বিপিনবিহারীর তত্ত্বাবধানে বাংলার বিভিন্ন বিপ্লবী দলের কাছে পরের কয়েকদিনে পৌঁছে গেল অত্যাধুনিক মাউজার এবং পর্যাপ্ত গুলি। যার কিয়দংশ পৌঁছেছিল বাঘা যতীনের কাছেও, যিনি তখন আক্ষরিক অর্থেই ব্রিটিশ সরকারের ত্রাস হয়ে উঠেছেন। বুড়িবালামের তীরে ১৯১৫-র ৯ সেপ্টেম্বর বিশাল ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে বাঘা যতীন এবং তাঁর চার সঙ্গীর বহুশ্রুত লড়াইয়ে ব্যবহৃত হয়েছিল লুঠ হওয়া কয়েকটি মাউজার এবং গুলি। অসম যুদ্ধে মরণপণ লড়েছিলেন বাঘা যতীন, চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, জ্যোতিষ পাল, মনোরঞ্জন সেনগুপ্ত এবং নীরেন দাশগুপ্ত। নতিস্বীকার অনিবার্য ছিল গুলি ফুরিয়ে আসার পর।
—গুলি শেষ হয়ে আসছে..
—হুঁ, কতক্ষণ টানা যাবে আর?
বহুপঠিত তথ্য, ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান চিত্তপ্রিয়। পরের দিন হাসপাতালে গুরুতর আহত বাঘা যতীনের প্রয়াণ। জ্যোতিষের ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়, নীরেন আর মনোরঞ্জনের ফাঁসি।
১৯১৭-র সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুলিশ ৩১টি মাউজার পিস্তল এবং প্রায় সাতাশ হাজার গুলি উদ্ধার করেছিল। তবে তার আগে বিস্তর ক্ষতি যে হয়ে গিয়েছিল ইংরেজদের, তা নিহিত রয়েছে পরিসংখ্যানে। লুঠের মাউজার পিস্তল আর গুলি দিয়ে সারা বাংলায় ৪৪টি রাজনৈতিক ঘটনায় বিপ্লবীদের হাতে নিহতের সংখ্যা ছিল ২৭, আহত ৪৪।
রাজদ্রোহের বারুদ মজুতই ছিল, অগ্নিসংযোগের জরুরি কাজটি করেছিল অস্ত্র লুঠের সফল অভিযান। যার নেপথ্য নায়ক ছিলেন হাবু মিত্র। শত চেষ্টাতেও যাঁকে ধরতে পারেনি পুলিশ। শ্রীশ পাল, অনুকূলচন্দ্র মুখার্জী সহ অনেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন। বিচারের পর ঘটেছিল সাজাপ্রাপ্তি। হাবু ছিলেন অধরাই। কোথায় পালিয়েছিলেন? কী হয়েছিল পরিণতি?
লুঠের ঘটনার রাতেই দার্জিলিং মেল ধরেছিলেন হাবু। রংপুরের কুড়িগ্রামের বিপ্লবী ডাক্তার সুরেন্দ্র বর্ধনের বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন কিছুকাল। পুলিশি নজর এড়াতে ডাক্তার বর্ধন এরপর হাবুকে পাঠিয়ে দেন আসামের গোয়ালপাড়ায় রাভা উপজাতিদের হেফাজতে। কিছুদিন পরে জানতে পারেন, হাবু মণিপুরের দিকে রওনা দিয়েছেন। পরবর্তী ঘটনাবলি নিয়ে প্রামাণ্য তথ্য নেই। সুরেন্দ্র বর্ধনের লেখনীতে, ‘আমার মনে হয়, হাবুর যেরূপ দুঃসাহস, ভারতবর্ষ পেরিয়ে যাইতে চেষ্টা করা অসম্ভব নয়। ঐ সময়ে কোন দুর্ঘটনা হওয়াও অসম্ভব নয়।’
দুর্ভাগ্যের, হাবু মিত্রের কোনও ছবির সন্ধান পাওয়া যায় না।
.
বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বন্দিত নায়কের তালিকা দীর্ঘ। ক্ষুদিরাম-প্রফুল্ল চাকী-বাঘা যতীন-বিনয়-বাদল-দীনেশের মতো বরণীয়দের জন্য ইতিহাস বরাদ্দ রেখেছে প্রাপ্য সমাদর। কলকাতা পুলিশের সংগ্রহে থাকা ইতিহাসযাপনে তবু মনে হয়, ওঁরা তো চিরপ্রণম্যই, তবে ভাবীকালের কৃপাদৃষ্টি প্রাপ্তির মানদণ্ডে হয়তো কিঞ্চিৎ ভাগ্যবানও বটে।
হাবু মিত্রের মতো কত অনামী-অজানা-অচেনা বিপ্লবী ছিলেন এই বাংলায়। অপরিমেয় অবদান ছিল অগ্নিযুগের উথালপাথালে, অথচ বিস্মৃত ‘কত প্রাণ হল বলিদান’-এর বহুবচনে, ‘কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা’র সমষ্টিতে। নেপথ্যচারী পার্শ্বনায়করা কাব্যে উপেক্ষিত থেকে গেছেন। ইতিহাসেও। আবক্ষ মূর্তি নেই এঁদের। নেই জন্ম বা মৃত্যুজয়ন্তী পালনের সাদর সমারোহ।
তবু মনে রেখো।
০৫. লেখা আছে অশ্রুজলে
—এটা ঠিক করছিস না… এটা আত্মহত্যা।
শয্যাশায়ী যুবক শোনেন এবং প্রত্যুত্তরে হাসতে চেষ্টা করেন।
—তোরা বারবার এক কথা বলছিস কেন? বলেছি তো, দেখাব না ডাক্তার।
—দেখাব না বললেই হল? তুই এভাবে সুইসাইড করবি আর সেটা আমাদের দেখতে হবে? এত ইমোশনাল হলে লড়াইটা জারি থাকবে কী করে?
শরীরে দৃশ্যতই যন্ত্রণার অনায়াস আধিপত্য, তবু সিদ্ধান্তে অনড়ই থাকেন যুবক।
—দয়ার দান নেওয়ার থেকে মৃত্যু ভাল। দাক্ষিণ্য চাই না ওদের। কুকুর-ছাগলের মতো ব্যবহার করার আগে এরপর ওদের ভাবতে হবে… এটাও তো লড়াই-ই…
—কিচ্ছু ভাববে না ওরা… মেডিক্যাল রিপোর্টে লিখে রাখবে তুই রিফিউজ় করেছিস চিকিৎসা। আমরা আইনি পথে কিছুই করতে পারব না।
—লিখুক যা খুশি, তোরা জোর করিস না আমাকে আর…
যন্ত্রণায় ফের কুঁকড়ে যায় যুবকের শরীর। ঘিরে থাকা বন্ধুদলকে অসহায় দেখায়। অবশ্যম্ভাবী পরিণতির প্রহর গোনা ছাড়া উপায়?
.
অধস্তন সহকর্মীর গলায় উত্তেজনার আঁচ সচকিত করে উর্দিধারী অফিসারকে।
—স্যার, ডানদিকে দেখুন…
—কী?
—ওই যে…
অফিসার ঝটিতি দৃষ্টিপথ ঘোরান ডানদিকে। এবং দেখেই তড়িতাহত প্রায়। যুগপৎ বিস্ময়ে এবং অভাবিত প্রাপ্তির পুলকে। এ তো মেঘ না চাইতেই জল! কালবিলম্ব করা নির্বুদ্ধিতা হবে বুঝে সতর্ক করেন দেহরক্ষীকে।
—বনবিহারী, সাবধানে। একে ধরতেই হবে। Prize catch, ব্যাটা প্রচুর জ্বালিয়েছে। আমি গিয়ে সোজা মাথায় রিভলভার ঠেকাব, তুমি কভার দেবে পিছন থেকে।
—ওকে স্যার।
—ছেলেটা কিন্তু মহা বিচ্ছু। ডেঞ্জারাস। গোলমাল দেখলেই গুলি চালাবে। অর্ডারের অপেক্ষা করার কোনও দরকার নেই। ক্লিয়ার?
—রাইট স্যার।
—আর শিউপ্রসাদ… তুমি ঠিক আমার কয়েক পা পিছনে থাকবে…
—জি সাব।
উত্তর কলকাতার হেদুয়ার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যমনস্ক যুবকের কয়েক পা দূরত্বে ক্ষিপ্র পদচারণায় পৌঁছন উর্দিধারী। কোমরের হোলস্টার থেকে রিভলভার বের করার আগেই বিপত্তি। এমনটা যে হতে চলেছে, কল্পনার অতীত ছিল লালবাজারের ডাকসাইটে অফিসারের।
