এই মামলায় পুলিশের তরফে সরকারি কৌঁসুলি মিস্টার নর্টনের ডান হাত ছিলেন সিআইডি-র ডিএসপি সামসুল আলম। অভিজ্ঞ অফিসার, ব্রিটিশ সরকারের চোখের মণি বললেও এতটুকু অত্যুক্তি হয় না। খোদ টেগার্টেরও প্রিয়পাত্র ছিলেন।
কারণও ছিল ব্রিটিশরাজের নেকনজরে পড়ার। শুধু আলিপুর মামলায় নয়, রাষ্ট্রদ্রোহের যে-কোনও মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ঘুঁটি সাজানোয় বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল সামসুল সাহেবের। খারাপ কাজগুলো খুব ভাল করে করতে পারতেন। মিথ্যে সাক্ষী জোগাড় করায় যেমন করিতকর্মা, তেমনই পটু কচিকাঁচাদের মগজধোলাই করে ‘রাজসাক্ষী’ হতে রাজি করানোয়।
আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলা তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’-তে পরিণত হয়েছে তখন। গ্রেফতার হওয়া বিপ্লবীদের শাস্তিবিধানের জন্য প্রবল সক্রিয় লালবাজার।
হাইকোর্টের শুনানিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ আরও ঠাসবুনোট করার কাজ চলছে জোরকদমে। যে কাজের অন্যতম প্রধান কুশীলব ডিএসপি সামসুল। যিনি বুঝে গিয়েছেন, ওই মামলায় সরকারের মুখ রাখতে পারলে কেরিয়ারে উত্তরোত্তর শৃঙ্গ আরোহণ অবধারিত। সারাদিন পড়ে থাকতেন মামলার নথিপত্র নিয়ে। ঘাঁটতেন আইনের বইপত্র, খুঁটিয়ে জরিপ করতেন জবানবন্দি। নর্টন সাহেবের সঙ্গে হাইকোর্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত আলোচনায়।
এহেন পুলিশ অফিসার যে দ্রুত বিপ্লবীদের খতমতালিকায় ঢুকে পড়বেন, স্বাভাবিকই। বিপ্লবীরা জানতেন, সামসুলকে সরিয়ে দেওয়া মানে মামলার খুঁড়িয়ে চলা। এত খেটেখুটে কেসের নথিপত্র তৈরি করার মতো অফিসার কই আর তেমন? ‘সরকারের শ্যাম’ এবং বিপ্লবীদের ‘শূল’ সামসুলকে ‘চোখে সরষে-ফুল’ দেখানোর ছক কষা শুরু হয়ে গেল।
বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বিপ্লবীদের নানা গোষ্ঠীর যে বিবিধ দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডে সে-সময় ব্যতিব্যস্ত ব্রিটিশ প্রশাসন, তার অলিখিত সর্বাধিনায়ক তখন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। অগ্রজদের কাছে ‘যতীন’, অনুজ সহচরদের কাছে ‘দাদা’। এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর কথায় হেলায় জীবন বাজি রাখতে প্রস্তুত তরুণ তুর্কি অনুগামীরা। এবং যাঁকে ছলে-বলে-কৌশলে দীর্ঘ কারাবাসে বাধ্য করতে তুমুল আগ্রাসী পুলিশবাহিনী। স্ট্র্যাটেজি পরিষ্কার, সেনাপতিকে খতম করতে পারলে ভাল, না পারলে অন্তত জেলবন্দি রাখো বহু বছর। নেতৃত্বহীন সৈন্যদল এমনিতেই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে।
সামসুল-হত্যার দায়িত্ব বাঘা যতীন দিলেন তাঁর বিশেষ স্নেহভাজন যুবক বীরেনকে। বীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত। ঢাকার বিক্রমপুরে জন্ম। পাথরে কোঁদা চেহারা। উজ্জ্বল চোখদুটি নজর কাড়ে প্রথম দর্শনেই। কিশোরবেলা থেকেই একাধিক বিপ্লবী গোষ্ঠীর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ, দেশকে স্বাধীন করার ব্রতে উদ্বুদ্ধ হওয়া। বিডন স্ট্রিটের জ্ঞানেন্দ্রনাথ মিত্র ছিলেন যতীনের অত্যন্ত আস্থাভাজন। জ্ঞানেন্দ্রর মাধ্যমেই যতীনের সংস্পর্শে আসেন যুবক বীরেন।
দুর্দমনীয় সাহস ছিল উনিশ ছুঁইছুঁই বীরেনের। ছিল একরোখা আবেগ। বাঘা যতীন যখন সামসুল-নিধনের জন্য তাঁকে বেছে নিলেন, আনন্দে বীরেন প্রায় আত্মহারা। কত শত ছেলে তো ‘দাদা’-র আশেপাশে থাকে, এতজনের মধ্যে তাঁর উপরই দায়িত্ব পড়েছে ওই পাষণ্ড পুলিশ অফিসারকে খুনের, এ তো পরম সৌভাগ্য!
সামসুলের সম্ভাব্য আততায়ী হিসাবে বীরেনকে বেছে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হল নিধন-প্রস্তুতি। খুনের সিদ্ধান্ত নিলেই তো হল না, রূপায়ণের রসায়ন নিখুঁত হওয়া জরুরি। সামসুল শুধু দাপুটে অফিসারই ছিলেন না, বুদ্ধিও ধরতেন যথেষ্ট। জানতেন, বিপ্লবীরা তাঁকে ব্যঙ্গ করে ছড়া বেঁধেছেন, পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগও খুঁজছেন। চলাফেরায় সদাসতর্ক থাকতেন। সঙ্গে সশস্ত্র দেহরক্ষী থাকত। নিজেও সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র রাখতেন অষ্টপ্রহর। বাড়ি থেকে অফিস যেতেন যে রাস্তা দিয়ে, অফিস থেকে বাড়ি ফিরতেন সম্পূর্ণ অন্য রাস্তা দিয়ে। নির্দিষ্ট রুটিন মেনে কিছু করতেন না। না কর্মক্ষেত্রে, না পারিবারিক জীবনে।
বীরেনের ভাল করে চেনা দরকার সামসুলকে, বাঘা যতীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সতীশচন্দ্র সরকারের উপর দায়িত্ব পড়ল। সতীশ সব চিনিয়ে দিলেন বীরেনকে। ডিএসপি সাহেবের বাড়ি-অফিস তো বটেই, আলিপুর কোর্ট এবং হাইকোর্ট চত্বরও, যেখানে ইদানীং নর্টন সাহেবের সঙ্গে দিনের অনেকটা সময় কাটান সামসুল।
চেনা তো হল, কিন্তু অস্ত্রের ব্যবস্থা? যতীন বন্দোবস্ত করলেন। সুরেশচন্দ্র মজুমদার (আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা, ডাকনাম ছিল পরান) পরিচিত ছিলেন যতীনের। তিনি একটি ছ’ঘরার রিভলভার দিয়েছিলেন যতীনকে। আগ্নেয়াস্ত্রটি সুরেশ সরিয়েছিলেন বছর পাঁচেক আগে, ১৯০৫-এর ডিসেম্বরে। পূর্বপরিচিত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রায়বাহাদুর পি সি মৌলিকের হেফাজত থেকে। সুরেশের সঙ্গে যতীনের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন যতীনেরই এক মামা, ললিত চ্যাটার্জী। যিনি ছিলেন পেশায় আইনজীবী এবং আদ্যন্ত দেশপ্রেমিক। ললিতবাবুর আর একটি পরিচয়, সম্পর্কে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দাদু।
১৯১১ সালে সিআইডি-র বড়কর্তা Mr. F C Daly তাঁর রিপোর্টে লিখেছিলেন, ‘The weapon with which the murder was committed belonged to a Deputy Magistrate of Cuttack District, who had lost it when he visited Calcutta and which was stolen by a youth named Suresh Mazumdar@Poran. Poran later made it over to Jatin Mukherjee who had employed Biren Dutta Gupta to commit the deed.’
