কল্পনাতীত ছিল পথচলতি কতিপয় এলাকাবাসীরও। কলকাতা সাক্ষী থাকবে এহেন শিহরণ-জাগানো দৃশ্যের, কে ভেবেছিল?
শীতের নিরপরাধ সকাল। ঘড়িতে সাড়ে ছ’টা। শহর সবে পাশ ফিরে শুচ্ছে। আড়মোড়া ভাঙতেও দেরি আছে কিছু।
.
—থোড়া জলদি সর্দারজি…
শিখ ট্যাক্সিচালককে তাড়া দেন আরোহীদের একজন। কিঞ্চিৎ বিরক্ত চালক অ্যাকসিলেটরে চাপ বাড়ান পায়ের। গাড়িতে ওঠা ইস্তক মিনিটে মিনিটে শুনতে হচ্ছে, ‘জলদি চলিয়ে!’ এদের এত তাড়া কীসের? দু’-পাঁচ মিনিট এদিক-ওদিক হলে কী এসে যাবে?
গার্ডেনরিচ ক্রসিংয়ের কাছে আসতেই চাপা স্বরে বলে ওঠেন এক আরোহী, ‘রোখ দিজিয়ে ইয়াহাঁ।’
উলটোদিক থেকে একটা ছ্যাকড়া গাড়ি আসছে দুলকি চালে ঢিকিরঢিকির। দেখতে পেয়েই গাড়ির আরোহীরা সহসা উত্তেজিত, ‘রোখ দিজিয়ে সর্দারজি!’
কিন্তু এখানে থামাতে বলছে কেন? কৌতূহল চেপে রাখতে পারেন না চালক।
—ইয়াহাঁ? আপ লোগ তো অউর দূর যানেওয়ালে থে না?
উত্তরে কড়া ধমক শুনতে হয় চালককে।
—সওয়াল মত কিজিয়ে… ওহ গাড়ি কে সামনে লাগাইয়ে ট্যাক্সি… জলদি…
সন্দেহ হলেও কিছু করার ছিল না আর। আরোহীদের কোমরে গোঁজা পিস্তল ততক্ষণে উঠে এসেছে হাতে। ধাতব আগ্নেয়াস্ত্র নজরে পড়ে ট্যাক্সিচালকের, সভয়ে নির্দেশ পালন করেন বিনা বাক্যব্যয়ে।
.
১৯১৫ সালের প্রথমার্ধ। বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপ অনুভূত হচ্ছে বাংলার বিপ্লবী ক্রিয়াকর্মের গতিপ্রকৃতিতেও। ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রবল পরাক্রান্ত জার্মানির সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন বাঘা যতীনের নেতৃত্বে সমমনোভাবাপন্ন বিপ্লবীকুল। সাম্প্রতিক অতীতে ১৯১৪ সালের অগস্টে ডালহৌসির অদূরে অবস্থিত R B Rodda Co.-এর অস্ত্র লুঠের সফল অভিযানে বিপ্লবীরা উদ্দীপিত যেমন, দমনপীড়ন নীতির দৃঢ়তর প্রয়োগে তেমনই স্থিরসংকল্প পুলিশ প্রশাসন। ধরপাকড়-তল্লাশি অব্যাহত পূর্ণ মাত্রায়। গুপ্তচর বাহিনীর সক্রিয়তা তুঙ্গে। মহানগরীতে বিপ্লবীদের এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে রাজি নয় ‘যুদ্ধং দেহি’ লালবাজার।
ক্ষমতাধর রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে স্রেফ আবেগনির্ভর লড়াই ক্ষণস্থায়ী হতে বাধ্য, সম্যক উপলব্ধি করলেন বাঘা যতীন-বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী-রাসবিহারী বসু এবং অন্য নেতৃবর্গ। প্রয়োজন সাংগঠনিক শক্তির প্রসারের, প্রয়োজন অস্ত্রের নিয়মিত জোগানের। এবং এই দ্বৈত চাহিদা মেটাতেই সর্বোপরি প্রয়োজন অর্থের।
সশস্ত্র অভ্যুত্থানে বিশ্বাসী বঙ্গজ বিপ্লবীদের যিনি তখন অলিখিত সর্বাধিনায়ক, সেই বাঘা যতীন একাধিক গোপন বৈঠক করলেন। বার্তা দিলেন দ্ব্যর্থহীন, রাজশক্তিতে বলীয়ান প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুঝতে সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। এবং পরিস্থিতির সার্বিক বিচারে অগ্রাধিকারের শীর্ষে রাখতে হবে যে-কোনও মূল্যে দ্রুত অর্থাগমকে।
সে না হয় হল, কিন্তু কী উপায়ে হবে অর্থাগম?
.
১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৫। বেলা দ্বিপ্রহর। মান্ধাতার আমলের জরাজীর্ণ ছ্যাকড়া গাড়ি ঢিমেতালে এগোচ্ছে গার্ডেনরিচের দিকে। আরোহী বলতে Messrs Bird & Co-র এক নিচুতলার কর্মচারী এবং দুই দারোয়ান।
বার্ড কোম্পানির টাকাভর্তি দশটি পাটের বস্তা রয়েছে গাড়িতে। গন্তব্য বদরতলার South Union Mill, উদ্দেশ্য পাটকলের কর্মচারীদের মাসিক বেতন পৌঁছে দেওয়া। শম্বুকগতির গাড়ির দুলুনির সঙ্গে সঙ্গত দিচ্ছে শীতের দুপুররোদ। ঝিমুনির আয়েশি আমেজ গ্রাস করেছে আরোহীদের।
ঝিমুনিতে ছেদ পড়ল গার্ডেনরিচ মোড়ের কাছাকাছি আসতেই। পথরোধ করে দাঁড়াল একটি ট্যাক্সি, যার চালকের আসনে ভয়ার্ত চেহারার এক মধ্যবয়সি শিখ। যিনি একটু আগেই তীব্র ধমক শুনেছেন—
—সওয়াল মত কিজিয়ে… ওহ গাড়ি কে সামনে লাগাইয়ে ট্যাক্সি… জলদি…
ট্যাক্সি থেকে লাফিয়ে নামেন চারজন যুবক। প্রত্যেকের হাতে উদ্যত পিস্তল। আরও জনাতিনেক ভোজবাজির মতো আবির্ভূত আগ্নেয়াস্ত্র হাতে, অকুস্থলের আশেপাশেই যাঁরা অপেক্ষমাণ ছিলেন এতক্ষণ। ঘোড়ার গাড়ি থেমে গেল বাধ্যত। পরের মিনিটদশেকের মধ্যে কর্মচারী ও দারোয়ানদের মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে গাড়ি থেকে নামানো, টাকাভর্তি থলিগুলি ট্যাক্সিতে ওঠানো, চালককে বলপূর্বক নামিয়ে দিয়ে সাতজনের দলের ট্যাক্সি নিয়ে চম্পট দেওয়া।
লুঠ করা থলিগুলির ওজন নেহাত কম ছিল না। ৩৪০০ টাকা ৩৪০টি নোটে, চাঁদির এক টাকা হিসাবে ১৩,৩০০ টাকা, আধুলি ৯৪০ টাকার। বাকি সব চার-আনা, দু-আনা এবং খুচরো পয়সা। সব মিলিয়ে ১৮,০০০ টাকা।
ট্যাক্সি চলতে শুরু করল দক্ষিণ শহরতলির বারুইপুরের দিকে। মধ্যপথে রাজপুরের কাছে একটি টায়ার অকেজো হয়ে গেল, সেই অবস্থাতেই সুবুদ্ধিপুর অবধি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হল মোটরগাড়ি। বারুইপুরের একটি দোকান থেকে দুটি তোরঙ্গ কিনে ভরা হল টাকাপয়সা।
ট্যাক্সি পড়ে রইল স্থানীয় একজনের জিম্মায়। যাঁকে বলা হল, কলকাতা থেকে মেরামতির যন্ত্রপাতি নিয়ে ফিরবেন আরোহীরা। বারুইপুর স্টেশন থেকে দুটি ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে তুলে দেওয়া হল টাকাভর্তি ট্রাঙ্ক। পথবদল করে যাত্রা এরপর উত্তরে, সুন্দরবন অভিমুখে। নৌকাযাত্রায় পেচুয়াখালি পৌঁছে দিনদুয়েকের আত্মগোপন, অতঃপর টাকীতে সদলে উপস্থিত হওয়া ১৫ ফেব্রুয়ারির সকাল এগারোটায়।
