—আপনার কাছেই এসেছি। কবির ভারী বিপদ। এই দেখুন!
হাঁফাতে হাঁফাতে হাতে-ধরা কাগজটি সৌরীন্দ্রকে ধরিয়ে দেন গোপাল। কাগজটিতে এক ঝলক চোখ বুলিয়েই সৌরীন্দ্র বাক্রুদ্ধ।
রবীন্দ্রনাথের নামে আদালতের সমন! থার্ড প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুজ্জামান খাঁ সাহেবের সই রয়েছে, আছে কাছারির সিলমোহরও। সারবস্তু, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় দায়ের হওয়া চুরির মামলায় সাক্ষী দিতে শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অমুক তারিখে আদালতে হাজিরা দেওয়ার হুকুম।
—কিন্তু কী চুরি গেছে গুরুদেবের? ব্যাপারটা কী?
একটু ধাতস্থ হয়ে প্রশ্ন করেন সৌরীন্দ্র। ‘ব্যাপারটা’ পরিষ্কার হয় গোপালের উত্তরে।
—কবির ঝরনা-কলম। হারিয়ে গিয়েছিল মাসদুয়েক আগে।
—হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো জানি। উনি বলেছিলেন আমাদের।
—হারায়নি আসলে, চুরি হয়েছিল। চোর ধরা পড়েছে কয়েকদিন আগে।
—তারপর?
.
জোড়াসাঁকো থানার বড়বাবুর গাড়ি এলাকায় চক্কর দিচ্ছে চোরসমেত। কোন বাড়ি থেকে কী কী জিনিস হাতিয়েছে, কাঁচুমাচু মুখে দেখিয়ে দিচ্ছে চোর। কলুটোলা–ফলপট্টি ঘুরে গাড়ি ঢুকল একটি গলিতে।
—এখানে কোন বাড়ি? বল!
বড়বাবুর দাপটে জবুথবু চোর চটপট জবাব দেয়।
—আর একটু এগিয়ে…
—কতটা এগিয়ে?
—সামনেই… এই তো… এই বাড়িটা হুজুর…
গাড়ি থামল চোরের দেখানো বাড়ির সামনে। এবং বাড়ি দেখে বজ্রাহত বড়বাবু! নিজেকে সামলে নিতে মিনিটখানেক, তারপর চোরকে এই মারেন কী সেই মারেন!
—ঠিক বলছিস? এই বাড়ি?
—হ্যাঁ হ্যাঁ… এই বাড়ি। কলমটা এখান থেকেই চুরি করেছিলাম একদিন দুপুরবেলায়। বাড়িতে তখন লোকজন বিশেষ ছিল না।
—আর বাড়ি পেলি না চুরি করার? আশেপাশে তো আরও অনেক বাড়ি আছে, সেখানেও লোকজন থাকে না দুপুরের দিকে। সব ছেড়ে তোর এই বাড়িতেই নজর পড়ল হতভাগা! করলি তো করলি, এখানে!
ক্রুদ্ধ বড়বাবুর প্রবল চপেটাঘাতে চোখে সরষেফুল দেখে চোর। কান-মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে। বড়বাবু এত রেগে গেল কেন হঠাৎ? কীসে আলাদা এই বাড়ি? কোনও রাজা-মহারাজা থাকে নাকি? হোমরাচোমরা কেউ? চুরির সময় কি অত বাছবিচার করা যায়? কে থাকে এখানে?
যিনি থাকেন, তিনি তখন বাড়ির দোতলার বারান্দায় পায়চারি করছেন। জোড়াসাঁকো থানার বড়বাবু দেখা করতে চাইছেন শুনে নীচে নেমে এলেন। একটু বিস্ময় নিয়েই, হঠাৎ পুলিশ কেন?
—গুরুদেব, আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু বাধ্য হয়েই আসতে হল।
রবীন্দ্রনাথ তাকান কৌতূহলী দৃষ্টিতে।
উদ্ধার হওয়া ঝরনা কলমটি বড়বাবু দেখান রবীন্দ্রনাথকে। কবি শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে প্রগলভ হয়ে ওঠেন।
—এই তো আমার কলম! এ কলমে আমি লিখি। ক’দিন হল, হারিয়েছে— কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। কোথায় পেলেন? কে নিয়েছিল?
রবীন্দ্রনাথের সংক্ষিপ্ত বয়ান নিজের নোটবইয়ে লিপিবদ্ধ করে বেরনোর উদ্যোগ করেন বড়বাবু। কবিগুরু জিজ্ঞাসা না করে পারেন না, আমার কলম কবে পাব?
এক্ষুনি কলম ফেরত দেওয়ার ব্যপারে অপারগ, বড়বাবু জানিয়ে দেন সবিনয়ে।
—কোর্টে কলমের মকদ্দমা হবে— সে মকদ্দমা হয়ে গেলেই আপনি আপনার কলম পাবেন।
রবীন্দ্রনাথকে সামান্য বিমর্ষ দেখায়। সাধে কী বলে, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর পুলিশে ছুঁলে…।
বড়বাবু আইনের ব্যাখ্যা দেন, কলমটি ‘stolen and recovered’ প্রপার্টি। আদালতে চোরাই মাল আগে আইনি পদ্ধতিতে শনাক্ত হবে। তারপরই কলম ফিরিয়ে দেওয়া হবে বিচারকের লিখিত নির্দেশে।
কবি আর কথা বাড়ান না। আইনের কচকচিতে কোনওকালেই বিশেষ রুচি নেই তাঁর। বেশ, আইনি প্রক্রিয়ার সমাপন পর্যন্ত না হয় অপেক্ষাই করবেন। কলমটা অন্তত পাওয়া গেছে, ভেবে নিশ্চিন্ত বোধ করেন।
নিশ্চিন্ত অবশ্য বেশিদিন থাকতে পারলে তো! জোড়াসাঁকো থানার জমাদার কয়েকদিন পর সকালে ঠাকুরবাড়িতে এসে রবীন্দ্রনাথের হাতে ধরিয়ে গেলেন আদালতের সমন। কলম চুরির মামলায় সাক্ষ্য দিতে হাজিরা দিতে হবে লালবাজার প্রাঙ্গণে অবস্থিত আদালতে।
সমন দেখেই অবসন্নের মতো ইজিচেয়ারে বসে পড়লেন রবীন্দ্রনাথ। গোপালকে ডেকে বললেন তৎক্ষণাৎ আদালতে যেতে।
—এখনই কাছারিতে যাও সৌরীনের কাছে। গিয়ে তাঁকে বলবে এ তলব বন্ধ করা চাই। না হলে তাঁদের রবি ঠাকুর হার্টফেল হয়ে মারা যাবে। বন্ধ করতে না পারেন যদি, তা হলে বোলো, খাট কিনে দলবল নিয়ে যেন তিনি এবাড়িতে আসেন।
গোপালের মুখে বৃত্তান্ত শুনে বিচলিত হয়ে পড়লেন সৌরীন্দ্রমোহন। ছুটলেন ম্যাজিস্ট্রেটের ঘরে, শোনালেন সমন-কাহিনি আনিস সাহেবকে। যিনি নিজে সাহিত্যরসিক এবং অকৃত্রিম রবীন্দ্রভক্ত। সব শুনে বেশ কয়েক মিনিটের জন্য আনিস বাক্রহিত। ডেকে পাঠালেন কোর্ট ইনস্পেকটর শরৎকুমার ঘোষকে। এবং যিনি হাজির হতেই ক্ষোভ উগরে দিলেন সরোষে।
—এ আপনি কী করেছেন শরৎবাবু? কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই আপনার?
শরৎবাবু হতভম্ব। কী এমন কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজ করলেন! আনিস সাহেব ঠান্ডা মাথার মানুষ, সুভদ্র প্রকৃতির। তিনি এমন রেগে আগুন কেন?
—কী করলাম স্যার?
সমনটি এবার শরৎবাবুর দিকে প্রায় ছুড়েই মারেন আনিস সাহেব।
—কী করেছেন নিজেই দেখুন! দেখুন দেখুন! তুচ্ছ একটা কলম-চুরির মামলায় সাক্ষী দিতে রবীন্দ্রনাথকে তলব করেছেন এই পুলিশ কোর্টে। এতে তাঁর কতখানি অপমান হয়েছে, কোনও ধারণা আছে আপনার?
