স্যার চার্লস টেগার্ট ছিলেন এক বহুবিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। স্রেফ পেশাদারি মানদণ্ডের নির্মোহ বিশ্লেষণ বলবে, অফিসার হিসাবে যে-কোনও সরকারের কাছে তিনি সম্পদবিশেষ। যে বিপ্লবীদের তিনি বরাবরের চক্ষুশূল ছিলেন, তাঁদের একাধিকের লেখনীতেও ধরা রয়েছে টেগার্টের কর্মদক্ষতার প্রতি সম্ভ্রম, ‘টেগার্টের কাছে কলকাতাবাসীর একটি কারণে কৃতজ্ঞ থাকার কারণ ছিল। তিনি কলকাতাকে গুন্ডামুক্ত করিয়াছিলেন।’ প্রবল বিপ্লবী-বিদ্বেষী হওয়া সত্ত্বেও টেগার্টও শোনা যায় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন অগ্রগণ্য দেশব্রতীদের প্রতি। ঘনিষ্ঠ মহলে বলতেন, ‘বাঘা যতীন বা অরবিন্দ ঘোষের মতো নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক যদি ইংল্যান্ডে জন্মাতেন, জীবদ্দশাতেই সে দেশে সসম্মানে তাঁদের আবক্ষমূর্তি বসানো হত।’
রসজ্ঞানও পূর্ণ মাত্রায় ছিল টেগার্ট সাহেবের। একটি কাহিনির উল্লেখ করি। এক মহিলা মামলায় হেরে খুব চটেছেন। রাগে ফুটছেন টগবগ। সেই অবস্থায় এলেন টেগার্টের সঙ্গে দেখা করতে। দরখাস্ত করতে চান বন্দুকের লাইসেন্সের।
টেগার্ট প্রশ্ন করলেন মহিলাকে, কী প্রয়োজনে বন্দুক রাখতে চান?
—আমার প্রয়োজন? বন্দুক দিয়ে প্রথমে আমি টেগার্টকে গুলি করে মারতে চাই। তারপর যে ম্যাজিস্ট্রেট আমার মামলা করেছে, তাকে গুলি করব।
টেগার্ট উত্তর দিলেন সহাস্য।
—বেশ তো! কিন্তু লাইসেন্স তো দেওয়া যাবে না আপনাকে। যারা অন্তত দু’বারের বেশি ব্যবহার করবেন বন্দুক, লাইসেন্স শুধু তাদেরই দিয়ে থাকি আমরা!
তৎকালীন শহর কলকাতায় গুন্ডাদমনে টেগার্টের পারদর্শিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছি আগে। কলকাতা পুলিশে অতিবাহিত দীর্ঘ কর্মজীবনে কত দাগী অপরাধীকে যে নিজস্ব সোর্স মারফত পাওয়া গোপন খবরের ভিত্তিতে জেলে পুরেছেন, কত দুঃসাহসিক অভিযানে যে নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন অকুতোভয়, হিসাব নেই সত্যিই।
সত্যের স্বার্থে আরও স্বীকার্য, যে দেশ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করে, সেখানে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিতদের ভাগ্যে কখনওই কৃতজ্ঞতা বরাদ্দ হয় না, জোটে না বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন। সরকারি নীতি যতই অপ্রিয় হোক, তার রূপায়ণে সরকারি চাকুরে তো দায়বদ্ধ থাকবেনই। বিবেক সায় না দিলেও থাকবেন, বাধ্যত।
তবু টেগার্ট অন্য ব্রিটিশ অফিসারদের তুলনায় কেন বহুলাংশে নিন্দিত, ধিক্কৃত? কারণ সহজবোধ্য। মাত্রাছাড়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী টেগার্ট ছিঁচকে চোর বা বেপরোয়া ডাকাত বা ত্রাস সৃষ্টিকারী স্থানীয় গুন্ডাদের সঙ্গে বিভাজনরেখা মুছে দিয়েছিলেন দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের।
চোর-ডাকাত-গুন্ডাদের সঙ্গে বিপ্লবীদের গোত্রের ফারাকটি তিনি বিলক্ষণ জানতেন। কিন্তু সরকারের প্রিয়পাত্র হওয়ার নিরন্তর তাগিদে সচেতনভাবেই বিসর্জন দিয়েছিলেন সকল শুভবুদ্ধি। নিছক বিপ্লবীদের গ্রেফতারিতেই ক্ষান্ত থাকতেন না, দমনপীড়নের নিষ্ঠুরতাকে এক অশ্রুতপূর্ব পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাজদ্রোহীদের নির্মম নির্যাতন ক্রমে মজ্জাগত হয়ে উঠেছিল তাঁর। অত্যাচারের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছিলেন চর্চিত অনুশীলনে।
‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’-র নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন বরাবর। উদাহরণ? এক বিপ্লবীকে গ্রেফতার করার পরিকল্পনা চলছে তখন। টেগার্ট ‘অপারেশন’-এর খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিচ্ছেন অফিসারদের। যাঁদের মধ্যে একজন প্রশ্ন করলেন, ও তো fire open করতে পারে।
টেগার্ট জবাব দিলেন নির্বিকার।
—তোমরা তাকে fire open করতে দেবে কেন? তার আগেই তোমরা fire করবে।
—কিন্তু স্যার, ধরুন গুলি করলাম, মরে গেল লোকটা। আর তারপর দেখলাম, লোকটার কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিলই না। তখন? আইনত পুলিশ ওভাবে নিরস্ত্র লোকের উপর গুলি চালাতে তো পারে না। আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালানো যায়। কিন্তু নিরস্ত্র লোকের ক্ষেত্রে সে যুক্তি তো খাটবে না। Firearms-ই যদি না থাকে?
—In that case you are to find out one.
নির্দেশ জলের মতো পরিষ্কার। অস্ত্র না থাকলে না থাকবে, মৃতদেহের হাতে বা পকেটে বা অন্যত্র অস্ত্র গুঁজে দিতে হবে। যাতে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় অকাট্য।
টেগার্ট এমনই ছিলেন। বিপ্লবী-দমনে নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করেননি কখনও। বিপ্লবী-বিদ্বেষ কী কল্পনাতীত তীব্র ছিল টেগার্টের, এই নিবন্ধের প্রারম্ভিক অনুচ্ছেদে ইঙ্গিত রয়েছে। রয়েছে নগরপাল থাকাকালীন কিড স্ট্রিটের বাংলোর ছাদে রিভলভার নিয়ে মহড়ার প্রসঙ্গ।
—Let’s start afresh Colson.
—Right Charles!
স্বামীকে নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন টেগার্টের সহধর্মিণী ক্যাথেরিন। পাণ্ডুলিপিতে টাইপ করা পৃষ্ঠার সংখ্যা ৩৪০। ‘Memoir of an Indian Policeman’ শীর্ষক সেই বই শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। অপ্রকাশিত বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন S G Taylor, যিনি এক সময় বাংলার ইনস্পেকটর জেনারেল অফ পুলিশ ছিলেন। পাণ্ডুলিপিতে স্বামীর বীরগাথা রচনা করেছিলেন ক্যাথেরিন। সেখানেই পাওয়া যায় সেই শুটিং প্র্যাকটিসের বিবরণ—
‘He had a life-size sketch of Bengali assassin, levelling a pistol, made on canvas which was kept on the roof and when another officer (usually Mr. Colson, who succeeded him as Commissioner) joined in the practice. It was the custom for one or the other of them, while they did the morning exercise, to give a sudden unpremeditated yell; on this the other had to switch round with his automatic and shoot the canvas gunman in some vital part of his anatomy.’
