.
প্রথম চেষ্টা চৌরঙ্গিতে। জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহের শুরুর দিকে। হাইকোর্ট থেকে বেরিয়ে সামসুল অন্য একটি মামলার তদন্ত-তদারকিতে গিয়েছিলেন। পিছু নিয়েছিলেন বীরেন। ভাবেননি, স্থানীয় থানার এত পুলিশ থাকবে ডিএসপি সাহেবের সঙ্গে। গুলি করা তো দূরের কথা, কাছেপিঠে ঘেঁষাই যথেষ্ট কঠিন ছিল। কার্যসিদ্ধি হল না সেদিন।
হল ১৯১০-এর ২৪ জানুয়ারি।
সামসুল সাহেব দুপুরের একটু পরে এসেছেন হাইকোর্টে। নর্টন সাহেবের ঘরে বসেছেন অন্যদিনের মতোই। সঙ্গে এনেছেন একগুচ্ছ ফাইলপত্র, যাতে গচ্ছিত রয়েছে আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। আলোচনা শেষ হল বিকেল পাঁচটা নাগাদ। দেহরক্ষীকে প্রস্তুত হতে বললেন সামসুল।
—বেরব এবার। গাড়ি রেডি আছে তো?
গাড়ি ‘রেডি’ ছিল। ‘রেডি’ ছিলেন বীরেনও। সতীশচন্দ্র সরকারের সঙ্গে দুপুরে কর্নওয়ালিস স্কোয়ারে মিলিত হয়েছেন। হাতবদল হয়েছে লোডেড রিভলভার এবং একটি ছুরি। সতীশ কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন বীরেনকে।
সামসুলের দৈনন্দিন গতিবিধি সপ্তাহদুয়েক খুঁটিয়ে দেখার পর বীরেন ঠিক করে নিয়েছিলেন, মারলে হাইকোর্ট থেকে বেরনোর সময়ই মারবেন। কোর্ট বলে কথা, পুলিশ-টুলিশ থাকবে অনেক। ঝুঁকিও প্রচুর, কিন্তু এ ছাড়া উপায় নেই। বাকি সময় গাড়িতেই যাতায়াত সামসুলের, আর সিআইডি-র অফিসের আনাচেকানাচে ঢের বেশি পুলিশি নজরদারি। যখন বেরবেন কোর্ট থেকে, সেটাই মাহেন্দ্রক্ষণ।
সামসুল বেরলেন সরকারি কৌঁসুলির ঘর থেকে। সামনে হাঁটছেন অ্যাডভোকেট জেনারেল, যিনিও নর্টন সাহেবের ঘরে আলোচনায় যোগ দিয়েছিলেন। পিছনে সশস্ত্র দেহরক্ষী। পূর্ব দিকের সিঁড়িতে প্রথম পা রাখতে যাবেন, সাক্ষাৎ যমদূতের মতো মুখোমুখি হাজির হলেন বীরেন।
অল্পবয়সি আগন্তুকের এভাবে পথ আটকে দাঁড়ানোয় ক্ষণিকের জন্য অপ্রস্তুত সামসুল। দেহরক্ষী ততক্ষণে দেখে ফেলেছেন, যুবক পরনের ফতুয়ার মধ্য থেকে বার করছেন রিভলভার। বাধা দেওয়ার আগেই ‘দ্রাম’! করমর্দনের দূরত্ব থেকে গুলি চালিয়ে দিয়েছেন বীরেন। সামসুলের বক্ষস্থল ভেদ করল বুলেট, শেষ নিশ্বাস ফেলার আগে শুধু অস্ফুটে বলতে পেরেছিলেন, ‘পাকড়ো!’
পাকড়াতে ধাওয়া করল পুলিশ। আদালত চত্বর এবং আশেপাশের এলাকায় তখন ত্রাহি ত্রাহি রব। সামসুলের গুলিবিদ্ধ প্রাণহীন দেহকে ঘিরে যেমন ভিড় জমে গেছে, তেমনই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বাইরে। ‘খুন! খুন!’ চিৎকারে আতঙ্ক গ্রাস করেছে হাইকোর্টের বাইরের রাস্তাকে। যেখানে চকিত ক্ষিপ্রতায় নেমে এসেছেন বীরেন। দৌড়ে পালাচ্ছেন।
কিন্তু ওই জনাকীর্ণ এলাকায় পালাবেন কোথায়? এক অশ্বারোহী পুলিশ তাড়া করল পিছনে, আটকে গেল কোর্ট এবং অফিসফেরত জনতার ভিড়ে। কোনও ভয়ংকর অপরাধ হয়েছে বুঝি, এই ভেবে কিছু পথচারীও তাড়া করলেন বীরেনকে। শূন্যে গুলি ছুড়তে বাধ্য হলেন বীরেন। জনতা পিছু হঠল, পুলিশ নয়। সদলবলে তাড়া করলেন আদালত চত্বরে ডিউটিতে থাকা এক অফিসার। খবর পৌঁছল লালবাজারে, ‘DSP Samsul Alam shot dead in High Court by unknown youth.’ পড়িমরি করে রওনা দিল রিজার্ভে থাকা সশস্ত্র বাহিনী। কতটুকুই বা দূরত্ব হাইকোর্ট থেকে লালবাজারের?
হাইকোর্টের পাশের ওল্ড পোস্ট অফিস স্ট্রিট ধরে ছুটতে ছুটতে যখন বীরেন পৌঁছলেন হেস্টিংস স্ট্রিটে (বর্তমানের কিরণশংকর রায় রোড), দম ফুরিয়ে এসেছে। মাথা কাজ করছে না আর। পিছনে যারা তাড়া করছে, তাদের সঙ্গে ব্যবধান তো কমে এসেছেই, উলটোদিক থেকেও দেখতে পাচ্ছেন কয়েকজন পুলিশকে দৌড়ে আসতে। এবার?
মুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন বীরেন। দ্বিধা কাটিয়ে যখন স্থির করলেন, আত্মহত্যাই শ্রেয়, ততক্ষণে একজন সার্জেন্ট উলটোদিক থেকে প্রায় মুখোমুখি চলে এসেছেন। রিভলভার মাথায় ঠেকানোর আগেই যিনি বীরেনের হাত চেপে ধরলেন। পিছনের পুলিশবাহিনীও ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছে। নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সুযোগ পেলেন না বীরেন। ধরা দিতে হল। রিভলভার, কার্তুজ এবং ছোরা, বাজেয়াপ্ত হল সব।
সামসুল-হত্যার নেপথ্যের চক্রীদের পরিচয় জানতে বিরামহীন নির্যাতন চলল বীরেনের উপর। জিজ্ঞাসাবাদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করলেন সিআইডি এবং স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের পোড়-খাওয়া অফিসাররা। বৃথা চেষ্টা, বীরেন মুখ খুললেন না। বাজিয়ে গেলেন একই কাটা রেকর্ড, ‘ডিএসপি সাহেবের উপর রাগ ছিল, উনি বিপ্লবীদের গ্রেফতার করে অত্যাচার করেন বলে। যা করেছি, একাই করেছি। কারও নির্দেশে নয়। প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম, নিয়েছি।’
অভিযুক্ত দোষ কবুল করে নিয়েছে। জানিয়ে দিয়েছে, আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছুই বলার নেই। বিচারপর্ব সাঙ্গ হল দ্রুত। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনালেন বিচারক, ফাঁসির দিন নির্ধারিত হল ১৯১০-এর ২১ ফেব্রুয়ারি। অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করার পর বিচারক যখন গেলেন মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে, রায় দান বিকেলের জন্য মুলতুবি রেখে, নির্বিকার বীরেন সহাস্য আবদার করে বসলেন কোর্ট লক-আপেই।
—আজ কচুরি-শিঙাড়া খেতে খুব ইচ্ছে করছে, দিন না একটু ব্যবস্থা করে কোর্টের ক্যান্টিন থেকে…
নির্দেশ এল লালবাজার থেকে।
