আকুঞ্জির সঙ্গের যুবকের নাম মনোজ সিং। যাকে লালবাজারে এনে শুরু হল জিজ্ঞাসাবাদ। সব কিছু স্বীকার করা ছাড়া উপায় ছিল না ট্যাংরার দেবেন্দ্র চন্দ্র রোডের বাসিন্দা মনোজের। দ্রুত জানিয়ে দিল ডাকাতদলের বাকিদের নাম। ভোরেই বেরিয়ে পড়া হল রেইডে। সমর রায় ওরফে কালু গ্রেফতার হল ট্যাংরা থেকেই। কড়েয়ার একটা ভাড়াবাড়ি থেকে তোলা হল আরেক ডাকাত দীনেশ দাসকে। এন্টালির বিবিবাগানের গোপন ডেরায় হানা দিয়ে গ্রেফতার করা হল সরওয়ার খানকে। মনোজ-দীনেশ-সমর-সরওয়ার, সবারই বয়স পঁচিশ থেকে তিরিশের মধ্যে।
সমর-দীনেশরা জানত ঘটকপুকুরের কাছে আবদুল হাই গায়েনের সম্ভাব্য আস্তানার কথা। টিম পাঠিয়ে ডাকাতদলের একমাত্র ‘hefty and bulky’ সদস্যকে পাকড়াও করতে সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। হলও না। আকুঞ্জি-মনোজ-আবদুল-সরওয়ার-দীনেশ-সমর, পুরো গ্যাং শেষ পর্যন্ত কব্জায়। প্রথম ডাকাতির প্রায় ছ’মাস পরে।
কোথায় কখন ডাকাতি করা হবে, প্ল্যান করত দু’জন। আকুঞ্জিই ছিল দলের মাথা। সংলাপ-চিত্রনাট্য-পরিচালনা তারই। মুখ্য পরামর্শদাতা ছিল আবদুল, যার সঙ্গে আকুঞ্জির আলাপ বেশ কয়েক বছর আগে। আবদুলের আর্থিক টানাটানির সময় আকুঞ্জি টাকাপয়সা দিয়ে বিস্তর সাহায্য করেছিল। সেই থেকেই আবদুল আপাদমস্তক অনুগত আকুঞ্জির প্রতি।
পঁয়ত্রিশ বছরের আবদুল কলকাতার রাস্তাঘাট, অলিগলি চিনত হাতের তালুর মতো। প্রায় পাঁচ বছর বড়বাজারের একটা চাল ব্যবসায়ীর কাছে কাজ করেছে। লরি চালিয়ে চাল নিয়ে গেছে শহরের এ-মাথা থেকে ও-মাথা। কোথায় কখন কীভাবে হানা দিলে দ্রুত কাজ হাসিল হবে আর পালানোও যাবে নিরাপদে, আবদুলই বুদ্ধি দিত আকুঞ্জিকে। এবং আবদুলই পুরনো পরিচয়ের সূত্রে জুটিয়েছিল টিমের বাকি চারজনকে। মনোজ-সমর ট্যাংরায় একই পাড়ার বাসিন্দা। কাঠবেকার দু’জনেই। দীনেশ এবং সরওয়ারেরও কাজকর্ম বিশেষ কিছু ছিল না। পাড়ায় খুচরো দাদাগিরির ইতিহাস ছিল কিছু।
যেখানে যেখানে ডাকাতি হয়েছিল, সেখানে তার আগের রাতে পুরো টিমকে নিয়ে হাজির হত আকুঞ্জি। জায়গাটা আরও আগে থেকে দেখে রাখত আবদুল। ডাকাতির পর যে রাস্তা দিয়ে চম্পট দিতে হবে, সেই রাস্তা দিয়ে এরা ‘ট্রায়াল রান’ দিত গভীর রাতে। পরের দিন যাতে কোনও বিভ্রান্তি না থাকে, পান থেকে যাতে চুন না খসে।
যে মোটরসাইকেলগুলো ব্যবহার হয়েছিল ডাকাতিতে, সবক’টাই চোরাই। জোগাড় করেছিল আবদুলই। ট্যাংরার ডাকাতিতে ব্যবহৃত হয়েছিল যে মারুতি গাড়ি, সেটাও চোরাই গাড়িই। খোঁজ মিলল না গাড়িগুলোর। আকুঞ্জিরই পরামর্শমতো মোটরসাইকেল দুটো আবদুল ধাপার মাঠের কাছে ফেলে দিয়ে এসেছিল পাঁচ নম্বর ডাকাতির পর। সেগুলো খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। পাওয়া গেলও না।
মারুতি গাড়িটা? বসিরহাটের টাকির বাসিন্দা এক পরিচিতের কাছ থেকে কয়েকদিনের জন্য গাড়িটা ধার নিয়েছিল আবদুল। যাওয়া হল সেই পরিচিতের বাড়ি। তালাচাবি বন্ধ করে মাসখানেক আগে বাড়ির বাসিন্দারা অন্য কোথাও চলে গিয়েছেন।
আহত সাব-ইনস্পেকটর মনোজ সুস্থ হয়ে উঠলেন ক্রমশ। মাসখানেক পরে পুলিশি প্রহরায় চিকিৎসাধীন আকুঞ্জিও সুস্থ হয়ে উঠল। লালবাজারে জেরার মুখোমুখি হয়ে আকুঞ্জি প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর দিল সোজাসাপটা। বুঝে গিয়েছিল, ‘গেম ওভার’। কিছু লুকিয়ে আর লাভ নেই। বাকিরা সবটা বলে দিয়েছে। মিথ্যে বললে দুর্ভোগই বাড়বে। পুলিশ বিশ্বরূপ দেখিয়ে ছাড়বে।
—এত জমিজমা, মাছের এমন রমরমা ব্যবসা, নতুন গ্যাং তৈরি করে ডাকাতির প্ল্যান কী করে মাথায় এল? আর কেনই বা এল?
জবাবে আকুঞ্জি কোনও রাখঢাক করল না।
—ফ্যামিলি বিজ়নেসেই থাকলে যেমন চলছিল, তেমনই চলত স্যার। আমার আরও আরও অনেক বেশি বড়লোক হওয়ার ইচ্ছে হত। বিরাট দামি গাড়ি হবে। কলকাতায় বড় বাড়ি হবে। বিদেশে বেড়াতে যাওয়া হবে। সুন্দরী মেয়েরা ঘিরে থাকবে। অনেক টাকার স্বপ্ন দেখতাম।
—সুতরাং ব্যাংকলুঠ করা যাক, ঠিক করে ফেললি?
—ওটাই দেখলাম বেস্ট উপায় স্যার। আমার টার্গেট ছিল তিন-চার মাসে এক কোটি টাকা। বাবা আর ভাইদের সঙ্গে শুধু মাছের ব্যবসা করলে কোনওদিনই আর বেশি বড়লোক হওয়া যেত না।
—পাঁচটা মিলিয়ে তো লাখ পঞ্চাশেক মতো হয়েছিল। টার্গেটের মাত্র অর্ধেক…
—আর একটা বড় কাজ করে থেমে যেতাম স্যার।
গোয়েন্দাদের নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি হল। আরও একটা?
—সেটা কোথায়?
—মেট্রোর টাকা স্যার।
—কোন মেট্রো?
—বউবাজার মোড়ের কাছে একটা স্টেশন আছে না? নামটা ভুলে যাচ্ছি…
—সেন্ট্রাল?
—হ্যাঁ স্যার, সেন্ট্রাল… ওই স্টেশনের কাছে মাটির তলায় মেট্রোর অনেক টাকা রাখা হয় বলে খবর পেয়েছিলাম। ওই কাজটায় একবারে তিরিশ-চল্লিশ তো হতই।
ফের একে অন্যের দিকে তাকান অফিসাররা। সত্যিই আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাশস্টোর আছে একটা সেন্ট্রাল স্টেশনের প্রায় লাগোয়াই। অনেক টাকা থাকে। পুলিশের বন্দুকধারী থাকে পাহারায়। মেট্রো কর্তৃপক্ষের নিজস্ব গার্ডও থাকে। ছ’নম্বর ডাকাতিটা ওখানে হতে যাচ্ছিল?
—তা করলি না কেন কাজটা?
—আপনারা তো খুব দৌড়ঝাঁপ করছিলেন স্যার… তাই কিছুদিন চুপচাপ থেকে মামলা ঠান্ডা হওয়ার পর করব ভেবেছিলাম। লেকটাউনের যে ফ্ল্যাটটা ভাড়া নিয়েছিলাম আটমাস আগে, ওখানেই থাকতাম ম্যাক্সিমাম টাইম।
