‘তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত
তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত..’
গানের মাঝেই ম্যানেজারের কানে ইন্দ্রনীলের ফিসফিস। গান শেষ হওয়ার পরই তরুণীর শশব্যস্ত বেরিয়ে আসা বারের বাইরে।
—আপনাকে একবার আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।
—যেতে হবে মানে? কোথা থেকে আসছেন আপনারা?
—লালবাজার।
ড্রেস চেঞ্জ করতে যতটুকু সময়। সাদা টাটা সুমো গাড়িতে উঠে বসলেন তরুণী। টাটা সুমো স্টার্ট দিল। গন্তব্য লালবাজার।
পানশালার মেহফিলে তখন যুবতীর জায়গা নিয়েছে এক যুবক। শুরু হয়েছে নতুন গান। শাহরুখ খানের সিনেমার।
‘ইয়ে কালি কালি আঁখে
ইয়ে গোরে গোরে গাল…’
.
একটা মাঝারি মাপের ঘরে সাত-আটজন মিলে জেরা করতে শুরু করলেন যুবতীকে। এবং মিনিট পাঁচেকের বেশি নার্ভ ধরে রাখতে পারলেন না যুবতী। ওঁর আসল নামটা বদলে দেওয়া যাক। ধরা যাক, জয়শ্রী। স্বীকার করে নিলেন আকুঞ্জির সঙ্গে গড়ে ওঠা মাসদুয়েকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সম্পর্কের কী-কেন-কখন নিয়ে বিশেষ কৌতূহল ছিল না অফিসারদের। জানার ছিল একটা কথাই। কলকাতায় আকুঞ্জি থাকে কোথায়? উত্তর দেবেন কী, প্রশ্ন শোনামাত্রই হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন জয়শ্রী।
—স্যার, জানতে পারলে ও মেরে ফেলবে আমাকে। সবসময় সঙ্গে রিভলভার থাকে ওর। সংসারটা আমাকে একা চালাতে হয়। মাসে মাসে চার হাজার করে টাকা দিত আমায়। সেই লোভে পড়ে… প্লিজ় স্যার, ও আমায় মেরে ফেলবে জানতে পারলে…
অফিসাররা নানাভাবে আশ্বস্ত করেন জয়শ্রীকে।
—কেউ জানবে না আপনার নাম। কেস ডায়েরিতে কোথাও থাকবে না। কোর্টে যেতে হবে না। কিস্যু করতে হবে না। কথা দিচ্ছি আমরা। বারের ম্যানেজারকে বলে দেব আমরা। আপনি শুধু জায়গাটা দেখিয়ে দেবেন, ব্যস। বললে আপনারই সুবিধে, ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন। না বললেই বরং ফাঁসবেন।
আধঘণ্টা পর ধাতস্থ হলেন জয়শ্রী। যতটুকু জানতেন, বললেন। রাত আড়াইটে নাগাদ জয়শ্রীকে সঙ্গে নিয়ে চারটে অ্যামবাসাডর গাড়ি বেরল লালবাজার থেকে। প্রথম দুটো গাড়িতে জয়শ্রীকে বাদ দিয়ে আরোহীর সংখ্যা আট। প্রত্যেকে সাদা পোশাকে। কোমরে গোঁজা .৩২ রিভলভার। লোডেড। সঙ্গে একটা ব্যাগ। যাতে রইল শাবল-গাঁইতি।
তিন নম্বর গাড়িতে দু’জন মহিলা কনস্টেবল এবং একজন অফিসার। চতুর্থ গাড়িতে চার উর্দিধারী, বন্দুকসহ।
রবীন্দ্র সরণি-পোদ্দার কোর্ট-চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ-গিরিশ পার্ক-বিবেকানন্দ রোড-কাঁকুড়গাছি-উলটোডাঙা হয়ে চারটে গাড়ির প্রথম দুটো ঢুকে পড়ল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এলাকায়। কিছুটা এগিয়ে বাঁক নিল বাঁ দিকে। তিন আর চার নম্বর গাড়ি থেকে গেল উলটোডাঙা মোড়ে।
প্রথম দুটো গাড়িও থামল একটু পরেই। লেকটাউনের কালিন্দী হাউসিং প্রোজেক্ট থেকে একটু দূরে। একতলায় একটা ফ্ল্যাটের সামনে অফিসারদের নিয়ে গেলেন জয়শ্রী। ওঁর কাজ শেষ। পৌঁছে দেওয়া হল উলটোডাঙায়। যেখানে অপেক্ষমাণ তিন নম্বর গাড়িতে করে দু’জন অফিসার এবং একজন মহিলা কনস্টেবল জয়শ্রীকে নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন হাতিবাগানের বাড়িতে পৌঁছে দিতে।
দরজার দু’দিকে ভাগ হয়ে গেলেন অফিসাররা। পাঁচ তদন্তকারী ছাড়াও দলে ছিলেন সাব-ইনস্পেকটর মনোজ দাস এবং আরও দুই অফিসার। তাগড়াই চেহারার মনোজ (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডেপুটেশনে ডিএসপি হিসাবে কর্মরত) কলকাতা পুলিশে ডাকাবুকো অফিসার বলে পরিচিত ছিলেন।
প্রথমবারের কড়া নাড়ায় কোনও আওয়াজ নেই ঘরের ভিতর থেকে। দ্বিতীয়বারে ছিটকে এল মরিয়া উত্তর,— ‘পুলিশ হোক আর যেই হোক, ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করলেই গুলি করব।’
লাথি মেরে দরজা ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে ছিটকে এল গুলি। লাগল মনোজের কাঁধে। অবিরাম রক্তপাত, ক্ষতস্থানে হাত চেপে মাটিতে বসে পড়লেন মনোজ। এবং ঘরের ভিতর থেকে দ্বিতীয় গুলি চলার আগেই পালটা গুলি চালালেন এক অফিসার। আকুঞ্জির কোমরের নীচে, ডান ঊরুর কাছে গুলি লাগল। এ-ই যে আকুঞ্জি, এক পলকের দেখাতেই বুঝলেন গোয়েন্দারা। আঁকানো ছবির সঙ্গে যথেষ্টরও বেশি মিল।
আকুঞ্জি একা ছিল না ফ্ল্যাটে। সঙ্গে ছিল আরেকজন। দু’জনের উপরই নিমেষে ঝাঁপালেন গোয়েন্দারা। কেড়ে নেওয়া হল আকুঞ্জির রিভলভার। অন্য লোকটিকে ধরাশায়ী করতেও লাগল খুব বেশি হলে পনেরো সেকেন্ড। ওয়াকিটকিতে ততক্ষণে খবর পাঠিয়ে দিয়েছেন এক অফিসার, ‘মুভ টু কালিন্দী অ্যাট ওয়ান্স। কুইক!’ উলটোডাঙার মোড় থেকে চতুর্থ গাড়ি তখন তিরবেগে ছুটেছে লেকটাউনের দিকে।
গুলিগোলার আওয়াজে তখন ঘুম ভেঙে গেছে আশেপাশের বাসিন্দাদের। আতঙ্কে অনেকে বেরিয়ে এসেছেন রাস্তায়। এবং বিস্ফারিত চোখে দেখছেন, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক অফিসারকে ধরাধরি করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলছেন সতীর্থরা। দুই যুবককে একতলার ফ্ল্যাট থেকে টেনে বার করে আনছে পুলিশ। একজনের কোমরে দড়ি। আর একজন রক্তাক্ত। তাকেও তোলা হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্সে। আরে, এ তো চেনা মুখ। ভদ্র, নম্র ব্যবহার। মাসছয়েক হল এখানে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। প্রোমোটারি করে বলেই জানে পাড়ার লোক। এ? এ ব্যাংক-ডাকাতির পান্ডা!
আহত মনোজ এবং ওয়াজেদ আকুঞ্জিকে নিয়ে যাওয়া হল আর জি কর হাসপাতালে। কালিন্দীর ফ্ল্যাট তল্লাশি করে পাওয়া গেল দুই আলমারি ভরতি টাকা। থরে থরে সাজানো, বিভিন্ন ব্যাংকের স্লিপ লাগানো টাকার বান্ডিল।
