এজলাসে উপস্থিত পুলিশ-উকিল-মোক্তারদের হতচকিত মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেন যুবক। কোর্ট লক-আপের ভিতরে দাঁড়িয়ে ফের আর্জি জানান ভালমন্দ খাওয়ার।
—জানি স্যার, নিয়ম নেই। কিন্তু একদিন না হয় একটু নিয়ম ভাঙলেন। অস্ত্রশস্ত্র তো আর চাইছি না, সামান্য কচুরি-শিঙাড়া। আর হ্যাঁ, কয়েকটা রসগোল্লা হলে ভাল হয়। শেষে একটু মিষ্টিমুখ আর কী…
মিষ্টিমুখ? কচুরি-শিঙাড়া? এজলাসে, খুনের আসামিকে? কেউ কখনও শুনেছে? এমন পরিস্থিতিতে কস্মিনকালেও পড়েনি পুলিশ। অফিসাররা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন খানিক। আসামির বিচিত্র দাবির কথা জানিয়ে ফোন গেল লালবাজারে। স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা চার্লস টেগার্টের নির্দেশ পৌঁছল, ‘Fair enough. He will be sent to the gallows anyway in about a month’s time. ফাঁসি তো হবেই ওর। যা খেতে চাইছে, দাও। খুশি থাকুক, ওকে একটু দরকারও আছে আমাদের।’
আদালতে যখন মধ্যাহ্নভোজের বিরতি, প্লেটে করে কচুরি-শিঙাড়া-রসগোল্লা সাজিয়ে দেওয়া হল আসামির সামনে। দিব্যি গুছিয়ে বসলেন যুবক, খেলেন পেটপুরে এবং বিরতির পর ফের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে পড়লেন নিয়মরক্ষার দণ্ডাদেশ শুনতে। নিয়মরক্ষা ছাড়া কী? জানাই তো আছে, কী সাজা ঘোষণা করবেন বিচারক।
.
—একে তোরা গুরু মানিস? এই লোকটাকে?
ইংরেজি খবরের কাগজের একটা পাতা যুবকের চোখের সামনে মেলে ধরেন পুলিশ অফিসার। প্রতিটি শব্দে ঠিকরে বেরোয় বিদ্রুপ।
—কী রে… দ্যাখ ভাল করে… স্বরূপ দ্যাখ লোকটার… আর একে তোরা গুরু মানিস… ‘দাদা’ বলিস… এর এক কথায় তোর মতো ছেলেপুলেরা হাসতে হাসতে প্রাণ দিতে রাজি হয়ে যাস!
জেলের কুঠুরিতে যুবক তখন স্তব্ধবাক্। একদৃষ্টে চেয়ে থাকেন খবরের কাগজের পাতার দিকে। ছবিটার দিকে। অফিসারের কথাগুলো কানে বিঁধতে থাকে তিরের মতো।
—দ্যাখ ছবিটা, পড় খবরটা… কী হল? নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিস না তো?
নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে সত্যিই ভারী ইচ্ছে হয় উনিশ বছরের বিপ্লবীর। এ কী করে সম্ভব? হতেই পারে না! ‘দাদা’ এমন কাজ করতেই পারেন না! কিন্তু খবরটা? ছাপার অক্ষর? সেটাই বা কী করে মিথ্যে হয়? স্পষ্ট লেখা আছে, খুনের মামলায় তার বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহে ‘দাদা’ সাহায্য করেছেন পুলিশকে, জবানবন্দি দিয়েছেন। সঙ্গের ছবিটায় ‘দাদা’র পরিচিত দৃপ্ত চেহারাটা। ভাবনায় ছেদ পড়ে অফিসারের বক্রোক্তিতে।
—আমি তোকে আগেই বলেছিলাম, এই ‘দাদা’-ই তোদের মতো বাচ্চা ছেলেদের সর্বনাশ করছে। আর তোরাও আগুপিছু না ভেবে বোকার মতো ফাঁসিতে ঝোলার জন্য রেডি হয়ে যাচ্ছিস। লালবাজারের বড়কর্তাদের সঙ্গে তোদের ‘দাদা’-র যে গোপনে দহরম মহরম আছে, সে-কথা জানিস? ওর দেখবি কিস্যু হবে না। বড়জোর দু’-এক বছরের জেল। আর তোর? প্রাণটাই চলে যাচ্ছে ক’দিন পরে। ভেবে দ্যাখ, তোর ফাঁসির সাজা তো আর বদলাবে না, কিন্তু তোদের ‘দাদা’ নাটের গুরু হয়েও বারবার পার পেয়ে যাবে আর তোরা ফাঁসবি, এটা মেনে নিবি?
যুবক শুনতে থাকেন দু’হাতে মুখ ঢেকে। অফিসার বলেই চলেন।
—তুই ধরা পড়ার দিন থেকেই জানি আমরা, খুনটা যদিও তুই করেছিস, কিন্তু প্ল্যানটা ‘দাদা’-র। ওর কথাতেই করেছিস যা করার। অথচ শুরুর দিন থেকে তোতাপাখির মতো বলে আসছিস, ‘যা করেছি একাই করেছি, কারও নির্দেশে নয়।’ এখনও সময় আছে, সত্যিটা বল। তুই শাস্তি পেলে ওরও পাওয়া উচিত। লোকটার স্বরূপ তো জেনেই গেলি, এবার অন্তত বল!
যুবক মাথা তোলেন। চোখেমুখে অভিমান-হতাশা-রাগের ত্রিকোণমিতি। ভুল তো কিছু বলছেন না অফিসার। যে ‘দাদা’-র নির্দেশে চোখকান বুজে জান কবুল করা, তিনিই হাত মেলালেন পুলিশের সঙ্গে? তা হলে আর সত্যিটা গোপন করে কী লাভ? মনস্থির করে ফেলেন বেদনাহত যুবক।
—বলছি স্যার। পুরোটাই ‘দাদা’-র কথায় করেছি। আমাকে বলেছিল…
অফিসার বেরিয়ে আসেন কুঠুরি থেকে, উত্তেজনা যথাসম্ভব চেপে রেখে। দ্রুত খবর পাঠান লালবাজারে, ‘Mission accomplished. কনফেস করেছে। আমরা যেমন ভেবেছিলাম, তা-ই। অ্যাকশনটা ছেলেটা করেছে, কিন্তু আসল কলকাঠি নেড়েছে ওদের ‘‘দাদা’’… বাঘা যতীন! ছবি আর খবরটা দেখে ফাইনালি ছোকরা ভেঙে পড়েছে।’
এক মুহূর্তও দেরি করেন না চার্লস টেগার্ট। হাতে সময় কম। সদলবলে রওনা দেন লালবাজার থেকে। গন্তব্য, আলিপুর জেলের সেই কুঠুরি, যেখানে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত এক যুবক কেঁদে চলেছেন অঝোরে।
.
‘তুমি সরকারের শ্যাম আমাদের শূল
(কবে) তোমার ভিটেয় চরবে ঘুঘু
দেখবে চোখে সরষে-ফুল।’
ছড়াটা তখন মুখে মুখে ফিরত বাংলার বিপ্লবীদের। বানানো হয়েছিল সিআইডি-র এক ডাকসাইটে ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশ-কে নিয়ে। সামসুল আলম।
১৯১০ সালের কথা লিখছি। বহুচর্চিত আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলার রায় বেরিয়েছে ১৯০৯-এর ৬ মে। প্রধান অভিযুক্ত অরবিন্দ ঘোষ মুক্তি পেয়েছেন। বারীন ঘোষ এবং উল্লাসকর দত্তের ফাঁসির সাজা হয়েছে। হেমচন্দ্র দাস সহ দশজনের শাস্তি হয়েছে দ্বীপান্তরের। চারজনের সাজা হয়েছে দশ বছরের কারাবাসের। তিনজনের সাত বছর। রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন সাজাপ্রাপ্তরা। সেই আবেদনের শুনানি চলছে তখন।
