—আর কত ছোট করবে? এ তো বাটিছাঁট হয়ে যাচ্ছে পুরো…
—চুপ করে বসো তো, বিহারিদের চুল আরও ছোট হয়।
—এর থেকে ভাল, ন্যাড়াই করে দাও।
—দরকার হলে করতাম। আপাতত এই যথেষ্ট।
—বাঁচা গেল, এবার উঠতে পারি?
—হ্যাঁ। খইনির ডিবেটা দেরাজে রাখা আছে, ওটা ভুলো না।
—খইনির বদলে পান চলবে?
—না। খইনিই। খেতে হবে না, ডিবেটা সঙ্গে রাখবে। মাঝে মাঝে খাওয়ার ভান করতে পারো। আর হাতের চেটোয় চুনের দাগটা যেন থাকে।
—বুঝলাম। আর কিছু?
—আর একটা জিনিস শুধু। এই ধুকধুকিটা গলায় ঝুলিয়ে নিয়ো।
—কী এটা?
—বললাম তো… ধুকধুকি… পিতলের জিনিস… ভেরি কমন ইন বিহার।
সাজসজ্জা সম্পূর্ণ হলে আয়নার সামনে দাঁড়ালেন যুবক এবং নিজের চেহারা দেখে চমকিত। দেখে কে বলবে, নিখাদ বঙ্গসন্তান! এ তো পাক্কা বিহারি দেখাচ্ছে!
.
সুঠাম চেহারার যুবককে দৃশ্যতই উত্তেজিত দেখায়। সোজাসাপটা বলে দেয় সঙ্গীদের, এসব আকাশকুসুম কল্পনা।
—মাথা খারাপ হয়েছে তোমাদের? এটা হয় না… জাস্ট ইম্পসিবল!
—এত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। কেন হয় না? কীসের ইম্পসিবল?
—এই মিটিংটা লালবাজারের কাছে হচ্ছে মানে তোমরা ধরে নিচ্ছ অ্যাকশনটাও লালবাজারের নাকের ডগায় করা যাবে? অত সোজা?
—ঠিকঠাক প্ল্যান করলে না পারার কিছু নেই।
—একচুল এদিক-ওদিক হলে কী হতে পারে ভেবেছ? পুলিশ হেডকোয়ার্টার একশো মিটারের মধ্যে। টহলদারি ইদানীং বেড়ে গেছে। সাদা পোশাকের পুলিশ চারপাশে ছড়িয়ে থাকে সর্বক্ষণ। ভাবলে অন্য রাস্তা নিশ্চয়ই বেরবে।
—হতে পারে। কিন্তু সময় কোথায় হাতে? যা করার খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে। আর এমন সুযোগও বারবার আসবে না। ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
—I disagree. তোমরা যা ভাল বোঝো করো। আমি এর মধ্যে নেই। Hope you can pull this off.
লালবাজার থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বের ছাতাওয়ালা গলিতে চলছিল গোপন বৈঠক। মতানৈক্যের জেরে মিটিং ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন দীর্ঘদেহী যুবক। সন্ধ্যা পেরিয়ে তখন রাত। ঘড়ির কাঁটা পা রেখেছে নয়ের ঘরে।
বাকিরা বসে পড়লেন ম্যাপ নিয়ে। এলাকার ভূগোল জানা প্রয়োজন পুঙ্খানুপুঙ্খ। মানচিত্রে লাল দাগ পড়তে লাগল কিছু দিকচিহ্নে। ডালহৌসি স্কোয়ার… লালবাজার…কাস্টমস হাউস… ব্রিটিশ ইন্ডিয়া স্ট্রিট… মলঙ্গা লেন… হিন্দ সিনেমা…
.
থমথম করছে স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের প্রধান চার্লস টেগার্টের চোখমুখ। হাতে ধরা ‘The Statesman’, প্রথম পাতার হেডলাইন, ‘The greatest daylight robbery’।
টেগার্টের বাক্যবাণ বর্ষিত হয় সহকর্মীদের উপর।
—So gentlemen, how has all this happened right under our noses? You think there is anything more embarrassing than this?
ইলিসিয়াম রো (বর্তমানে, লর্ড সিনহা রোড)-র স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের দফতরে বৈঠক চলছে জরুরি। টেগার্টের তিরস্কারে অফিসাররা নতমস্তক। নিশ্চুপ এতটাই, পিন পড়লে মনে হবে বোমাবর্ষণ হচ্ছে বুঝি।
—Officers, I want recovery. At any cost and within the quickest possible time. Do whatever it takes. I won’t take any excuses this time. They just can’t get away with this.
অফিসাররা শুনলেন এবং বুঝলেন, পেশাদারি অহংয়ে আঘাত লেগেছে দোর্দণ্ডপ্রতাপ টেগার্টের। এই মামলায় সামান্যতম ঢিলেমিও বরদাস্ত করবেন না টেগার্ট। ক্ষুরধার বুদ্ধি এবং কর্মনৈপুণ্যের যোগফলে যিনি তখনই ব্রিটিশ প্রশাসনে প্রায় কিংবদন্তিসম।
.
১৯১৪ সালের মধ্যভাগ। অস্থিরতা ক্রমবর্ধমান বিশ্বের রাজনীতিতে। পরিবর্তন ঘটছে বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের রসায়নে। দ্রুত মেরুকরণে পটভূমি প্রস্তুত হচ্ছে সম্মুখসমরের। ২৮ জুন অস্ট্রিয়ার আর্চডিউকের হত্যার প্রতিক্রিয়ায় সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি।
প্রহর গোনা শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের। যুযুধান দেশের বন্ধুরাষ্ট্রগুলি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ল একে একে। জার্মানির নেতৃত্বে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি-বুলগেরিয়ার ‘কেন্দ্রীয় শক্তি’ বনাম সার্বিয়া-রাশিয়া-ফ্রান্স-জাপান-ইংল্যান্ডের ‘মিত্রশক্তি’। যুদ্ধের সূচনা হল । যা স্থায়ী হয়েছিল দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি। মিত্রশক্তির শিবিরে ক্রমে যোগ দিয়েছিল ইতালি-রোমানিয়া-আমেরিকাও।
বিশ্বযুদ্ধের এই অনিশ্চিত প্রেক্ষাপটে রাসবিহারী বসু এবং যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের (বাঘা যতীন) মতো বঙ্গজ বিপ্লবীরা পরিকল্পনা করতে শুরু করলেন সশস্ত্র অভ্যুত্থানের। ব্রিটিশরাজকে লাগাতার আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত করে তোলার এই হল প্রকৃষ্ট সময়, একমত হলেন বাংলার বিপ্লবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ।
ব্রিটিশ প্রশাসনের অজ্ঞাত ছিল না বিপ্লবীদের এই সক্রিয়তা। যুদ্ধের আবহের সুযোগ নিয়ে গুপ্ত সমিতিগুলি যাতে শাসককে বিব্রত না করতে পারে, তৎপর ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র। তল্লাশি এবং অভিযান জারি ছিল নিরন্তর। বিপ্লবীদের আশু প্রয়োজন ছিল পর্যাপ্ত পরিমাণে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের, যা ব্যতিরেকে সশস্ত্র বিপ্লবের স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাওয়া অবধারিত।
১৮৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত আত্মোন্নতি সমিতির আখড়া ছিল ওয়েলিংটন স্কোয়ারের উত্তর-পূর্ব কোণে। নেতৃত্বে ছিলেন বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী, অনুকূলচন্দ্র মুখার্জী এবং আরও অনেকে। ১৯১৪-র অগস্টের শুরুতে অনুকূল খবর পেলেন, ২৬ অগস্ট ‘Tactician’ নামের জাহাজে রাষ্ট্রের বরাত দেওয়া প্রচুর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কলকাতায় আসছে। বিখ্যাত অস্ত্র আমদানিকারক কোম্পানি R B Rodda-র ২, ওয়েলেসলি প্লেসের অফিসের পিছন দিকে ভ্যান্সিটার্ট রো-র গুদামে। আমদানির মধ্যে রয়েছে মাউজার পিস্তল আর তার গুলি।
