোপী। ধাওয়া করলেন কিছু পথচারী, পিছু নিল একটি ট্যাক্সিও। যা লক্ষ্য করে গোপী গুলি ছুড়লেন, পথচলতি একটি মোটরগাড়ি থামিয়ে চেষ্টা করলেন উঠতে। চালক অসম্মত হতে গুলি চালালেন ফের। লক্ষ্যভ্রষ্ট হল বুলেট। একটি ঘোড়ার গাড়ির পাদানিতে উঠে পালানোর শেষ চেষ্টা ব্যর্থ হল। ধরে ফেলল পুলিশ। গোপীর কাছ থেকে উদ্ধার হল একটি বড় পিস্তল, একটি রিভলভার এবং চল্লিশটি তাজা কার্তুজ।
লালবাজার নিয়ে যাওয়ার পথে এক প্রস্থ এলোপাথাড়ি মারধর প্রথমে। তারপর আসামিকে সোজা নিয়ে যাওয়া হল নগরপালের ঘরে। এবং ঢুকেই পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল গোপীমোহনের। এ কী! কমিশনারের চেয়ারে স্বমহিমায় বসে টেগার্ট! যাঁকে একটু আগেই বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা করে দিয়ে এসেছেন প্রকাশ্য রাজপথে!
স্তব্ধবাক্ গোপীমোহনের দিকে তাকিয়ে তখন বিদ্রুপের হাসি ছুড়ে দিচ্ছেন কমিশনার— ‘So you thought you’d killed Charles Tegart?’
গোপী অচিরেই বুঝলেন, মারাত্মক ভুল করে ফেলেছেন। টেগার্ট ভেবে খুন করে ফেলেছেন অনেকটা তাঁরই মতো দেখতে এক নিরপরাধ ইংরেজ নাগরিককে। নাম Ernest Day, এক বেসরকারি সংস্থার আধিকারিক। মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই। টেগার্ট জীবিত এবং বহাল তবিয়তেই। যাকে বলে, ‘alive and kicking’!
চোখে অন্ধকার দেখেন গোপী, বসে পড়েন মুখ ঢেকে। এত বড় ভুল কী করে হল? একটা নির্দোষ লোককে মেরে ফেললাম, আর টেগার্টের শরীরে এবারও আঁচড়টুকুও কাটা গেল না?
পরের দিনের খবরের কাগজে শিরোনাম, ‘Mistaken identity saves Tegart’, আর বাংলা কাগজে, ‘দৈবক্রমে স্যার চার্লস টেগার্টের জীবনরক্ষা। চৌরঙ্গীর উপর মিঃ আর্নেস্ট ডে নৃশংসভাবে নিহত। গোপী সাহা নামে একজন যুবক ঘটনাস্থলে ধৃত’।
এভাবেই কতবার যে বেঁচে গেছেন টেগার্ট! ভাগ্যের অলৌকিক কৃপাদৃষ্টি ছিল তাঁর উপর। গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়া বোমা কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে অল্পের জন্য, কখনও কোনও অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা থাকলেও যাননি শেষ মুহূর্তে, সশস্ত্র বিপ্লবীদের ওত পেতে থাকার গোপন খবর পেয়ে। ১৯৩০ সালের ২৫ অগস্ট যখন লালবাজারে আসছেন বেলা এগারোটা নাগাদ, ডালহৌসির কাছে টেগার্টের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছোড়েন দুই বিপ্লবী, দীনেশচন্দ্র মজুমদার এবং অনুজাচরণ সেনগুপ্ত। প্রবল শব্দে বোমা ফাটে গাড়ির বাঁ দিকে। এক চুলের জন্য রক্ষা পান টেগার্ট। পকেটে রাখা বোমা ফেটে অকুস্থলেই প্রাণ হারান অনুজা। পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয় দীনেশের।
১৯৩১ সালে কলকাতা ছাড়লেন টেগার্ট, ‘Secretary of State’s Indian Council’-এ মনোনীত হয়ে। বাংলার বিপ্লবীদের চিরকালীন আক্ষেপ হয়ে রইল টেগার্ট-হত্যায় ব্যর্থতা।
.
গোপীমোহনের বাঁচার রাস্তা ছিল না কোনও। ভবিতব্য ছিল মৃত্যুদণ্ডই। কারাবাসকালীন নির্যাতন সহ্য করেছিলেন অকথ্য। বিচারপর্বের শেষে ফেব্রুয়ারির ১৬ তারিখ সেশন জজ মি. পিয়ার্সনের এজলাসে যখন ফাঁসির রায় ঘোষিত হচ্ছে, আদালতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি টেগার্টকে মারতে চেয়েছিলাম। একজন নিরপরাধ মানুষকে মেরেছি বলে অনুশোচনার শেষ নেই আমার। মৃতের পরিবারের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু টেগার্টের ক্ষমা নেই। অত্যাচারী কমিশনারের প্রাণনাশ নিশ্চয়ই করবেন আমার কোনও দেশপ্রেমিক সহযোদ্ধা, যিনি আমার অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করবেন, আমার থেকে অনেক বেশি যত্নবান হবেন হত্যার সময়। আমার প্রতি বিন্দু রক্ত ভারতের প্রতিটি ঘরে আমার মতো একনিষ্ঠ বিপ্লবী গড়ে তুলুক।’
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন ধার্য হয়েছিল ১৯২৪-এর পয়লা মার্চ। ‘ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান’-এর দীর্ঘ তালিকায় যুক্ত হল হুগলির যুবক গোপীমোহন সাহার নাম। যাঁর নামে একটি সেতু রয়েছে শ্রীরামপুরে।
গোপীমোহনের ফাঁসিতে প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, শুধু বাংলায় বা পূর্ব ভারতে নয়, দেশ জুড়ে। ১৯২৪-এর ২ জুন সিরাজগঞ্জে প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ গোপীমোহনের আত্মবলিদানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রস্তাব আনলেন। অহিংসার আদর্শে একনিষ্ঠ কংগ্রেসে ‘সন্ত্রাসবাদীদের প্রভাব বৃদ্ধি’-র ইঙ্গিতে নড়ে চড়ে বসল ব্রিটিশ প্রশাসন। বাংলার তৎকালীন ‘Intelligence Branch’ (আইবি)-র গোপন রিপোর্ট ‘Brief note on the alliance of Congress with terrorism in Bengal’-এ বলা হল—
