জাহাজে মাউজার পিস্তল আর গুলি আমদানির খবর হাবুই জানালেন অনুকূলচন্দ্রকে। অস্ত্র লুঠের নিখুঁত ছক কষলেন বিপ্লবীরা। ছাতাওয়ালা গলির গোপন সভায় হাবুও ছিলেন। সভা শেষের কিছু পরে, সেই রাতেই আবার বৈঠক বসল হাবু মিত্রের বাড়িতে। সিদ্ধান্ত হল, অনুকূল একটি গোরুর গাড়ির ব্যবস্থা করবেন। বিহারি গাড়োয়ানের বেশে সেই গাড়ি চালাবেন হরিদাস দত্ত। গাড়ির অদূরে কোমরে গোঁজা রিভলভার সমেত দু’পাশে হাঁটবেন শ্রীশ পাল এবং খগেন দাস। চার বিপ্লবী— সুরেশ চক্রবর্তী, বিমান ঘোষ, আশুতোষ রায় এবং জগৎ ঘোষের উপর দায়িত্ব পড়ল ডালহৌসি স্কোয়ারের আশেপাশে সাদা পোশাকের গোয়েন্দাদের উপর নজর রাখার। কোনওরকম বিপদের আভাস পেলেই যাঁরা চিৎকার করে গান ধরবেন হরিদাস দত্ত-শ্রীশ পালদের সতর্ক করে দিতে।
ঘটনার আগের রাতে হরিদাস দত্তকে পরম যত্নে গাড়োয়ানের সাজে সাজিয়েছিলেন আদতে দুমকার বাসিন্দা প্রভুদয়াল হিম্মতসিংকা। যিনি ছিলেন আদ্যন্ত দেশপ্রেমিক, নানাবিধ সমাজসেবামূলক ক্রিয়াকর্মে নিবেদিত। প্রখ্যাত সলিসিটর হয়েছিলেন পরবর্তী কালে।
এতটাই চাতুর্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছিল লুণ্ঠনপর্ব, কোম্পানির মালিক Mr. Prike ওয়াটারলু স্ট্রিট থানায় (তখনও হেয়ার স্ট্রিট থানার পত্তন হয়নি) দিনতিনেক পরে অভিযোগ জানানোর আগে পর্যন্ত ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পায়নি লালবাজার। গাফিলতির অভিযোগে কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেই সরকার, জানতেন Prike সাহেব। তিনদিন হন্যে হয়ে খোঁজখবর করেও যখন হদিশ মিলল না খোয়া যাওয়া অস্ত্রের, পুলিশে অভিযোগ দায়ের করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।
নগরপাল Fredrick Loch Halliday সহ লালবাজারের কর্তাব্যক্তিদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল খবর জানাজানি হওয়ার পর। বিশ্বযুদ্ধের বাজারে এত অস্ত্র বিপ্লবীদের হাতে চলে গেল দিনেদুপুরে, কলকাতা পুলিশের সদর দফতরের নাকের ডগা দিয়ে, বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে? লালবাজার সর্বশক্তি প্রয়োগ করল অস্ত্র উদ্ধারে। গোয়েন্দাদের রাতের ঘুম অন্তর্হিত হল টেগার্টের হুংকারে।
—Officers.. I want recovery. At any cost and within the quickest possible time. Do whatever it takes. I won’t take any excuses this time. They just can’t get away with this.
২৭ সেপ্টেম্বর ৩৪, শিবঠাকুর লেন থেকে গ্রেফতার হলেন হরিদাস দত্ত। উদ্ধার হল গুলিভর্তি ট্রাঙ্ক। বিপ্লবী হরিদাস দত্তের স্মৃতিচারণে লিপিবদ্ধ আছে গ্রেফতারির পর তাঁকে থানায় নিয়ে আসার পরের দৃশ্য। খবর পেয়েই টেগার্ট সহ কর্তারা চলে এলেন থানায়। হরিদাসকে দেখেই টেগার্টের মন্তব্য সহাস্য, ‘Hello Royal Bengal Tiger! Now you are bagged!’
উদ্ধার হওয়া ট্রাঙ্ক খোলার পর উচ্ছ্বাস অবশ্য ক্ষণস্থায়ী হল টেগার্টের। গুলি গোনার পর দেখা গেল, সব মিলিয়ে ২১,২০০ রাউন্ড। পরের দিন ৬১/১/১ কানুলাল লেনে বিপ্লবীদের গোপন ডেরা থেকে উদ্ধার হল আরো ১,০৪০ রাউন্ড। বছরের বাকি কয়েক মাসে দুটি পিস্তল এবং আরও ৯৬০ রাউন্ড গুলি বিভিন্ন জায়গায় খানাতল্লাশির পর। সব মিলিয়ে ২৩,২০০। বাকি গুলি? পিস্তল? কোথায় গেল?
পুলিশের বার্ষিক প্রশাসনিক প্রতিবেদনে ঘটনার বিবরণ ছিল বিস্তারে।
On the 26th August 50 Mauser pistols and 46,000 rounds of ammunition were stolen by Srish Chunder Mittra, the Customs House sirkar of Messrs. R B Rodda & Co. This sirkar was entrusted by the firm with the necessary documents and papers for clearing a consignment of arms and ammunition from the Custom House and took delivery of the goods. One cart containing the abovementioned Mauser pistols and ammunition was diverted from a string of seven carts on the way from Custom House and was eventually traced to an iron yard off Wellington Street where it was found that the arms ammunition had been removed from the carts and stolen. Srish Chundra Mittra disappeared and has not since been found. These weapon and ammunition passed into the hands of anarchists and have been used in dacoity and theft cases. Two pistols and 23,200 rounds of ammunition have since been recovered. Ten persons were prosecuted in connection with this theft and conspiracy to steal, of whom six were discharged and four convicted and sentenced to two year’s rigorous imprisonment each during the current year. The question as to what action was to be taken against the firm responsible for this large loss of arms and ammunition was still under the consideration of the Government at the close of the year.
.
বাকি অস্ত্র এবং গুলি পাচার হয়ে গিয়েছিল লুঠের দিনই। পরিকল্পনামাফিক হরিদাস দত্ত গোরুর গাড়ি নিয়ে পৌঁছেছিলেন মলঙ্গা লেনের কাছে কান্তি মুখার্জীর লোহার গুদামের কাছে একটি মাঠে। বিপিনবিহারীর নির্দেশমতো তিন বিপ্লবী, সতীশ দে, বসন্ত দাস এবং জগৎ গুপ্ত কুলির বেশে পৌঁছলেন মাঠে। যুদ্ধকালীন ক্ষিপ্রতায় কয়েকটি ঠিকাগাড়িতে সমস্ত পেটি বোঝাই করে নিয়ে গেলেন ৩, জেলেপাড়া লেনে ভুজঙ্গভূষণ ধরের বাড়িতে। মাঝরাত পর্যন্ত চলেছিল পিস্তল আর গুলি নতুন কেনা বেশ কয়েকটি স্টিলের ট্রাঙ্কে ভরার কাজ। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল কাঠের পেটিগুলি।
