মেজোভাই ওয়াজেদ কোথায়? দুই ভাইয়ের একই উত্তর কাটা রেকর্ডকেও লজ্জা দিয়ে, ‘বিশ্বাস করুন, জানি না।’ গ্রেফতারির প্রশ্ন আসে অপরাধের সঙ্গে নির্দিষ্ট যোগসূত্র বা প্রমাণ পাওয়া গেলে তবেই। পাওয়া গেল না, এবং ছেড়ে দিতে হল দুই ভাইকে। সোর্সদের বলা হল গতিবিধির উপর নজর রাখতে।
নজরদারির ব্যাপারে একটা জরুরি সিদ্ধান্ত নিলেন গোয়েন্দাপ্রধান। হাওড়া-হুগলি-উত্তর ২৪ পরগনায় যে অফিসাররা ঘাঁটি গেড়েছিলেন সোর্সসহ, তাদের সবাইকে বলা হল দক্ষিণ ২৪ পরগনায় চলে আসতে। বামনঘাটা-ভোজেরহাট-ঘটকপুকুর-মিনাখাঁ-মালঞ্চ হয়ে ধামাখালি পর্যন্ত, সর্বত্র ছড়িয়ে গেলেন অফিসাররা। বৃত্তটা ছোট হয়ে এল অনেক। এলাকায় পাকাপাকি নোঙর ফেলে খবর জোগাড়ের চেষ্টা শুরু করল সোর্সরা। ওয়াজেদ আকুঞ্জি কোথায়?
খবর এল। দ্রুতই এল। ওয়াজেদ আকুঞ্জিকে সপ্তাহখানেক আগে দেখা গেছে ঘটকপুকুর এলাকায়। হাইওয়ের ধারে একটা চায়ের দোকানে সন্ধেবেলা এসেছিল মিনিট দশেকের জন্য। একজন লোকের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে গেছে মোটরসাইকেলে করে। দোকানির সঙ্গে কথা বললেন গোয়েন্দারা।
—লোকটা কার সঙ্গে কথা বলছিল চায়ের দোকানে?
—একটা বেঁটে মতো লোক, মোটাসোটা।
এই সেই ‘দুয়ে দুয়ে চার’-এর মুহূর্ত! বেঁটে মতো লোক? মোটাসোটা? Hefty and bulky? যেমনটা এফআইআর-এ লিখেছিলেন ফেডারাল ব্যাংকের ম্যানেজার রামচন্দ্রন? ঠিক যেমন চেহারার লোকের বিবরণ পাওয়া গেছে পাঁচটা ঘটনাতেই?
—চেনেন ওই বেঁটে লোকটাকে?
—এক-দু’বার এসেছে আমার এখানে চা খেতে। মুখ চিনি। নাম জানি না।
—হুঁ… বেঁটে লোকটা যার সঙ্গে কথা বলছিল, সে একা এসেছিল?
—না স্যার, সঙ্গে একটা মেয়ে ছিল।
—মেয়ে?
—হ্যাঁ স্যার, কুড়ি-বাইশ বছর বয়স হবে। খুব ফরসা। লম্বা। দারুণ দেখতে।
—মেয়েটিকে আগে এলাকায় দেখেছেন কখনও?
—না স্যার… আমি বরং লোকটা মেয়েটাকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে বেরিয়ে যাওয়ার পর ওই বেঁটে মোটা লোকটাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, একে তো আগে দেখিনি কখনও এদিকে?
—কী বলেছিল?
—বলেছিল, মেয়েটা নাকি নাচে। কলকাতায়।
পরের চব্বিশ ঘণ্টায় ঘটকপুকুর এবং সংলগ্ন এলাকার গ্রামগুলো সাদা পোশাকের পুলিশ এবং সোর্সরা চষে ফেলল। এবং জানা গেল ‘hefty and bulky’ লোকটির পরিচয়। আবদুল হাই গায়েন। বড়ালি গ্রামের বাসিন্দা। ইটভাটার মালিক। কলকাতায় চালের ব্যবসা করত একসময়। লরি চালাতে পারে। এলাকায় যথেষ্ট দাপট। ইটভাটার লরি পার্ক করা নিয়ে সম্প্রতি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। হাতাহাতিও। আবদুল হাই নাকি শূন্যে গুলি চালিয়েছিল ঝামেলার সময়। বছর দুয়েক আগে চুরি-ছিনতাই জাতীয় কেসে নাকি একবার পুলিশে ধরাও পড়েছিল। ইদানীং বাড়িতে থাকছে না।
সন্দেহের-দ্বিধার-সংশয়ের আর জায়গা ছিল না। ছয় ডাকাতের দু’জন নিশ্চিতভাবে আকুঞ্জি এবং আবদুল হাই। এদের ধরতে পারলেই বাকি চারের হদিশ মিলবে।
কীভাবে ধরা হবে? হাতের কাছে তথ্য বলতে, আকুঞ্জিকে একটি মেয়ের সঙ্গে দেখা গেছে। কলকাতায় নাচে। কোথায় নাচে? নিশ্চয়ই পানশালায়, কোনও বারে।
কলকাতার বারে নাচে, এমন একটা মেয়েকে খুঁজে বার করতে হবে। লম্বা-ফরসা-সুন্দরী। যার সঙ্গে ধামাখালির এক যুবকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়েছে ইদানীং। এটুকু না পারলে আর কীসের লালবাজার? কীসের আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সঙ্গে তুলনা?
দু’জন সোর্সকে চিহ্নিত করা হল। যাদের নিয়মিত যাতায়াত আছে কলকাতার সেইসব পানশালায়, যেখানে গানের পাশাপাশি টুকটাক নাচও হয়। বলে দেওয়া হল, ‘সন্ধে থেকে বারগুলোতেই কাটাও। যা খরচা হবে, আমরা দেব।’
দিনতিনেকের মধ্যেই খবর নিয়ে হাজির হল সোর্স। আসল নামটা লিখলাম না। নাম ধরা যাক আশিস। নিখরচায় সন্ধে থেকে ‘জলপথে’ থাকার সুযোগ পেয়ে যে জানপ্রাণ লাগিয়ে দিয়েছিল মেয়েটিকে খুঁজে বার করতে।
—স্যার। ইলিয়ট রোডের কাছে বারটা। মেয়েটা হাতিবাগানের।
—কী করে বুঝলি, এই মেয়েটাই?
অঙ্কে এমএসসি করা লোককে যদি জিজ্ঞেস করেন এ প্লাস বি হোল স্কোয়ারের ফরমুলা? কী প্রতিক্রিয়া হবে? অনুকম্পার হাসিই তো! অবিকল সেই হাসি হাসলেন আশিস।
—কী যে বলেন স্যার! এটা বোঝা কোনও ব্যাপার হল? বারে নাচে, ফরসা-লম্বা আর সুন্দর দেখতে, এমন পাঁচটা মেয়ের খোঁজ পেলাম গত দু’দিনে। লোক ফিট করলাম পাঁচজনের পিছনে। এই হাতিবাগানের মেয়েটা কিছুদিন হল ট্যাক্সি করে বারে আসছে। আগে বাসে করে আসত। গলায় মাসখানেক হল সোনার নেকলেস পরছে। হেব্বি দামি ঘড়ি পরছে।
—আর?
—গত শনিবার একটা গাড়ি এসে বারের বাইরে অপেক্ষা করছিল। নাচ শেষ হওয়ার পর সেই গাড়িতে করে মেয়েটা বেরিয়ে গেছে। একটা ছেলে গাড়িটা চালাচ্ছিল। ছেলেটার ব্যাপারে তেমন কেউ বলতে পারছে না। তবে মেয়েটার চালচলন ইদানীং বদলে গেছে। হাতে মালকড়ি এসেছে হঠাৎ। আমি হাতিবাগানেও খোঁজ নিয়েছি। বাড়ির অবস্থা ভাল নয় তেমন টাকাপয়সার দিক দিয়ে। আপনি মিলিয়ে নেবেন স্যার, একেই খুঁজছেন। এই মেয়েটাই!
.
শেষ-জানুয়ারির শনিবারের রাত। লালবাজার থেকে প্লেন ড্রেসে রওনা দিলেন গোয়েন্দারা। ইলিয়ট রোডের বারের বাইরে অপেক্ষায় রইলেন বিমল-আমিনুল-রাম-তপনরা। সঙ্গে দুই মহিলা কনস্টেবল। ভিতরে ঢুকলেন রিমলেস চশমা পরিহিত ইন্দ্রনীল। বার তখন মাতোয়ারা। হিট হিন্দি গানের সঙ্গে কোমর দোলাচ্ছেন এক সুন্দরী। লম্বা এবং ফরসা।
