প্রশস্ত ছাদে মহড়া চলছে। পূর্ণবয়স্ক একটি লোকের ছবি আঁকা ক্যানভাসে, লোকটির হাতে উদ্যত পিস্তল। লক্ষ্যবস্তু ওই ছবিই। ওটাই টার্গেট। রাখা হয়েছে ছাদের এক প্রান্তে। দুই সাহেব পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চল্লিশ মিটার দূরত্বে। কোমরের হোলস্টারে গোঁজা রিভলভার।
নিশানায় চোখ রেখে ধীরেসুস্থে পালা করে যে গুলি ছোড়া হচ্ছে, এমন নয়। বাস্তবের লড়াইয়ে অত সময় পাওয়া যায় না আগ্নেয়াস্ত্র তাক করার। সাহেবযুগল তাই মহড়ার সময় চেষ্টা করেন যতটা সম্ভব বাস্তবসম্মত পরিস্থিতিতে নিজেদের নিশানা যাচাই করে নেওয়ার। টার্গেটের দিকে পিছন ফিরে গল্পগুজব করতে করতেই হঠাৎ একজন চিৎকার করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সঙ্গীর।
—There! Fire!
সঙ্গে সঙ্গে অন্যজন যথাসাধ্য ক্ষিপ্রতায় ঘুরে দাঁড়িয়ে রিভলভার বার করে গুলি ছোড়েন টার্গেটে। এভাবেই চলতে থাকে ঘণ্টাখানেক। চলতে থাকে নিশানার চুলচেরা বিচার। মাথা-বুক-পেটের ‘killing zone’-এ গুলি না লাগলে বিমর্ষ হয়ে পড়েন সাহেবরা। শরীরের নিম্নাংশে লাগলে তো শত্রু আহত হবে বড়জোর, প্রাণহানির সম্ভাবনা কম। ফের শুরু হয় লক্ষ্যভেদের মহড়া। গুলি যাতে ঝাঁঝরা করে দিতে পারে ক্যানভাসে আঁকা প্রমাণ সাইজের মানুষটির বক্ষস্থল বা তার আশেপাশের অংশ।
—Let’s start afresh Colson.
—Right Charles!
.
খুনের ‘কী-কখন-কোথায়’ ঝালিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
—এমন সুযোগ আর আসবে না। মনে আছে তো গোপী… ব্যাটা একেবারে মৃত বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গুলি চালিয়েই যাবি।
তথ্য সংগৃহীত হয়েছে কয়েকমাস ধরে বিস্তর খেটেখুটে। পরিকল্পনা প্রস্তুত হয়েছে একাধিক বৈঠকে আলাপ-আলোচনার পর। প্রয়োগের সময় এসেছে এবার। চূড়ান্ত আঘাতের প্রাক্মুহূর্তে বিপ্লবীদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে মধ্য কলকাতার এক গোপন ডেরায়। বক্তার ভূমিকায় বিপ্লবী অনন্ত সিংহ।
—কয়েকটা জরুরি জিনিস আবার বলে দিই। ভোর ছ’টায় কিড স্ট্রিট থেকে মর্নিং ওয়াকে বেরোয়। সঙ্গে একটা টেরিয়ার কুকুর থাকে। আক্রমণটা হবে কিড স্ট্রিট থেকে চৌরঙ্গির মাঝামাঝি জায়গায়। বেড়াতে যাওয়ার সময় বা ফেরার সময়, যখন আমাদের সুবিধে।
গুলি গোপীমোহন করবে। বহুদিন ধরে ফলো করেছে সকালে। চেনে লোকটাকে। একহাতে রিভলভার থাকবে, অন্যহাতে পিস্তল। ধরো যদি গোপীর গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তবে খোকা গুলি করবে। খোকা… তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে গোপীর থেকে পঞ্চাশ-ষাট গজ দূরে।
টার্গেট যদি পূর্বদিকে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট দিয়ে পালাতে চায় তবে আমি গুলি চালাব। অপেক্ষা করব গোপীর থেকে সত্তর-আশি গজ দূরে।
খোকা ইউরোপিয়ান পোশাক পরবে। সঙ্গে রিভলভার তো থাকবেই। আর থাকবে টাইম বোমা, যা লোশন দিয়ে সাত সেকেন্ডের মধ্যে ফাটানো যায়। একইরকম বোমা আর রিভলভার আমার সঙ্গেও থাকবে। আমি থাকব বাঙালির বেশে।
গোপীর সাজ হবে মুসলমানের মতো। মাথায় ফেজ টুপি। আর মুখের কাটা দাগটা ঢেকে রাখতে উলের স্কার্ফ পরবে। গোপী সফল হলে তো চুকেই গেল, না হলে আমি বা খোকা আক্রমণ করব, যেদিকে ব্যাটা দৌড়বে প্রাণ বাঁচাতে, ধাওয়া করে মারব।
জুলুদা, আপনার কাছে মাউজার পিস্তল থাকবে। আপনি সাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে নজর রাখবেন এলাকায়। দরকারমতো সাহায্য করবেন আমাদের। আর খেয়াল রাখবেন সাদা পোশাকের চরগুলোর উপর। সব জায়গায় ছড়িয়ে থাকে ওরা।
একটানা অনেকটা বলে দম নেন অনন্ত। তাকান গোপীমোহনের দিকে।
—কী রে গোপী? পারবি তো?
সাদামাটা দোহারা চেহারার যুবক রিভলভারে হাত বোলাতে বোলাতে সটান তাকান প্রশ্নকর্তার দিকে। চোখ দুটি ঝকঝক করছে উত্তেজনায়। উত্তর আসে অবশ্য আপাতনিরুত্তাপ গলায়।
—তোমাদের সন্দেহ আছে কোনও? তোমরা তো জানোই ওই লোকটাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য আমি যে-কোনও ঝুঁকি নিতে পারি। ওই লোকটার আর একদিনও বেঁচে থাকার অধিকার নেই।
.
ওই লোকটা! যাঁর বেঁচে থাকার অধিকার নেই বলে মনে করতেন অগ্নিযুগের বঙ্গজ বিপ্লবীদের একটা বড় অংশ। যাঁর নামের আদ্যক্ষর থেকে ‘কোডনেম’ তৈরি করেছিলেন বিপ্লবীরা। CAT! Charles Augustus Tegart।
টেগার্টের জন্ম উত্তর আয়ারল্যান্ডে, ১৮৮১ সালে। মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে কেটেছিল ছাত্রাবস্থার কিছু সময়। ভারতীয় পুলিশে (Imperial Police) যোগ দেন ১৯০১ সালে। প্রথম পোস্টিং পাটলিপুত্রে। বিহার এবং ওড়িশা তখন বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯০৬ সালে বদলি হয়ে এলেন কলকাতায়, গোয়েন্দা বিভাগের Acting ডেপুটি কমিশনার হিসাবে। সেই থেকে টানা পঁচিশ বছর কর্মরত কলকাতা পুলিশে এবং উল্কাসদৃশ উত্থান।
স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের পত্তন এবং তার পরিকাঠামোগত বুনিয়াদ স্থাপনে সিংহভাগ কৃতিত্ব ছিল টেগার্টের। কলকাতা তো বটেই, রাজ্য জুড়ে বিস্তৃত ছিল তাঁর দুর্ধর্ষ ‘সোর্স নেটওয়ার্ক’। সঙ্গে যোগ হয়েছিল ক্ষুরধার বুদ্ধি এবং দুর্দমনীয় সাহস। ফলত তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনে ক্রমে হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং কিংবদন্তিসম। পুলিশ কমিশনারের পদে উন্নীত হয়েছিলেন ১৯২৩ সালে, লাগাতার আট বছর ছিলেন কলকাতা পুলিশের অবিসংবাদিত সর্বাধিনায়ক।
