—হ্যাঁ, যাদবপুর থানায়। আমরা প্রিন্স গোলাম মহম্মদ শা রোডে থাকি। স্যার, লীনা মিসিং ফর দ্য লাস্ট টু ডেজ়… হাতে মুখ ঢেকে প্রায় কেঁদেই ফেলেন প্রৌঢ়। ফের বেল বাজানোর প্রয়োজন পড়ে নগরপালের। জল আনতে বলেন আরদালিকে।
—মি. সেন, যাদবপুর তো রাজ্য পুলিশের এলাকায়। আপনি চিন্তা করবেন না, আমি দেখছি। কোনও অ্যাক্সিডেন্ট হল কিনা সেটা আগে খোঁজ নেওয়া দরকার। প্লিজ় স্যার, থানা বলছে, মিসিং ডায়েরির এনকোয়ারি চলছে। আমি এখন কী করব, মাথা কাজ করছে না।
—মোবাইল নম্বরটা… মানে আপনার মিসেসের?
—ছিল না। আমরা কেউই মোবাইল ব্যবহার করি না।
চিন্তিত দেখায় নগরপালকে। লালবাজার পিবিএক্স-কে ধরেন ইন্টারকমে।
—ডিসি ডিডি প্লিজ়…
.
কড়েয়া থানার গাড়ি যখন ব্রেক কষল অভিজাত বহুতলের সামনে, ফুটপাথে ছোটখাটো জটলা কৌতূহলী জনতার। নেমে চারপাশে একঝলক তাকান ওসি। জটলাকে ভিড়ে পরিণত হতে দিলে সে ভিড় খুব তাড়াতাড়ি রাস্তায় নেমে আসবে। ট্র্যাফিকের ঘোর সমস্যা হবে। এমনিতেই ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা। অফিসফেরত গাড়ির ঢল নামল বলে। ওয়ারলেসে থানায় নির্দেশ পাঠান বড়বাবু, বাড়তি ফোর্স দরকার এখানে। ক্রাউডকে সরিয়ে দিতে বলুন। কুইকলি!
‘মৈনাক অ্যাপার্টমেন্টস’। পি-১৭ বি, আশুতোষ চৌধুরী অ্যাভিনিউ। বালিগঞ্জ ফাঁড়ি থেকে পার্ক সার্কাসের দিকে কিছুটা হাঁটলেই ডানদিকে চোখে পড়তে বাধ্য এগারো তলার বাড়িটা। ঢোকার মুখেই বড় গেট। এ ধরনের আবাসনে যেমন থাকে। ঢুকেই ছোট একটা ড্রাইভওয়ে। যার শেষে কুড়ি-পঁচিশটা গাড়ি রাখার মতো পার্কিং স্পেস।
‘সিকিউরিটি এনক্লোজার’ রয়েছে একটা। কেয়ারটেকারের বসার ব্যবস্থা সেখানেই। কাচ দিয়ে ঘেরা। ভিতর থেকে স্বচ্ছন্দে দেখা যায় বাইরেটা। কে ঢুকছে, কে বেরচ্ছে, সব। দুটো সিঁড়ি। একটা ব্যবহার হয়ই না প্রায়। তালা বন্ধ থাকে। ওই সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আবাসিকদের বাড়ির কাজের লোকদের ঘর। মূল সিঁড়ির পাশেই দুটো লিফট। লিফটম্যান আছে, তবে চাইলে নিজেরাও অপারেট করতে পারেন আবাসিকরা। ওসি-কে দেখতে পেয়েই শশব্যস্ত লিফটম্যান এগিয়ে আসে, গলায় উত্তেজনার আঁচ, ‘আসুন স্যার, দশতলায়।’
ফ্ল্যাট নম্বর ৯০৬। যার বাইরে অন্তত পনেরো-কুড়ি জনের জটলা-গুঞ্জন-ফিসফাস। লিফট থেকে বেরিয়েই পকেটে হাত চলে যায় ওসি-র। রুমাল বের করতে বাধ্য হন। প্রবল দুর্গন্ধ গ্রাস করেছে চারদিক। এবং গন্ধের উৎসমুখ যে ওই ফ্ল্যাটই, সন্দেহের বিশেষ অবকাশ নেই। ওই গন্ধ পেয়েই ফোন গিয়েছিল থানায়।
গোদরেজের ইয়া বড় তালা ঝুলছে ফ্ল্যাটের দরজায়। ওসি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সামনে উপস্থিত কেয়ারটেকার জানিয়ে দিলেন, ডুপ্লিকেট চাবি নেই। চাবি থাকত ‘দিদিমণির’ কাছেই। তালা ভেঙে ঢোকার পর আবিষ্কৃত হল দিদিমণি-র মৃতদেহ। বহু ডেডবডি দেখার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বড়বাবুও মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে পড়লেন দৃশ্যের বীভৎসতায়।
আঁতকে না ওঠাই আশ্চর্য, গা গুলিয়ে না ওঠাই অস্বাভাবিক। দশ আর এগারো তলা মিলিয়ে ডুপ্লে ফ্ল্যাট। একটা দরজা দশ থেকে এগারোয় যাওয়ার। তালা বন্ধ। দশতলার ফ্ল্যাটটা বেশি বড় নয়, কিন্তু ছিমছাম। বাহুল্য না থাক, পারিপাট্য আছে। একটা শোওয়ার ঘর, ছোট। বসার ঘরে কার্পেট-সেন্টার টেবিল-সোফাসেট, যেমন থাকার। বারান্দা রয়েছে একফালি। রয়েছে বসার ঘরের লাগোয়া বাথরুম এবং রান্নাঘর। অসহনীয় দুর্গন্ধের উৎপত্তি যে ওই রান্নাঘর থেকেই, আবিষ্কৃত হল নিমেষেই। রান্নাঘরের দরজা বাইরে থেকে ভেজানো। ঠেলে খুললেন ওসি, এবং পিছনে দাঁড়ানো এক প্রতিবেশী আবাসিকের মুখ থেকে ছিটকে বেরল আতঙ্কিত আর্তনাদ, ও মাই গড!
এক মহিলা নিস্পন্দ বসে আছেন পা ছড়িয়ে। সম্পূর্ণ বিবস্ত্রা। দেখে মনে হয়, বয়স চল্লিশের কোঠায়। মাথাটা দেওয়ালে ঠেস দেওয়া। হাত দুটো বাঁধা নারকেল দড়ি দিয়ে। মুখে একটা কাপড় গোঁজা। তীব্র পচন ধরেছে দেহে। পোকার থিকথিক-ভনভন সর্বাঙ্গে। চোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে কোটর থেকে। দেহ ফুলে গিয়ে সে এক বীভৎস আকার নিয়েছে। শরীর থেকে বেরিয়ে এসেছে বর্জ্য তরল। রক্তের ধারা জমাট বেঁধেছে মেঝে জুড়ে। দমবন্ধ হয়ে আসার জোগাড়, এতই দাপট দুর্গন্ধের।
প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসা করেন বড়বাবু, কে ইনি? ইনিই থাকতেন এ ফ্ল্যাটে? ঝটিতি উত্তর দেন কেয়ারটেকার, ‘দিদিমণি। লীনা দিদিমণি।’
.
লীনা সেন হত্যা মামলা। কড়েয়া থানা, কেস নম্বর ১৩৬/ তারিখ ০৩.০৭.১৯৯৯। ধারা, ৩০২/২০১ আইপিসি। খুন এবং প্রমাণ লোপাট। বালিগঞ্জের অভিজাত বহুতলে মধ্যবয়সি মহিলার নৃশংস হত্যা এবং পচন-ধরা বিবস্ত্র দেহ উদ্ধার। চাঞ্চল্য উৎপন্ন হওয়ারই কথা। হয়েওছিল। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মিডিয়া, শহরে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘মৈনাক অ্যাপার্টমেন্ট’।
হুলুস্থুল ফেলে দেওয়া খুন। তদন্তের ভার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের হাতে তুলে দিতে সময় নিলেন না নগরপাল। রহস্যভেদের দায়িত্ব পড়ল গোয়েন্দাবিভাগের তৎকালীন সাব-ইনস্পেকটর (বর্তমানে ষষ্ঠ সশস্ত্র ব্যাটালিয়নের ডেপুটি কমিশনার) বৈদ্যনাথ সাহার উপর।
দ্রুত খবর পাঠানো হল FSL (ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি)-এ। তলব করা হল ডগ স্কোয়াডকে। পুলিশ ট্রেনিং স্কুল থেকে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দিল পুলিশ কুকুর। ডিসি ডিডি স্বয়ং খবর পেয়েই ছুটলেন হোমিসাইড বিভাগের অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে। তাঁর আগেই পৌঁছে গিয়েছেন ডিসি সাউথ। শুরু হয়ে গিয়েছে প্রাথমিক তথ্যতালাশ। মৃতার দেহ যখন নীচে নামিয়ে এনে পুলিশ ভ্যানে তোলা হচ্ছে ময়নাতদন্তে পাঠানোর জন্য, রাস্তায় ভিড় জমে গিয়েছে অন্তত শ’দুইয়ের। কড়েয়া থানার ফোর্স হিমশিম খাচ্ছে সামলাতে। বাড়তি ফোর্স রওনা দিয়েছে লালবাজার থেকে।
