ঘটনার ঘনঘটায় ঢোকার আগে জরুরি তথ্য কিছু। এক, এগারো তলাতেও যাওয়া হল তালা ভেঙে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা দুটো তলাই তন্নতন্ন করে পরীক্ষা করে জানিয়ে দিলেন, ‘no external interference into the flat’। বাইরে থেকে ঢুকে কোনরকম জোরজবরদস্তির চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। সংগ্রহযোগ্য এক বা একাধিক হাত বা পায়ের ছাপ পাওয়া যাচ্ছে না ঘরের আসবাবপত্র-বাসনকোসনে। একটা আলমারি ছিল ঘরে। সেটাও অক্ষত, ভাঙার কোনও চেষ্টা হয়নি। খুব মূল্যবান কিছু ছিল না ঘরে আপাতদৃষ্টিতে। আর থাকলেও তা যে আততায়ী বা আততায়ীদের অভীষ্ট ছিল না, স্পষ্ট। ডাকাতি জাতীয় কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কম। কার্পেটে খয়েরি তরলের যে ছোপ দেখা যাচ্ছে দু’-এক জায়গায়, ওটা শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। তবে ‘স্যাম্পল’ সংগ্রহ করলেও ওটা যে রক্তই, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় একশো শতাংশ নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল হবে। পুলিশ কুকুর এল, দেখল এবং ফিরে গেল। ঘ্রাণযোগ্য তেমন কিছু সূত্র অমিল।
দুই, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অজয়কুমার গুপ্তের তত্ত্বাবধানে হওয়া ময়নাতদন্তের রিপোর্ট জানাল, শ্বাসরোধ হয়েই মৃত্যু। মুখ এবং নাক চেপে ধরার চেষ্টা হয়েছিল বলপূর্বক। ড. গুপ্ত লিখলেন, ‘The death in my opinion was due to the effect of asphyxia as a result of gagging ante-mortem and homicidal in nature, there was also attempt of closing mouth and nostrils forcibly.’ যেমনটা ভাবা হয়েছিল।
খুনের আগে যৌন অত্যাচার? হয়নি। স্পষ্ট হয়ে গেল সংগৃহীত ‘vaginal swab’-এর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায়। খুনটা হয়েছিল কখন? বিশেষজ্ঞরা জানালেন, ২৯ জুন দুপুর থেকে সন্ধের মধ্যে। মনে করিয়ে দিই মামলা রুজু হওয়ার তারিখটা, ৩ জুলাই। যেদিন সন্ধে ছুঁইছুঁই বিকেলে লীনার মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়েছিল।
তিন, P.O. (Place of Occurrence) থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া জিনিসের মধ্যে থাকল মৃতার হাত বাঁধার জন্য ব্যবহৃত নারকেল দড়ি, মুখে গোঁজা কাপড়, রান্নাঘরের মেঝে এবং কার্পেটে জমাট বাঁধা খয়েরি দাগের নমুনা, যে তালা ভেঙে ফ্ল্যাটে ঢোকা হয়েছিল, সেটা, আরও কিছু টুকিটাকি। এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, একটি ছোট ডায়েরি। লীনা সেনের।
ডায়েরির বিষয়বস্তুতে পরে আসছি। তার আগে প্রাথমিক পরিচয় করিয়ে দেওয়া দরকার মামলার কেন্দ্রে থাকা চরিত্রদের সঙ্গে।
লীনা সেনের জন্ম পাঁচের দশকের গোড়ায়। খুন হওয়ার সময় বয়স হয়েছিল সাতচল্লিশ। জন্ম লীনা মুখার্জি হিসাবে। সাত বছরের ছোট ভাই বর্তমান। নাম অমিত। লীনা কিশোরীবেলা থেকেই ছিলেন বহির্মুখী প্রকৃতির। অত্যন্ত সপ্রতিভ, সুন্দরী। কনভেন্ট-শিক্ষিতা, অনার্স গ্র্যাজুয়েট। প্রেম করে বিয়ে করলেন দক্ষিণ ভারতীয় যুবক বব শেষাদ্রিকে, বয়স যখন চব্বিশ। বিয়ের বছর দুয়েক আগে থেকেই লীনা চাকরি করতে শুরু করেছিলেন নামকরা বেসরকারি বাণিজ্যিক সংস্থায়। কর্মস্থল বদলেছিলেন ঘনঘন। কোথাও স্টেনোগ্রাফার, কোথাও রিসেপশনিস্ট, কোথাও বা জনসংযোগ আধিকারিক। মৈনাক অ্যাপার্টমেন্ট-এর ডুপ্লে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিলেন বিয়ের কয়েক মাস আগে। বিয়ের পর ওই ফ্ল্যাটেই দাম্পত্য জীবন শুরু হয়েছিল বব-লীনার।
বিবাহজীবন সুখের হয়নি। এক বছরের মধ্যেই ডিভোর্স। দ্বিতীয় বিয়ে প্রায় কুড়ি বছর পরে। ’৯৫-এর অগস্টে। যাঁর সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে, তিনিও বিবাহবিচ্ছিন্ন। প্রদীপকুমার সেন, পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। নামকরা বাণিজ্যিক সংস্থার ডাকসাইটে বড়কর্তা। লীনা ছিলেন প্রদীপের পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। কর্মসূত্রেই গাঢ় হয় ঘনিষ্ঠতা, পরিণতি বিয়েতে। প্রদীপবাবুর ফ্ল্যাট ছিল যাদবপুর থানা এলাকার প্রিন্স গোলাম মহম্মদ শা রোডে, ‘নয়নতারা অ্যাপার্টমেন্ট’-এ। বিয়ের পর সেখানে গিয়ে উঠলেও লীনা ছাড়েননি বালিগঞ্জের ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটটা।
দেহ আবিষ্কৃত হওয়ার পর খবর দেওয়া হল প্রদীপবাবুকে। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর ক্যামাক স্ট্রিটে নিজের ফার্ম খুলেছেন। ছুটে এলেন অফিস থেকে এবং মৃতা লীনাকে দেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। ফ্ল্যাট থেকে যখন সবাইকে বার করে দেওয়া হচ্ছে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য, তখনও সোফা ছেড়ে উঠতে পারছেন না বাক্রুদ্ধ প্রদীপ। দুই পুলিশকর্মী ধরে ধরে নিয়ে গেলেন লিফট পর্যন্ত। ডিসি ডিডি ভদ্রলোককে দেখেই চিনলেন। ইনিই তিনি, যাঁকে পুলিশ কমিশনারের ঘরে দেখেছিলেন দিন দুয়েক আগে। যিনি পয়লা জুলাই লালবাজারে নগরপালের কাছে জানিয়েছিলেন আর্জি, ‘আমার স্ত্রী-কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, হেল্প মি প্লিজ়।’
বৈদ্যনাথ শুরু করলেন তথ্যসংগ্রহের কাজ। দিব্যি বুঝতে পারছিলেন, দ্রুত কিনারা করার চাপ এই মামলায় অবশ্যম্ভাবী। প্রাথমিক জেরায় যে যতটা বললেন, ফিরে দেখা যাক। যতটা বললেন, তার বাইরেও যা যা জানা যাচ্ছিল পুলিশি তদন্তে, সেটাও থাকুক। সামগ্রিক ছবিটা স্পষ্ট হবে।
প্রদীপকুমার সেনের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর যেভাবে এগোল, সারাংশ তুলে দিচ্ছি।
—মি. সেন, যদি কিছু না মনে করেন, এটা তো দ্বিতীয় বিয়ে ছিল। প্রথমটা ভেঙে গেল কেন?
