—যা খেতে চাইছে দাও। খুশি থাকুক, ওকে একটু দরকারও আছে আমাদের।
‘দরকার’ বলতে বাঘা যতীনকে জেলবন্দি করে রাখার ছক। খুনের মামলায় জড়িয়ে ফাঁসিকাঠ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা। সামসুল-হত্যার কিছুদিন আগে হাওড়ায় কয়েকটি দুঃসাহসিক ডাকাতি হয়েছিল। সেই ডাকাতিগুলির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে যতীন গ্রেফতার হয়েছিলেন ১৯১০-এর ২৭ জানুয়ারি, ২৭৫ আপার চিৎপুর রোড থেকে। ললিতকে একই মামলায় পুলিশ গ্রেফতার করে কৃষ্ণনগর থেকে, সুরেশ মজুমদারকে কলকাতা থেকে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪০০ ধারায় মামলা রুজু হয়, যে মামলা ‘Howrah gang case’ নামে খ্যাত। অভিযুক্তদের ঠাঁই হয় হাওড়ার জেলে।
টেগার্ট হীনতম অপকর্ম করলেন সামসুল-নিধন মামলায় বাঘা যতীনকে জড়াতে। বীরেন হাজার জেরাতেও যখন মুখ খুলছেন না কিছুতেই, ইংরেজি খবরের কাগজের একটি পাতা ছাপালেন। এবং কাজটা করলেন এত নিখুঁত এবং বিশ্বাসযোগ্যভাবে, সন্দেহ হওয়ার প্রশ্নই নেই কোনও। সেই পাতায় ফলাও করে খবর ছাপলেন, বাঘা যতীন সামসুল-মামলায় বীরেনের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহে সাহায্য করেছেন। খবরের সঙ্গে যতীনের ছবি। যে পাতাটি পুলিশ বীরেনকে দেখাল ১৯ ফেব্রুয়ারির সাতসকালে, আবেগমিশ্রিত উস্কানি চলল লাগাতার।
—লালবাজারের বড়কর্তাদের সঙ্গে তোদের ‘দাদা’-র যে গোপন দহরম মহরম আছে, সে কথা জানিস? ওর দেখবি কিস্যু হবে না। বড়জোর দু’-এক বছরের জেল। আর তোর? প্রাণটাই চলে যাচ্ছে দু’দিন পরে। একে তোরা গুরু মানিস?
.
মানসিক চাপ একটা পর্যায়ের পর অসহনীয় হয়ে উঠল। বীরেন ভেঙে পড়লেন, ‘বলছি স্যার। পুরোটাই ‘দাদা’-র কথায় করেছি। আমাকে বলেছিল…’
টেগার্ট সহ অফিসাররা ছুটলেন আলিপুর জেলে। হাতে সময় কম, কাল বাদে পরশু বীরেনের ফাঁসি। যুদ্ধকালীন দ্রুততায় বীরেনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ হল। সামসুল হত্যামামলায় নাম ঢুকল বাঘা যতীনের। হাওড়া জেল থেকে যতীনকে তড়িঘড়ি নিয়ে আসা হল আলিপুর জেলে, যেখানে পুলিশের বিশেষ আবেদনে রাতারাতি বসে গেল চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাস।
যতীনের কৌঁসুলি পালটা চাল চাললেন। সাফ জানালেন, তিনি বীরেনকে ‘cross-examine’ করতে অপারগ, কারণ নিজের মক্কেলের সঙ্গে মামলার ব্যাপারে কথা বলার ন্যূনতম সময়টুকুও পাননি।
পুলিশকর্তারা ছুটলেন ছোটলাটের কাছে। বীরেনের ফাঁসির দিন পিছিয়ে দেওয়ার আর্জি নিয়ে। দিনটা সপ্তাহখানেক পিছিয়ে গেলে যতীনের কৌঁসুলির সময়াভাবের যুক্তি আর ধোপে টিকবে না। আর্জি নাকচ হয়ে গেল। ফাঁসির দিন বদলাল না। ২১ ফেব্রুয়ারি হওয়ার কথা, সেদিনই হবে। সেদিনই হয়েছিল।
ব্রিটিশ সরকার তবু শেষ চেষ্টা করেছিল বীরেনের ফাঁসির পরেও। আদালতে পেশ করা হয়েছিল যুক্তি, খোদ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যখন নথিভুক্ত হয়েছে বীরেনের জবানবন্দি, যতীনের কৌঁসুলি বীরেনকে জেরা করতে না পারলেও সেই জবানবন্দি গ্রাহ্য হওয়া উচিত খুনের মামলায়। যে যুক্তি নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন হাইকোর্টের বিচারপতি।
ফাঁসির আগের দিন তীব্র মনোকষ্টে ছিলেন বীরেন। দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি কখনও, ‘দাদা’-র বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিতে হবে। কোথাও কি কোনও ভুল হয়ে গেল?
‘ভুল’ যে হয়েছে, সেটা বীরেনকে সেই রাতেই জানিয়ে দিয়েছিলেন জেলে কর্তব্যরত এক সহৃদয় পুলিশ অফিসার। যাঁর মায়া হয়েছিল বীরেনের উদ্ভ্রান্ত দশা দেখে, যিনি চাননি একটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা মনে পুষে রেখে ফাঁসির মঞ্চে উঠুন যুবক। ইংরেজদের নকল খবরের কাগজ ছাপানোর বিবরণ শুনে তীব্র অনুশোচনা গ্রাস করেছিল বীরেনকে। ওই অফিসারকেই জানিয়েছিলেন কাতর আর্তি, যতীনের কাছে যেন বার্তা পাঠানো হয় তাঁর ক্ষমাভিক্ষার।
সে বার্তা বীরেনের ফাঁসির পর পৌঁছেছিল বাঘা যতীনের কাছে। না পৌঁছলেও চলত অবশ্য। যতীন নিশ্চিত জানতেন, কোনও ভাবে চরম বিভ্রান্ত না হলে বীরেন তাঁর নাম মুখে আনতেনই না।
.
প্রায় একশো আট বছর হয়ে গেল বীরেন দত্তগুপ্তের মৃত্যুর। বাংলার অগ্নিযুগ-বিষয়ক ইতিহাসবিদ বা গবেষকরা জানবেন বীরেনের নাম, কিন্তু আমার-আপনার মতো গড়পড়তা সাধারণেরা? শুনেছি আদৌ বীরেনের নাম, মনে রেখেছি ত্যাগের খতিয়ান?
প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা!
০৪. দ্য গ্রেটেস্ট ডে-লাইট রবারি
—গুলি যে শেষ হয়ে আসছে…
—হুঁ, কতক্ষণ টানা যাবে আর?
—খুব বেশি হলে মিনিট পনেরো… ঘিরে ফেলেছে আমাদের, পালানোর পথ নেই আর।
প্রতিক্রিয়ায় ঝাঁঝিয়ে ওঠেন যুবক, আঘাত-প্রত্যাঘাতের রণভূমিতে যিনি অবিসংবাদিত নেতা।
—পালানোর কথা উঠছে কেন? পালানো নয়, সুযোগ থাকলে ট্যাকটিক্যাল রিট্রিট করা যেত হয়তো…
—রিট্রিটের কথাই বলছি… সে সুযোগও তো দেখছি না…
—শেষ অবধি লড়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
—হ্যাঁ… আরে! সামলে! খেয়াল করো.. ডানদিক থেকে একটা প্ল্যাটুন এগোচ্ছে…
—দেখেছি! ফায়ার!
গুলি এবং পালটা গুলির আওয়াজে নদীতীরবর্তী জঙ্গলের নৈঃশব্দ্য বশ্যতা স্বীকার করেছে তখন।
.
কলেজ স্ট্রিটের নিকটবর্তী মার্কাস স্কোয়ারের পশ্চিম দিকে মাড়োয়ারি হস্টেল। যার একটি অপ্রশস্ত ঘর প্রায় মেক-আপ রুমে পরিণত। চেয়ারে বসে এক যুবক। ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আরেক যুবক। যিনি, প্রায় ঘণ্টাখানেক হয়ে গেল, মগ্ন হয়ে কাঁচি চালাচ্ছেন চেয়ারে আসীন যুবকের চুলে। যিনি ঠায় বসে থাকতে থাকতে সামান্য অধৈর্য এতক্ষণে।
