দু’-তিনবার এলাকায় দেখেছেন ওয়াজেদকে।
পাঁচটা ডাকাতিতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী আঁকা ছয় ডাকাতের ছবি দেখানো হল স্থানীয় কয়েকজনকে। একটা ছবিকে প্রায় সবাই চিহ্নিত করলেন, ‘আরে! এ তো একদম ওয়াজেদ ভাইয়ের মতো দেখতে।’
ছবি দেখে লোকে চিনছে। হঠাৎ টাকা খরচ হচ্ছে জলের মতো। পরিবারের তরফে রাতারাতি এলাকায় তৈরি হচ্ছে মসজিদ। গড়ে উঠছে বাজার। কলকাতায় মেজোছেলে ওয়াজেদ পুরো মাসটাই কাটাচ্ছে। দেখাই যাচ্ছে না এলাকায়। এই পরিস্থিতিতে লালমোহনবাবু হলে যা বলতেন, সেটাই মাথায় ঘুরছিল গোয়েন্দাদের। ‘হাইলি সাসপিশাস!’
সব দিক বিচার করে একটাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ছিল। আকুঞ্জিদের বাড়িতে ‘রেইড’ করার।
.
প্রায় তিন বিঘে জমির উপর বাড়ি। বাড়ি তো নয়, যেন দুর্গ। দশ-বারো ফুট উঁচু পাঁচিল। ঢোকার গেট একটাই। পুরো বাড়িটা ঘিরে ফেলতে পঞ্চাশ-ষাট জন লোকের দরকার ন্যূনতম।
সামান্যতম ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত ছিল না লালবাজার। একশো জন বাছাই করা পুলিশকর্মীকে জড়ো করা হয়েছিল ধামাখালিতে। হাজির ছিলেন আমিনুলের নেতৃত্বে অন্তত ডজনখানেক অফিসার। ঘড়ির কাঁটা যখন রাত তিনটে ছুঁতে চলেছে, আকুঞ্জিদের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়া হল। জবাব এল না।
আগের রাত্রে সাদা পোশাকে কয়েকজন অফিসার ঘুরে গিয়েছিলেন জায়গাটা। একটা বড় ‘রেইড’ করার আগে সরেজমিনে যে ‘ঘুরে যাওয়াটা’ অসম্ভব জরুরি। কোথায় ‘রেইড’ হবে, কোন দিক দিয়ে ঢোকা হবে, ভিতরে কারা যাবে, বাইরে ‘ব্যাক-আপ’ হিসাবে কারা থাকবে, যাদের ধরতে যাওয়া হচ্ছে, তারা কোনদিক দিয়ে পালাতে পারে, এবং সেই পালানোর পথ কীভাবে বন্ধ করতে হবে… সমস্ত খুঁটিনাটি ছবি এঁকে আগেভাগে বুঝিয়ে দেওয়া হয় ‘রেইড’-এ অংশ নেওয়া অফিসার-কর্মীদের। কার কখন কী দায়িত্ব, পরিষ্কার হয়ে যায় জলবৎ তরলং।
কড়া নেড়েও জবাব না এলে কী করা হবে, ভাবাই ছিল। আনা হয়েছিল বেশ কয়েকটা কাঠের সিঁড়ি। লাগানো হল পাঁচিলের গায়ে। জনা কুড়ি অফিসার-ফোর্স সিঁড়ি বেয়ে উঠে পাঁচিল টপকে নেমে পড়লেন বাড়ির ভিতরে। গেট খুলে দিলেন বাড়ির। বাকি ফোর্স ঢুকে পড়ল। প্রত্যেকের হাতে হয় টর্চ, নয় ড্রাগন লাইট।
তিন বিঘে জমির উপর যেন একটুকরো গ্রাম। ছোট ছোট আটটা ঘর ছড়িয়ে ছিটিয়ে। একটা পুকুর। গোরু-বাছুর বাঁধা রয়েছে একটা বড় গোয়ালঘরে। এক প্রান্তে দুটো গুদামঘর। ধান বোঝাই করা আছে। ধানের স্তূপ অবশ্য শুধু গুদামেই নয়, সাজানো রয়েছে বিস্তৃত জমির এখানে-ওখানে-সেখানে।
পুকুরের ঠিক পাশেই অন্যগুলোর তুলনায় একটু বড় একটা ঘর। যার কড়া নাড়তে দরজা খুলে ঘুমচোখে বেরিয়ে এলেন পরিবারের কর্তা। আবদুল কাদের আকুঞ্জি। শক্তপোক্ত চেহারা। ফতুয়া-লুঙ্গি পরিহিত ভদ্রলোক পুলিশ দেখে অবাক। শান্ত গলায় প্রশ্ন করলেন আমিনুলকে।
—কী ব্যাপার? আপনারা এভাবে সবাই মিলে আমার বাড়িতে… কী ব্যাপার?
—বলছি… আপনার ছেলেদের ডাকুন। আমরা লালবাজার থেকে আসছি। আপনার বাড়িটা সার্চ করব।
এবার সামান্য উত্তেজিত দেখায় সিনিয়র আকুঞ্জিকে।
—সার্চ করবেন মানে? কী সার্চ করবেন? আমরা কি চোর-ডাকাত নাকি? সার্চ ওয়ারেন্ট কোথায়? সার্চ করবেন বললেই হল? দেশে আইন নেই?
—আইনের আলোচনা আপনার সঙ্গে করতে আসিনি আকুঞ্জি সাহেব। আর চোর-ডাকাত কিনা সেটা তো আপনি ভাল বলতে পারবেন… আপনার ছেলেরা বলতে পারবে… কোথায় ওরা?
‘কোথায়’, সেটা জানতে ততক্ষণে আকুঞ্জিদের বাড়ির প্রতিটি কোনায় তল্লাশি শুরু করে দিয়েছে পুলিশবাহিনী। গুদামঘর-গোয়ালঘর-ধানের স্তূপ, কিছু বাদ নেই। কয়েকটা ঘর তালাবন্ধ ছিল। বাকিগুলো থেকে বেরিয়ে এসেছেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। বেরিয়ে এসেছেন বাড়ির কাজের লোকরাও।
পুরুষ সদস্য বলতে গৃহকর্তা নিজে ছাড়াও উপস্থিত চার ছেলের মধ্যে তিনজন।বড় মাজেদ, সেজো ওয়াহেদ এবং স্কুলপড়ুয়া ছোটছেলে ওহিদ।
—আপনার মেজোছেলে ওয়াজেদ কই?
—ও বেশিরভাগ সময় ব্যবসার কাজে কলকাতায় থাকে। মাসে এক-দু’দিন আসে।
—কোথায় থাকে কলকাতায়?
—সেটা বলতে পারব না।
—শেষ কবে এসেছিল এখানে?
—মাসখানেক আগে হবে।
—ভালই তো ব্যবসা আপনাদের, ডাকাতির মধ্যে না ঢুকলে চলছিল না?
এবার রাগে ফেটে পড়েন আকুঞ্জি সাহেব।
—মানে? বাড়ি বয়ে এসে যা খুশি বলবেন, যা খুশি করবেন? স্রেফ পুলিশ বলে? কে ডাকাতি করেছে? এপাড়ায় কতদিন ধরে আছি জানেন? খোঁজ নিয়ে দেখুন না আমাদের ব্যাপারে! পুরো বাড়ি তছনছ করে দিচ্ছেন সার্চের নামে, আমি আপনাদের ছেড়ে দেব ভেবেছেন? কোর্টে যাব।
কোর্টে যাওয়ার সত্যিই সংগত কারণ থাকবে, অফিসাররা বুঝতে পারছিলেন তল্লাশির পর। কিছুই পাওয়া গেল না তন্নতন্ন করে খোঁজার পরও। রিভলভার না, গুলি না, বোমা না। ব্যাংকলুঠের একটা টাকাও না।
হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন ছিল না। সিনিয়র আকুঞ্জির প্রবল প্রতিবাদকে উপেক্ষা করেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গোয়েন্দারা লালবাজারে নিয়ে এলেন মাজেদ আর ওয়াহেদকে।
নিয়ে তো এলেন। কিন্তু রাতভর ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা করেও ডাকাতির ব্যাপারে স্বীকারোক্তি তো দূরের কথা, কোনও বাড়তি তথ্যও পাওয়া গেল না। দু’জনেই একই কথা আউড়ে গেলেন তোতাপাখির মতো, ‘ডাকাতির ব্যাপারে কিছুই জানি না আমরা।’
