—বাড়ির লোক জানত, তুই ডাকাতি করে বেড়াচ্ছিস? বাবা? ভাই?
—বাবা পুরোটা জানত না। বড়দাও না। তবে আন্দাজ করত কিছু একটা গোলমালে জড়িয়ে পড়েছি। না হলে হুট করে বাজার-মসজিদ বানানোর এত টাকা পাব কোথায়? তবে সেজোভাই ওয়াহেদ জানত। ওর হাত দিয়ে লাখখানেক টাকা পাঠিয়েছিলাম একবার। বাড়িতে লুকিয়ে রাখতে।
—বাড়িতে কোথায়?
আকুঞ্জি চুপ করে থাকেন মিনিটখানেক। সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত দেখায়। আমিনুলের হুমকিতে সংবিৎ ফেরে।
—শোন, বাড়িতে টাকা থাকুক আর না-ই থাকুক, তুই বলিস আর না-ই বলিস, আমরা আবার যাব ধামাখালিতে। তোকে সঙ্গে নিয়েই যাব। তোর সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এবার পুরো তিনবিঘে জমি খুঁড়ে দেখব। প্রথমবার তো অত সময় হয়নি।
—ধানের পোয়ালের নীচে মাটিতে পুঁতে রাখতে বলেছিলাম ওয়াহেদকে।
‘পোয়াল’ বলতে ধানের স্তূপ। মাটি খুঁড়ে পাওয়াও গেল এক লক্ষ পঁচিশ হাজার, আকুঞ্জির বাড়িতে ফের রেইড করে।
পাঁচটা ঘটনায় মোট লুঠ হয়েছিল আটচল্লিশ লক্ষ আটশো পঁচিশ টাকা। যার মধ্যে উদ্ধার হয়েছিল কুড়ি লক্ষ দশ হাজার পাঁচ টাকা। যার সিংহভাগ কালিন্দীর ফ্ল্যাট থেকে। বাকি টাকার কিছুটা উদ্ধার হয়েছিল আন্দুলের কাছে একটা ফ্ল্যাট থেকে। যেটা ভাড়া নিয়েছিল আকুঞ্জি, যার সন্ধান জানত আবদুল।
টাকার বখরা? আকুঞ্জি বাকিদের বুঝিয়েছিল, তার কাছে লুঠের টাকা থাকাটাই নিরাপদ। তার কাছে অনেক জায়গা আছে লুকিয়ে রাখার। শেষ ডাকাতিটা হয়ে গেলে চূড়ান্ত ভাগবাটোয়ারা হবে। আবদুল এবং অন্যদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিল সাকুল্যে পঞ্চাশ হাজার। এবং নিজে নিয়ম করে টাকা ওড়াচ্ছিল মদ এবং মহিলার পিছনে।
পাঁচটা কেসেই চার্জশিট জমা পড়েছিল যথাসম্ভব দ্রুত। বহুসংখ্যক আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছিল ডাকাতির জায়গাগুলো থেকে। যার কোনও না কোনওটা ম্যাচ করে গিয়েছিল ধৃত ছয় ডাকাতের ফিঙ্গারপ্রিন্টের সঙ্গে। বিচার চলাকালীন ঘটনাগুলোর সময় উপস্থিত একাধিক সাক্ষী সংশয়াতীত ভাবে ধৃতদের চিহ্নিত করেছিলেন Test Identification Parade-এ। আর বাজেয়াপ্ত টাকার বান্ডিলে ব্যাংকের স্লিপ তো ছিলই। আদালতে বিচারকের কাছে স্বীকারোক্তিও দিয়েছিল আবদুল হাই, সমস্ত কিছু কবুল করে। আকুঞ্জি পরিবারের সেজোছেলে ওয়াহেদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল অপরাধীর অপরাধমূলক কাজের কথা জেনেও তা গোপন করার অভিযোগ (harbouring a criminal)।
আকুঞ্জি এবং অন্য পাঁচ ডাকাতের দোষী সাব্যস্ত হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা ছিল। যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা ঘোষিত হয়েছিল দু’বছরের মধ্যেই। ওয়াহেদের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল দশ বছরের কারাবাস।
কাহিনি এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু ‘পুনশ্চ’ এখনও বাকি। আকুঞ্জি পালানোর চেষ্টা করেছিল বিচার চলাকালীন। আলিপুর কোর্টে পুলিশের হাত ছাড়িয়ে মরিয়া দৌড় দিয়েছিল একদিন। একশো মিটার ধাওয়া করে ফিলমি কায়দায় ধরে ফেলেছিলেন এক শক্তসমর্থ কনস্টেবল।
সবে তিরিশ পেরনো আকুঞ্জি তীব্র অবসাদে ভুগতে শুরু করেছিল জেলে। কথা বলত না কারও সঙ্গে। খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিল বললেই চলে। পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল নীরোগ শরীরে। জেলযাপনে একের পর এক ব্যাধি বাসা বেঁধেছিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। আকুঞ্জি মারা গিয়েছিল সাজার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই।
প্রবাদের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না কখনও কখনও। লোভে পাপ। আর পাপে যা হওয়ার, তা- ই।
২.০৪ শরীর, শুধু শরীর?
[লীনা সেন হত্যা
বৈদ্যনাথ সাহা, উপনগরপাল, ষষ্ঠ সশস্ত্র বাহিনী। ২০১৩ সালে ভারত সরকারের ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল’-এ সম্মানিত।]
প্রদীপকুমার সেন। ভিজিটর্স স্লিপে নামটা দেখে সামান্য ভুরু কুঁচকে যায় নগরপালের। চেনেন দর্শনপ্রার্থীকে। সামাজিক জমায়েতে দেখা হয়েছে একাধিকবার। সখ্য নেই তেমন। হঠাৎ দেখায় ‘হাই-হ্যালো’ আছে। হতে পারে কোনও ব্যক্তিগত দরকারে এসেছেন বা কোনও অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ জানাতে। কিন্তু স্লিপে ‘Purpose of visit’-এর জায়গায় ‘Most urgent and confidential’ লেখা কেন? হঠাৎ লালবাজারে, সকাল দশটা বাজতে না বাজতেই? স্লিপটা হাতে রেখেই বেল বাজান পুলিশ কমিশনার।
—কল হিম ইন।
বিধ্বস্ত চেহারাটা যখন ঘরে ঢুকছে, একটু অবাকই হন নগরপাল। দেখলে বোঝা যায়, কাঁচাপাকা চুলের প্রৌঢ় ষাটের চৌকাঠ পেরিয়ে গেছেন। সুঠাম চেহারা হয়তো নয়, কিন্তু স্বাস্থ্যবান। লম্বায় নিশ্চিতভাবে ছ’ফুটের উপর। টাক পড়েছে সামান্য। চেহারায় একটা জেল্লা আছে। তবে আজ চলনেবলনে ছিটেফোঁটাও নেই চাকচিক্যের। যেন এক ধাক্কায় ভদ্রলোকের বয়স বেড়ে গেছে বছর দশেক। চোখ লাল। ঘুম সঙ্গ ত্যাগ করলে যেমন হয়, তেমন।
—কী ব্যাপার মি. সেন, হোয়াট ব্রিংস ইউ হিয়ার? অল ওয়েল?
নগরপালের প্রশ্নের উত্তরে বিন্দুমাত্র ভূমিকা করেন না প্রৌঢ়। সোজাসুজি পয়েন্টে আসেন, গলায় ঝরে পড়ে অসহায় আর্তি।
—স্যার, প্লিজ় হেল্প মি। মাই ওয়াইফ ইজ় মিসিং…
—মানে?
—ইয়েস স্যার, আমার স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না দু’দিন হল। বাড়ি থেকে পরশু বেরিয়েছিল। আর ফেরেনি।
—দাঁড়ান দাঁড়ান, ফেরেননি মানে? আপনারা থাকেন কোথায়? মিসিং ডায়েরি করেছেন?
