সান্ধ্য সাহিত্যবাসর বসেছে রোজকার মতো। কবি সত্যেন্দ্রনাথ পড়ে শোনাচ্ছেন তাঁর নতুন লেখা। দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচী খাতা খুলে পাঠ করছেন কাব্য-সমালোচনা। খোলা গলায় গান ধরছেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভিন্ন ধারার গল্প সোৎসাহে শোনাচ্ছেন মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু আসরের যিনি মধ্যমণি, তিনিই আজ আনমনা। নিজের নতুন রচনা শোনান অন্যদিন, আজ দৃশ্যতই নিরুৎসাহ। আসরে উপস্থিত সদ্যযুবক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় পেশায় পুলিশ কোর্টের উকিল, নেশায় সাহিত্যানুরাগী। দ্বিধা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন।
—কী হয়েছে গুরুদেব? শরীর খারাপ?
রবীন্দ্রনাথ ম্লান হাসেন উত্তরে।
—না… তবে তোমাদের রবি ঠাকুর আর তেমন লেখা লিখতে পারবেন না।
সবাই সমস্বরে হাঁ-হাঁ করে ওঠেন।
—কেন? কী হল?
—যে ঝরনা-কলমে তোমাদের রবি ঠাকুর লেখেন, সেটি হারিয়ে গিয়েছে। কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
—সে কী! কোথায় গেল? ভাল করে খুঁজে দেখেছেন?
—না দেখে কী আর বলছি …
তাল কেটে যায় জোড়াসাঁকোর নিত্য সন্ধ্যার আসরের। পছন্দের কলম বেপাত্তা হয়ে যাওয়ায় সাহিত্য-আলোচনায় সেদিন আর মন বসছে না রবীন্দ্রনাথের। গান-গল্প-কবিতার জমায়েতে একটা নান্দনিক আবহের প্রয়োজন হয়। গৃহস্বামীর ঔদাসীন্যে সেটাই অন্তর্হিত।
.
মাসদুয়েক পরের দৃশ্য। আতর্নাদ ভেসে আসছে থানার ভিতর থেকে।
—আর কোনওদিন করব না হুজুর, এই কান মুলছি।
থানার বড়বাবু শোনেন। এবং পরমুহূর্তেই প্রচণ্ড ধমক দেন বাজখাঁই গলায়।
—চোপ! তুই তো যখনই ধরা পড়িস, একই কথা বলিস। কান মুলিস আর নাক মুলিস। স্বভাব যায় না ম’লে।
যার উদ্দেশে তর্জনগর্জন, সেই চোর বাবাজীবন নিরুত্তর। কোমরে দড়ি। হাঁটু মুড়ে বসে মাটিতে। চোখমুখ দেখে অনুমান করা যায়, কিছুক্ষণ আগেই অকৃপণ চড়থাপ্পড় হজম করতে হয়েছে। না হজম করে উপায়ই বা কী? এই বড়বাবুর জ্বালায় নিশ্চিন্তে ‘ইধার কা মাল উধার’ করার জো নেই। কোত্থেকে যে খবর পেয়ে যায় কে জানে!
মাসদুয়েক আগে এই অফিসারই ধরেছিল বেলগাছিয়া থেকে। আর এবার টালায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে হানা দিয়ে বমালসমেত। গতবার জামিন পাওয়ার পর কিছুদিন ঘাপটি মেরে থেকে তবেই ফের কাজে নেমেছিল। যাতে চট করে সন্দেহ না হয় পুলিশের।
দিব্যি চলছিল মাঝরাতে সিঁদ কেটে আর ভরদুপুরে ফাঁকতালে এর-ওর বাড়ি থেকে জিনিসপত্র হাতিয়ে। শেষ পর্যন্ত ঠিক ধরে ফেলল! পুলিশের তো শুনি বদলির চাকরি, এই বড়বাবুর বদলি হবে না? কতদিন হয়েছে এই থানায়?
ভাবনায় ছেদ পড়ে পিঠে লাঠির ঘায়ে।
—আর মারবেন না হুজুর…
—মারের আর কী দেখেছিস এখনও? কোনটা কোন বাড়ি থেকে চুরি করেছিস বল শিগগির, না হলে পিটিয়ে চামড়া তুলে দেব!
চোরের আস্তানা থেকে উদ্ধার হয়েছে সামগ্রী হরেকরকম। কাপড়চোপড়-গয়নাগাটি-বাসনকোসন-ঘড়ি-সোনার বোতাম-কলম-দোয়াত। থানার টেবিলে ছড়ানো রয়েছে চোরাই মাল।
—হুজুর, এটা কলুটোলার কাছে দোতলা বাড়ি থেকে… ওইটা ফলপট্টির পাশে যে ডাক্তারবাবু বসেন, তাঁর চেম্বার থেকে… আর এইটা…
বড়বাবু নোট করতে থাকেন গম্ভীর মুখে। তালিকা শেষ হলে হাঁক দেন অধস্তন অফিসারকে।
—গাড়ি লাগাতে বলো, বেরব। এ ব্যাটাকেও তোলো গাড়িতে। এই… ওঠ!
ঘাড় ধরে চোরকে গাড়িতে তোলেন থানার জমাদার। বড়বাবু জাঁকিয়ে বসেন সামনের সিটে। ড্রাইভার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। উত্তর আসে দ্রুত।
—প্রথমে কলুটোলা, তারপর ফলপট্টি, তারপর …
সন ১৯১৮। পুলিশ কোর্ট তখন ছিল লালবাজার চত্বরে। যেখানে বর্তমানে ট্র্যাফিক বিভাগ আর রিজার্ভ ফোর্সের বিভিন্ন শাখার অফিস, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের পশ্চিম প্রান্ত ঘেঁষে সেই তিনতলা লালরঙা বাড়িটিতে।
আদালতের কর্মকাণ্ডের আয়োজন প্রতিটি তলাতেই। একতলায় অফিসকাছারি, করণিকদের বসার ব্যবস্থা। দোতলায় পরিপাটি বার লাইব্রেরি এবং সেকেন্ড আর থার্ড প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্ট। পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিসও। তিনতলায় চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাস ছাড়াও ফোর্থ আর ফিফ্থ ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্ট। উকিলবাবুদের ব্যস্তসমস্ত আনাগোনায় আর মামলা-মকদ্দমার সওয়াল-জবাবে দিনভর গমগম করত পুলিশ কোর্ট। সেই কোর্ট, যা অগ্নিযুগের বহু ঘাত-প্রতিঘাতের প্রত্যক্ষদর্শী।
এই নিবন্ধের বিষয় অবশ্য অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা নন। ‘অচেনা লালবাজার’-এর এক ভিন্ন অধ্যায়। যার কেন্দ্রে অবস্থান আমাদের সর্বক্ষণের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের।
শুরুর অনুচ্ছেদে যাঁর প্রসঙ্গ উল্লেখিত, সেই সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় ওকালতি করতেন এই পুলিশ কোর্টেই। ব্রিটিশ সরকারের চাকরি গ্রহণে ঘোর অনীহা ছিল ছাত্রজীবন থেকেই। সাহিত্যসাধনায় জীবন অতিবাহিত করবেন, এই ছিল অভীষ্ট। সে বাসনায় বাধা দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, যাঁর অতীব স্নেহভাজন ছিলেন সৌরীন্দ্র। সদ্যযুবককে বুঝিয়েছিলেন কবি, ওকালতিকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করতে। আর সাহিত্যকে রাখতে নেশার অধিষ্ঠানে।
সৌরীন্দ্রমোহন সেদিন নিয়মমাফিক কোর্টে। হঠাৎ দেখলেন, গোপালবাবু প্রায় ছুটতে ছুটতে আসছেন, হাতে ধরা একটি কাগজ। গোপাল ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বাড়ির কর্মচারী। ব্যাংকে যাওয়া-আসা, ছোটখাটো ফাইফরমাশ খাটা, এসব করতেন নিষ্ঠাভরে। বিশ্বাসভাজন ছিলেন কবির। সৌরীন্দ্র অবাক হলেন, এই মাঝদুপুরে গোপালবাবু হঠাৎ কোর্টে? কবির কিছু হল না তো?
