—কী করব স্যার? অফিসারের রিপোর্টে রবীন্দ্রনাথের ছাড়া আর কারও নাম না থাকলে আমি কী করব? তিনি ওই কলম শনাক্ত করেছেন নিজে। আমি তো নিরুপায়! তাঁকেই তো শনাক্ত করতে হবে আদালতে। তা ছাড়া স্যার, আইন তো সকলের জন্যই সমান। সে রবীন্দ্রনাথই হন আর …
বেজায় রেগে গিয়ে শরৎবাবুকে থামিয়ে দেন আনিস সাহেব।
—‘সকলে’ আর রবীন্দ্রনাথ এক হলেন? আর আইন অত দেখাবেন না। আমি আপনার থেকে আইন বেশি বই কম জানি না। আইন মানুষের জন্য। রবীন্দ্রনাথ একজনই হন। তাঁর জন্য আইনের একটু ব্যতিক্রম ঘটলে মহাপাপ হবে না কিছু। সৌরীন্দ্রবাবু, যে ভদ্রলোক ঠাকুরবাড়ি থেকে এসেছেন সমন নিয়ে, তিনি নিশ্চয়ই ওই কলমটি অনেকবার দেখেছেন। চিনতে পারবেন নিশ্চয়ই দেখলে?
সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়েন সৌরীন্দ্রমোহন। আনিস নির্দেশ জারি করেন তৎক্ষণাৎ।
—ব্যস, তা হলে মিটেই গেল। শরৎবাবু, গুরুদেবের নামে যে সমন গিয়েছিল, সেটি আমি বাতিল করলাম। রবীন্দ্রনাথ যাঁকে পাঠিয়েছেন, তাঁর নামে নতুন সমন জারি করুন। তিনি এসে সাক্ষ্য দেবেন মামলায়, কলম শনাক্ত করবেন।
শরৎবাবু বেরিয়ে গেলেন হুকুম তামিলে, আর আনিস সাহেব সখেদে হাত চেপে ধরলেন সৌরীন্দ্রের।
—না জেনে আমি মহাপাতকের মতো কাজ করে ফেলেছি মিস্টার মুখার্জী। এককাঁড়ি কাগজ নিয়ে এসে মুখের সামনে ধরে কাছারির লোক, সইয়ের জন্য। রুটিন কাগজে সই করে দিই রুটিনমাফিক। কার নামে সমন, তা দেখার অবসর থাকে না সবসময়। আমার হয়ে দয়া করে রবীন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবেন। বলবেন, তাঁকে প্রণাম জানিয়ে হাতজোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, তিনি যেন প্রার্থনা মঞ্জুর করেন।
বাকি ঘটনা উদ্ধৃত করি সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের (যাঁর আর এক পরিচয়, ছিলেন কিংবদন্তি গায়িকা সুচিত্রা মিত্রের পিতা) ‘উকিলের ডায়েরি’ বইটি থেকে। যেখানে রয়েছে ঘটনাক্রমের সরস বিবরণী।
‘ব্যাপারের নিষ্পত্তি তখনই হয়ে গেল। গোপালবাবু চলে গেলেন এবং কোর্টের পর আমি গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে রিপোর্ট দিলে, হেসে তিনি বললেন, তোমার জন্য আজ রবি ঠাকুর অকালমৃত্যু থেকে বেঁচে গেল। আমাদের দেশে কথা আছে, রাজদ্বারে শ্মশানে চ যস্তিষ্ঠতি সঃ বান্ধবঃ। তুমি রাজদ্বারে থেকে বান্ধবতার যে পরিচয় দিলে, তার জন্য প্রাণ খুলে আশীর্বাদ করি, —তোমার জয় হোক!’
.
কলকাতা পুলিশের শতাব্দীবিস্তৃত ইতিহাসে লালবাজার প্রাঙ্গণ কৃতার্থ হয়েছে বহু মনীষীর পদধূলিতে। যাঁদের অধিকাংশেরই আগমন অগ্নিযুগের দিনগুলিতে, হয় কারাবরণ করে, নয় কোনও মামলায় আসামি বা সাক্ষী হিসাবে আদালত-হাজিরায়। লালবাজারে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের পদার্পণ ঘটলে ধন্য হয়ে যেত কলকাতা পুলিশের সদর দফতর, সংশয়ের অবকাশ নেই কোনও। তবে তলিয়ে ভাবলে মনে হয়, লালবাজারে কবির সম্ভাব্য উপস্থিতির যে প্রেক্ষিত তৈরি হয়েছিল, তা যে চূড়ান্ত পরিণতি পায়নি, ভালই হয়েছিল একপ্রকার। নোবেলজয়ী বিশ্ববন্দিত কবি সাক্ষীর কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান নিজের চুরি হয়ে যাওয়া কলম শনাক্ত করতে, সে ভারী বিড়ম্বনার দৃশ্য হত।
ভাগ্যিস হয়নি। ফুটবলের পরিভাষায় বললে, ‘গোললাইন সেভ!’
০৭. স্যার চার্লস টেগার্ট বনাম…
একটা কাগজ-কলম হবে?
—নিশ্চয়ই। আর কিছু লাগলে বলতে পারো। কিছু খেতে ইচ্ছে করলে বলো, ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
শীর্ণকায় শ্যামবর্ণ যুবক মৃদু হাসেন।
—না না, কাগজ-কলম হলেই চলবে। চিঠি লিখব একটা।
প্রহরী বিনা বাক্যব্যয়ে চলে যান খাতা-পেন আনতে। কী ধাতুতে যে গড়া এই ছেলেটি! কাল বাদে পরশু ফাঁসি। এই সময়টায় জেল কর্তৃপক্ষের নির্দেশই থাকে, মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্তের যাবতীয় ইচ্ছে যথাসাধ্য পূরণ করার। ছেলেটির প্রতি মায়াই পড়ে গেছে গত এক মাসে। ভারী শান্ত স্বভাবের। একে খুনি ভাবতে মন সায় দেয় না কিছুতেই। বই পড়ে প্রচুর। আর একটি ছোট্ট কালীমূর্তির সামনে ধ্যান করে সময় কাটায় চুপচাপ। নিজের কৃতকর্মের জন্য কোনও অনুতাপ নেই। কোনও বিশেষ ইচ্ছের কথাও বলে না হাজার প্রশ্ন করলেও। মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা পরে ফাঁসিকাঠে উঠতে হবে, বোঝা দুষ্কর হাবভাব দেখে। রোজ যেমন থাকে, তেমনই। কোনও হেলদোল নেই। কাল বাদে পরশু ফাঁসি। ভয় করছে না ওর?
—এই নাও কাগজ আর কলম। এতে হবে তো?
একগাল হাসে যুবক।
—হ্যাঁ হ্যাঁ… চিঠিটা পৌঁছে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা যদি…
—সে ব্যবস্থা হবে… তুমি লেখো।
নিশ্চিন্ত দেখায় যুবককে, লিখতে বসেন শেষ চিঠি।
‘শ্রীচরণেষু মা…’
.
বিশাল বাংলোয় সান্ত্রি-পেয়াদার ছড়াছড়ি। বন্দুক উঁচিয়ে নজরদারি অষ্টপ্রহর। অপরিচিত কারও প্রবেশের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা। বাড়ির বাসিন্দা যিনি সপরিবারে, তাঁর নিরাপত্তায় কোনওরকম কার্পণ্য করেনি সরকার।
যাঁর জন্য এই নিশ্ছিদ্র আয়োজন, তিনি অবশ্য খুবই ডাকাবুকো প্রকৃতির। ভোরে ওঠা বরাবরের অভ্যাস। ভয়ডরের সঙ্গে সম্পর্ক নেই বিশেষ। নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াই বেরিয়ে যান প্রাতঃভ্রমণে। কিড স্ট্রিট থেকে বেরিয়ে পার্ক স্ট্রিট হয়ে চৌরঙ্গি, হেঁটে আসেন দ্রুতপায়ে। আশৈশব স্বাস্থ্যসচেতন, শারীরিক সক্ষমতার ব্যাপারে আপসহীন। ঘোড়ায় চড়ে কাকভোরে বেরিয়ে পড়েন কোনও কোনও দিন। সুঠাম চেহারার অশ্বারোহীকে চষে বেড়াতে দেখা যায় ময়দানের আদিগন্ত সবুজে। কখনও রিভলভার নিয়ে শুটিং প্র্যাকটিসে নেমে পড়েন সাতসকালে। আজ যেমন।
