আরও দুটি ট্রাঙ্ক কিনে সমানভাবে ভর্তি করা হল টাকাপয়সা। বিবিধ ঘুরপথ ব্যবহার করে সাতজনের দল পাতিপুকুর স্টেশনে পৌঁছল রাত আটটা নাগাদ। সেখান থেকে তিনটি গাড়ি ভাড়া করে ২০ নম্বর ফকিরচাঁদ মিত্র স্ট্রিটের গোপন ডেরায়। পরবর্তী কাজ ছিল লুঠের টাকা বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠীর কাছে নির্বিঘ্নে পৌঁছে দেওয়া বাঘা যতীনের নির্দেশমাফিক।
গার্ডেনরিচের ডাকাতির আকস্মিকতায় হতচকিত পুলিশের ঘোর কাটতে না কাটতেই দশদিনের মাথায় ফের হানা দিল ডাকাতদল। এবারও মোটরগাড়িতে সওয়ার হয়ে, টার্গেট বেলেঘাটার চাউলপট্টি রোডের বর্ধিষ্ণু চালকল মালিক ললিতমোহন বৃন্দাবন শাহ। যিনি ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ব্যবসায়ী বলে পরিচিত। ছ’-সাতজনের দলটি পিস্তল হাতে ২২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ চড়াও হল ললিতমোহনের বাড়ি। সংলগ্ন অফিসঘরে আসীন ক্যাশিয়ার চাবি দিতে অস্বীকার করলেন ক্যাশবাক্সের এবং তৎক্ষণাৎ কোমরের নীচে গুলিবিদ্ধ হলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় ললিতমোহনের কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে ২২,০০০ টাকা লুঠ হয়ে গেল মিনিটপাঁচেকের মধ্যে।
গার্ডেনরিচের ডাকাতিতে জড়িত বিপ্লবীদলের নেতৃত্বে ছিলেন বাঘা যতীনের অত্যন্ত বিশ্বস্ত অনুগামী নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, যিনি পরবর্তীকালে এম এন রায় হিসাবে বিখ্যাত হয়েছিলেন। পরিকল্পনা এবং রূপায়ণের নানা পর্যায়ে সঙ্গী ছিলেন অতুলকৃষ্ণ ঘোষ, সরোজভূষণ দাস, ফণীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বিমানচন্দ্র ঘোষ, রজনীকান্ত বসু, প্রকাশচন্দ্র বসু, বিজয়কৃষ্ণ ঘোষ, গোপালচন্দ্র দত্ত, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত, নীরেন দাশগুপ্ত প্রমুখ। বেলেঘাটার ঘটনাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল ফণীন্দ্রনাথ-মনোরঞ্জন-নীরেন ছাড়াও চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী এবং বাঘা যতীনের অনুগত একাধিক বিপ্লবীর।
বিড়ম্বিত লালবাজার পূর্ণশক্তিতে প্রত্যাঘাত করবে, প্রত্যাশিতই ছিল। ১৮ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের ফড়িয়াপুকুরের কাছে সাদা পোশাকের গোয়েন্দাদের হাতে গ্রেফতার হলেন নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। ২৪ ফেব্রুয়ারি পুলিশ হানা দিল ২০ ফকিরচাঁদ মিত্র স্ট্রিটের সেই বাড়িটিতে, যেখানে টাকাভর্তি ট্রাঙ্ক নিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারির রাতে উঠেছিলেন বিপ্লবীরা। রডা কোম্পানির লুঠ হওয়া একটি মাউজার পিস্তল এবং কিছু কার্তুজ ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার হল। গ্রেফতার হলেন চার বিপ্লবী, হীরালাল বিশ্বাস, নিরঞ্জন দাস, পতিতপাবন ঘোষ এবং রাধাচরণ প্রামাণিক।
দুটি অভিযানেরই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাব-ইনস্পেকটর সুরেশচন্দ্র মুখার্জী, যিনি তখন লালবাজারের কর্তাদের বিশেষ আস্থাভাজন। দুর্দান্ত সাহসী সুরেশের গোপন চরের সংখ্যা ছিল ঈর্ষণীয়। শহরে বিপ্লবীদমন অভিযানগুলিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল একরকম আবশ্যিকই। কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রেফতারের পর বিপ্লবীদের চরম নির্যাতনের ব্যাপারেও। নরেন্দ্রনাথ এবং অন্য সঙ্গীদের গ্রেফতারির পর বাঘা যতীন সিদ্ধান্ত নিলেন, সুরেশকে আর বাঁচিয়ে রাখা যায় না। রচিত হল নিধনের চিত্রনাট্য। যা অভিনীত হল কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে, হেদুয়া পার্কের ঢিলছোড়া দূরত্বে।
২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৫।
দিনকয়েক পরেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসব, স্বয়ং ভাইসরয়ের উপস্থিতিতে। অনুষ্ঠানের মহড়ার তদারকিতে কাকভোরেই বেরিয়েছেন সাব-ইনস্পেকটর সুরেশচন্দ্র মুখার্জী। সঙ্গী সাব-ইনস্পেকটর বনবিহারী মুখার্জী এবং দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত দেহরক্ষী শিউপ্রসাদ। খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছেন ভাইসরয়ের যাত্রাপথ। কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে পৌঁছনোর পর হঠাৎই চাপা স্বরে বনবিহারী দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সুরেশের।
—স্যার, ডানদিকে দেখুন…
—কী?
সুরেশের দৃষ্টিপথ ধাবিত হয় ডানদিকে, স্নায়ু সজাগ হয়ে ওঠে চকিতে। অন্যমনস্কভাবে ওই যে যুবক দাঁড়িয়ে আছে, তাকে তো হন্যে হয়ে খুঁজছেন গত কয়েক মাস ধরে। চিত্তপ্রিয়! চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, বাঘা যতীনের ছায়াসঙ্গী অনুচরদের অন্যতম। এ তো মেঘ না চাইতেই জল!
—একে ধরতেই হবে। Prize catch, ব্যাটা প্রচুর জ্বালিয়েছে। আমি গিয়ে সোজা মাথায় রিভলভার ঠেকাব, তুমি কভার দেবে পিছন থেকে।
—রাইট স্যার।
দ্রুত পদক্ষেপে সঙ্গীদের নিয়ে চিত্তপ্রিয়র সামনে পৌঁছলেন সুরেশ, চেপে ধরলেন শার্টের কলার। এবং পরমুহূর্তেই কোমরে গোঁজা রিভলভার বের করে গুলি চালালেন চিত্তপ্রিয়। কপালের ফের, গুলি ছুটল না। মিসফায়ার!
আশেপাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন সঙ্গী বিপ্লবীরা, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত, নীরেন দাশগুপ্ত, নরেন ঘোষচৌধুরী। লক্ষ রাখছিলেন ঘটনাপ্রবাহের উপর । বিপদ বুঝে দৌড়ে এলেন ত্রয়ী, নরেন পিছন থেকে গুলি চালালেন সুরেশকে লক্ষ্য করে। নির্ভুল নিশানা, সুরেশ ভূপতিত হলেন। পথমধ্যে শায়িত অফিসারের শরীরে বিপ্লবীদের বুলেট বিঁধল একাধিক।
ব্যর্থ হল সুরেশের সঙ্গীদের প্রতিরোধও। শিউপ্রসাদের ঊরুতে গুলি লাগল। বনবিহারীকে লক্ষ করে ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল অল্পের জন্য। প্রাতঃভ্রমণে বেরনো মুষ্টিমেয় পথচারীদের স্তম্ভিত দৃষ্টির সামনে শূন্যে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালালেন বিপ্লবীরা। অপারেশন সফল।
