এহেন টেগার্ট যে বিপ্লবীদের খতমতালিকার শীর্ষে বিরাজ করবেন একচ্ছত্র, প্রত্যাশিতই। তাঁর প্রাণনাশের একাধিক চেষ্টা হয়েছে সমসময়ে। যার একটির পরিকল্পনা করেছিলেন বিপ্লবী চতুষ্টয়, অনন্ত সিংহ, দেবেন্দ্রচন্দ্র দে (খোকা), যাঁর নামে এন্টালির ডি সি দে রোড, গোপীমোহন সাহা (কিছু নথিপত্রে ‘গোপীনাথ সাহা’ রয়েছে, তবে পুলিশ রিপোর্টে এবং মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্রে যেহেতু ‘গোপীমোহন’ আছে, সেই নামটিই ব্যবহৃত এ লেখায়) এবং নগেন্দ্রনাথ সেন (জুলু)।
—এমন সুযোগ আর আসবে না গোপী… মনে আছে তো… ব্যাটা একেবারে মৃত নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গুলি চালিয়েই যাবি।
.
সকাল ছ’টা নাগাদ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে একটু নার্ভাসই লাগে অনন্তর। সব প্ল্যানমাফিক হবে তো? গোপীকে দিব্যি দেখতে পাচ্ছেন, মাথায় ফেজ টুপি, উলের স্কার্ফ জড়িয়েছে কথামতো। খোকা দৃষ্টিপথের বাইরে। জুলুদা নিশ্চয়ই চরকিপাক খাচ্ছে সাইকেলে।
টেনশন কমাতে একটা সিগারেট ধরান অনন্ত। স্রেফ টেনশন কমাতেই নয় অবশ্য, অন্য উদ্দেশ্যও ছিল। সে যুগে বিপ্লবীদের মধ্যে ধূমপানের তেমন চল ছিল না। টেগার্টের জীবনরক্ষায় সদাসতর্ক সাদা পোশাকের পুলিশকর্মীরা ছড়িয়ে থাকে তাঁর প্রাতঃভ্রমণের যাত্রাপথে। সিগারেট ঠোঁটে থাকলে সন্দেহের উদ্রেক হওয়ার সম্ভাবনা কম। ধূমপানে অনভ্যস্ত অনন্তর দম আটকে আসে কাশিতে। কী করে যে এই ধোঁয়া গেলে লোকে?
অপেক্ষা করতে করতে অনন্ত ভাবেন, এই বুঝি গোপীর পিস্তল গর্জে উঠবে, হবে শত্রুনিকেশ। কোথায় কী? সময় যেন আর কাটতে চায় না। কোনও গোলমাল হল?
‘গোলমাল’ যে একটা হয়েছে, অচিরেই জানান দিল সাইকেল নিয়ে ভগ্নদূতের মতো জুলুদার আবির্ভাব।
—এক্ষুনি ডেরায় ফিরে যাও। খোকার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। আগুন লেগে গেছে ওর গায়ে। প্রোগ্রাম বাতিল।
অনন্ত হতাশায় ডুবে যান এবং আন্দাজ করতে পারেন ঠিক কী ঘটেছে খোকার সঙ্গে। বোমাতে অগ্নিসংযোগের জন্য পকেটে লোশনের শিশি ছিল। ইয়েলো ফসফরাস আর কার্বন ডাইসালফাইডের মিশ্রণে প্রস্তুত এই লোশনটি খুবই বিপজ্জনক। লোশনটির বিন্দুমাত্রও যদি শিশি থেকে বেরিয়ে পোশাকের কোন সামান্য অংশও ভিজিয়ে দেয়, তবে কার্বন ডাইসালফাইড দ্রুত উড়ে গিয়ে শুধু ফসফরাস পড়ে থাকবে। আর বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে ফসফরাস জ্বলে উঠবেই, জানা কথা।
ঘটেছিল তেমনটাই। কলকাতার রাজপথে ইউরোপিয়ান বেশভূষায় সজ্জিত এক যুবকের পোশাকে আগুন জ্বলছে দেখে থমকে গিয়েছিলেন পথচারীরা।
—সাহেব, ক্যা হুয়া? আগ ক্যায়সে লাগা?
—সিগ্রেট সে লাগ গিয়া…
ফসফরাসের আগুন খুবই বেয়াড়া প্রকৃতির। জল দিয়েও চাপা দেওয়া মুশকিল। যতক্ষণ জলে ভিজে থাকবে, ঠিক আছে। জল একটু শুকিয়ে গেলেই আগুন ফের মাথাচাড়া দেবে। ফসফরাস নিঃশেষিত না হওয়া পর্যন্ত নিভবে না।
খোকা রাস্তার হাইড্র্যান্ট থেকে জলের ধারা দিয়ে আগুনকে বশে আনার চেষ্টা চালালেন আপ্রাণ। বুঝতে পারছিলেন, আরও ভয়ংকর বিপদ ঘটে যেতে পারে যে-কোনও সময়। প্যান্টের পকেটে রয়েছে পিকরিক পাউডার ভর্তি একটা তাজা বোমা। তাতে gun cotton ফিউজ় লাগানো। কোনওভাবে আগুনের সংস্পর্শে এলেই বিস্ফোরণ ঘটবে এবং মুহূর্তের মধ্যে ভবলীলা সাঙ্গ। বোমাটাকে বার করে কোনওমতে ভিজিয়ে ফেললেন খোকা। টেগার্টকে মারতে গিয়ে নিজেরই প্রাণ নিয়ে টানাটানি তখন।
অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে টেগার্ট-নিধন অপারেশন। তালতলার ডেরায় মিলিত হয়েছেন হতোদ্যম চার বিপ্লবী। খোকা স্যুট খুলে বালতির জলে ডুবিয়ে দিয়েছেন। তবু ধোঁয়া বেরচ্ছে। অনন্ত তীব্র বকাঝকা করছেন খোকাকে।
—কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই তোর? সব সময় অসাবধান। বুকপকেটে সোজা করে রাখতে পারলি না শিশিটা? তোর আহাম্মকির জন্য সব প্ল্যান ভেস্তে গেল।
জুলুদা থামান উত্তেজিত অনন্তকে।
—যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। ও নিয়ে ভেবে লাভ নেই। তবে শিক্ষা নেওয়ার আছে আমাদের… টেকনিক্যাল দিকগুলোর ব্যাপারে এবার থেকে ঢের বেশি সতর্ক থাকতে হবে আমাদের। খোকা তো আজ মরতে মরতে বেঁচে গেল। কী রে গোপী… তুই গোঁজ হয়ে বসে আছিস কেন? মন খারাপ করিস না। টেগার্ট তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না। আবার সুযোগ আসবে…
গোপীমোহন উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না। রাগে মুখ থমথম করছে তার। চোখদুটি রক্তাভ। মাথার শিরা দপদপ করছে। স্বপ্নপূরণের উত্তেজনায় আগের রাতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি। টেগার্টকে গত তিন মাস ধরে দূর থেকে অনুসরণ করেছে সে। কেমন দেখতে, কী পোশাক কখন পরেন, হাঁটার ভঙ্গিটাই বা কীরকম, সব। শেষে তীরে এসে তরী ডুবল অসাবধানে। জুলুদা বলছে, আবার সুযোগ আসবে। আর অনন্তদা গতকাল বলছিল, এমন সুযোগ আর আসবে না। কার কথা বিশ্বাস করবে? মাথা আর কাজ করছে না তার। কারও ভরসায় আর থাকবে না সে। যা করার, একাই করবে এবার। একাই মারবে টেগার্টকে।
এবং একাই মরিয়া চেষ্টা করলেন গোপীমোহন, কিছুদিন পর। সঙ্গী বিপ্লবীদের কাউকে ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে না দিয়ে।
.
১২ জানুয়ারি, ১৯২৪। সকাল সোয়া সাতটা, বড়জোর সাড়ে সাত। সাদা ধুতি আর ঝোলা খাকি শার্ট পরিহিত গোপীমোহন দাঁড়িয়ে রয়েছেন পার্ক স্ট্রিট আর চৌরঙ্গি রোডের সংযোগস্থলে। ঘোরাঘুরি করছেন ইতস্তত। যেমন রোজই করেন টেগার্টকে অসতর্ক মুহূর্তে পেয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে। সাহেব অতি ধূর্ত। রোজ মর্নিং ওয়াকে বেরোন না। যে ক’দিন বেরোন, রোজ আলাদা রাস্তা দিয়ে ফেরেন। তা ছাড়া সাদা পোশাকের টিকটিকিরা তো থাকেই আশেপাশে।
