কার্যকারিতার অভিনবত্বে মাউজার ছিল বিপ্লবীদের কাছে উৎকৃষ্ট হাতিয়ার। মাউজার পিস্তলের ‘effective range’ ছিল ৫০০ গজ। একে পিস্তল হিসাবে যেমন ব্যবহার করা যেত, পিস্তল রাখার জন্য কাঠের যে খোল আছে সেটি পিস্তলের সঙ্গে জুড়ে নিলে দূরপাল্লার রাইফেলের মতো কাঁধের উপর রেখে করা যেত গুলি নিক্ষেপ।
বিপ্লবীরা এই সুযোগ হারাতে চাইলেন না। সিদ্ধান্ত হল অস্ত্র লুঠের, সম্মতি মিলল বিপিনবিহারী এবং বাঘা যতীনের। ২৪ অগস্ট লালবাজারের অদূরেই ছাতাওয়ালা গলিতে এক গুপ্তসভায় মিলিত হলেন বিপ্লবীরা। সে সময় ঢাকার হেমচন্দ্র ঘোষের ‘মুক্তিসংঘ’-এর প্রতিনিধি হিসাবে কলকাতায় কাজ করছিলেন শ্রীশ পাল এবং হরিদাস দত্ত। শ্রীশ পালের উপর দায়িত্ব ন্যস্ত হল অভিযানের পরিকল্পনার।
ঠিক কীভাবে অস্ত্র লুঠের চেষ্টা হবে, বুঝিয়ে বললেন শ্রীশ। সব শুনে বেঁকে বসলেন বৈঠকে উপস্থিত নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, যিনি পরবর্তীকালে এম এন রায় হিসাবে বিখ্যাত হবেন। স্পষ্ট জানালেন, এই অভিযান অলীক কল্পনা ব্যতীত কিছু নয়।
—I disagree. তোমরা যা ভাল বোঝো করো। আমি এর মধ্যে নেই। Hope you can pull this off.
নরেন্দ্রনাথ বেরিয়ে গেলেন। বাকিরা বসলেন ম্যাপ নিয়ে। শ্রীশ বুঝিয়ে দিলেন ভৌগোলিক খুঁটিনাটি।
—ম্যাপটা মন দিয়ে দেখো সবাই… এইখানে লালবাজার… আর এই হল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্ট্রিট…
.
২৬ অগস্ট, ১৯১৪। সকাল সোয়া এগারোটা। ডালহৌসির অফিসপাড়ায় প্রাত্যহিক তাড়াহুড়োর পরিচিত দৃশ্যপট। গাড়িঘোড়া অবিরাম, নিত্যযাত্রীদের ওঠানামা, বাতাসে ব্যস্ততার গন্ধ।
রডা কোম্পানির বিশ্বস্ত কর্মচারী শ্রীশ চন্দ্র (হাবু) মিত্র যাবতীয় নথিপত্র নিয়ে হাজির কাস্টমস হাউসের সামনে (বর্তমানে নেতাজি সুভাষ রোডের যেখানে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অফিস, তার অদূরেই)। হাবুর আদবকায়দা ছিল সাহেবি। ট্রাউজার, ধোপদুরস্ত হাফ শার্ট, পায়ে চকচকে বুটজুতো। বাহারি গোঁফ একটা ভারিক্কি ভাব এনেছিল বলিষ্ঠ চেহারায়। প্রথম দর্শনে সমীহের উদ্রেক হওয়া সঙ্গত।
সাতটি গোরুর গাড়ি আনা হয়েছে মালপত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য। সপ্তম গাড়িটি মিনিটপাঁচেক দেরি করেছে আসতে। বিরক্ত হাবু বাজখাঁই ধমক দিয়েছেন গাড়োয়ানকে, ‘উল্লু কে পাটঠে, জলদি কিউঁ আয়ে নেহি!’ গাড়োয়ান কাঁচুমাচু মুখে অধোবদন।
২০২টি কাঠের পেটি খালাস হল মালসমেত। ১৯২টি পেটি বোঝাই হল প্রথম ছ’টি গাড়িতে। দেরিতে আসা সপ্তম গাড়িতে বাকি ১০টি। সব কয়টি পেটিতেই কোম্পানির আদ্যক্ষর ‘RBR’।
লালবাজার থেকে বড়জোর একশো-দেড়শো মিটার দূরত্বের কাস্টমস হাউস থেকে সাতটি গাড়ির সারি রওনা দিল ভ্যান্সিটার্ট রো-র গুদামের উদ্দেশে। পঞ্চম এবং ষষ্ঠ গাড়ির মাঝামাঝি পায়ে হেঁটে তদারকিতে হাবু। মূল সড়ক থেকে ডানদিকে গুদামের রাস্তা ধরল প্রথম ছ’টি গাড়ি। সপ্তম গাড়ি সবার অলক্ষ্যে সোজা চলল পুবদিকে। ম্যাঙ্গো লেন, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্ট্রিট, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট পেরিয়ে চাঁদনি চকের পাশ দিয়ে ওয়েলিংটনের নিকটস্থ মলঙ্গা লেনের পথে। মিশন রো অথবা গণেশচন্দ্র অ্যাভিনিউয়ের অস্তিত্ব ছিল না তখন।
গোরুর লেজ মুড়িয়ে দ্রুত চালাচ্ছিলেন সপ্তম গাড়ির গাড়োয়ান। ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল। পকেটে খইনির ডিবে। হাতের চেটোয় চুনের দাগ। গলায় ধুকধুকি। সাজটা জব্বর হয়েছে। গত রাতের কথা ভেবে নিজের মনেই হেসে ফেলেন।
—আর কত ছোট করবে? এ তো বাটিছাঁট হয়ে যাচ্ছে পুরো।
—চুপ করে বসো তো। বিহারিদের চুল আরও ছোটও হয়।
.
গুদামে পৌঁছে হিসাব মিলাতে গিয়ে মাথায় হাত হাবুর। সাত নম্বর গাড়িটা কোথায়? ওটাতেই তো আসল জিনিস ছিল। রওনা হওয়ার আগে চালান দেখে মিলিয়ে নিয়েছিলেন। দশটা পেটি ছিল। আটটায় নম্বর ছিল ৩৯৬ থেকে ৪০৩। প্রতিটিতে ৫০০০ করে মাউজারের গুলি। ৪০৪ নম্বর পেটিতে ছিল ৬০০০ গুলি। বাকি একটি পেটির নম্বর ছিল ৮২৮, যার মধ্যে ছিল .৩০০ বোরের ৫০টি মাউজার পিস্তল। সব মিলিয়ে ৪৬,০০০ গুলি আর পঞ্চাশটা মাউজার লোপাট? সর্বনাশ!
সপ্তম গাড়ির খোঁজে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে গেলেন হাবু। এবং সেই যে গেলেন, গেলেন তো গেলেন, আর ফিরলেন না। ফেরার কথাও ছিল না।
তিনিই তো লুঠের প্রধান কুশীলব!
শ্রীশ চন্দ্র (হাবু) মিত্রের জন্ম ১৮৯০ সালে হাওড়ার রসপুর গ্রামে। শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত মধ্য কলকাতার মলঙ্গা অঞ্চলের ১৪, দাস লেনের মাতুলালয়ে। লেখাপড়ার সঙ্গে সংস্রব ছিল না বিশেষ। ছোটবেলা থেকেই ‘বাপরে কী ডানপিটে ছেলে!’ ভয়ডরহীন দস্যিপনার জন্য এলাকায় নামডাক ছিল হাবুর।
আত্মোন্নতি সমিতির অনুকূলচন্দ্র মুখার্জী থাকতেন ৩৯, মলঙ্গা লেনে। দেশপ্রেমের মন্ত্রে সদ্য যুবকদের দীক্ষিত করা ছিল তাঁর অন্যতম কাজ। পাড়ার ডানপিটে ছেলে হাবুর উপর নজর পড়ল অনুকূলের। নিয়ে গেলেন সমিতির আখড়াতে। প্রশিক্ষণ চলল মুষ্টিযুদ্ধ-লাঠিখেলা-শারীরিক কসরতের। বছরদুয়েক পরে হাবু যখন শক্তসমর্থ, J F Madan কোম্পানির স্টোরকিপারের পদে বহাল হতে সহায়তা করলেন অনুকূল।
বিপিনবিহারী গাঙ্গুলীর এক সুহৃদ রডা কোম্পানির কর্মী ছিলেন। যাঁর মধ্যস্থতায় ১৯১৩ সালের অগস্ট মাসে রডা কোম্পানিতে চাকরি হল হাবুর। মাসিক বেতন সাকুল্যে তিরিশ টাকা। কর্মনিষ্ঠায় অল্পদিনেই কোম্পানির কর্ণধার Mr. Prike-এর অত্যন্ত বিশ্বস্ত হয়ে উঠলেন হাবু। Jetty clerk-এর পদে উন্নতি হল দ্রুত, দায়িত্ব পেলেন আমদানি হওয়া মাল খালাসের। ১৯১৪ সালের অগস্ট পর্যন্ত অন্তত ৪০বার মাল খালাস করেছিলেন নিখাদ পেশাদারিত্বে। মালিকের বিশ্বাস আর আস্থা অর্জন করেছিলেন অনায়াসে।
