চারটে ‘জোন’-এ ভাগ করে নেওয়া হয়েছিল কলকাতা সংলগ্ন জেলাগুলোকে। হাওড়া, হুগলি, উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা। দশ-বারো জন সোর্সকে থাকা-খাওয়ার খরচ দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রতিটি জোনে। সোর্সদের কাজকর্মের তত্ত্বাবধানে প্রতি টিমের সঙ্গে ছিলেন গোয়েন্দাবিভাগের অন্তত দু’জন অফিসার।
পাঁচ তদন্তকারী অফিসার, ইন্দ্রনীল-তরুণ-রাম-তপন-শাকিলুর সারা সপ্তাহ ধরে জেলাগুলোয় চক্কর দিয়ে বেড়াতেন। রোজ কথা বলতেন ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা সোর্স এবং অফিসারদের সঙ্গে।
এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তদন্তকারীরা, সোর্সের দেওয়া খবরের গুণাগুণ বিচারের বিলাসিতা ছিল না। সেই বিশেষ টিমের একজনের ভাষায়, ‘নাওয়াখাওয়া ভুলতে বসার অবস্থা হয়েছিল আমাদের। যে সোর্স যখন যা বলছে, অন্ধের মতো ছুটছি তখন। ক্লু হাতে না থাকলে যা হয়। কেউ বলল, নৈহাটির শিবদাসপুরে নাকি কয়েকটা ছেলে প্রচুর টাকা ওড়াচ্ছে। ছুটলাম নৈহাটি। পরের দিনই খবর এল হয়তো, আন্দুলে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে কয়েক মাস ধরে সাত-আটজন লোক রয়েছে। সকালে বেরিয়ে যায়, রাতে ফেরে। কেউ জানে না কী করে ওরা। ব্যস, ছোটো আন্দুল। কিন্তু কোনও খবরই “ক্লিক” করছিল না।’
‘ক্লিক’ করার সামান্য আভাস মিলল ’৯৮-এর জানুয়ারির মাঝামাঝি। প্রথম ডাকাতির পর প্রায় ছ’মাস অতিক্রান্ত তখন। মিনাখাঁয় একজন সোর্স কিছু খবর দিয়েছিল। সেই খবর যাচাই করতে আমিনুল হক সহ পাঁচ তদন্তকারী একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে রেইড করে ফিরছিলেন কলকাতায়। নিষ্ফলা রেইড। খবরটা ভুল ছিল।
গাড়ি ছুটছিল বাসন্তী হাইওয়ে দিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ হল ভোর হয়ে গেছে। শীতের ভোর। অফিসারদের সোয়েটার-শাল-জ্যাকেটকে বলে বলে গোল দিচ্ছে ফাঁকা হাইওয়ের উত্তুরে হাওয়া।
রাস্তার ধারের দু’-একটা চায়ের দোকান ঝাঁপ খুলেছে। ভোজেরহাটের এমনই একটা দোকানের সামনে গাড়ি ব্রেক কষল। অফিসাররা সিদ্ধান্ত নিলেন, একটু চা না হলেই নয়। ঘুমটা তো অন্তত কাটুক। হাড়-কাঁপানো ঠান্ডাটাও।
ভাঁড়ের চা, ধোঁওয়া-ওঠা। আয়েশি চুমুক দিতে দিতেই আমিনুল এবং বাকিরা লক্ষ করলেন, অন্তত পনেরো-কুড়িটা ট্রাক সার দিয়ে চলেছে বাসন্তীর দিকে। সবক’টা ইটবোঝাই। এ রাস্তায় তো এত ইটভাটা নেই! ইটভরতি ডজনখানেক ট্রাক যাচ্ছে কোথায়? কোনও ব্রেনওয়েভ নয়। কোনও মগজাস্ত্র নয়। নিছকই কৌতূহলে আমিনুল প্রশ্ন করেন চায়ের দোকানিকে।
—এতগুলো ট্রাক! সব কি ইটভাটায় যায়? এ রাস্তায় এত ইটভাটা আছে?
—না স্যার, ইটভাটা নয়। আকুঞ্জি মার্কেট তৈরি হচ্ছে তো ধামাখালিতে। ওখানে যাচ্ছে। রোজই এ সময় যায়। ইট যায়। সিমেন্ট যায়। বালি যায়।
—কী মার্কেট?
—আকুঞ্জি। আকুঞ্জি মার্কেট।
.
‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই’—তদন্তের চিরন্তন আপ্তবাক্য। ছাই উড়িয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। যোগাযোগ করা হল ধামাখালির দু’জন সোর্সের সঙ্গে, ‘খবর চাই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে। কোথায় মার্কেট তৈরি হচ্ছে, কারা করছে, কত টাকা খরচ হচ্ছে, সব খবর চাই।’
চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই খবর এল। ধামাখালির আকুঞ্জিপাড়ায় সবাই একডাকে চেনে আকুঞ্জি পরিবারকে। বিঘের পর বিঘের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে মাছের ভেড়ির মালিক এই আকুঞ্জিরা। গলদা চিংড়ির রপ্তানিই প্রধান ব্যবসা। চাষবাসের জমিজমাও আছে যথেষ্ট। তবে ভেড়িই রোজগারের মূল উৎস। প্রচুর স্থানীয় লোক কাজ করে আকুঞ্জিদের ভেড়িতে। এলাকার অন্যতম সম্পন্ন পরিবার।
মাসখানেক আগে হাইওয়ে সংলগ্ন এলাকায় শুরু হয়েছে আকুঞ্জি মার্কেট তৈরির কাজ। বিশাল এলাকা জুড়ে বসবে বাজার। একটা বড় বাজারের দীর্ঘদিনের অভাব স্থানীয় মানুষের। সেই অভাব দূর করতে উদ্যোগী হয়েছে আকুঞ্জিরা। কাজ চলছে ঝড়ের গতিতে। ইট-বালি-চুন-সুরকি বোঝাই গাড়ির দাপাদাপি লেগেই আছে।
শুধু বাজারই নয়, মাসদেড়েক হল পাড়ায় একটা মসজিদও তৈরি করে দিয়েছে আকুঞ্জিরা। নামাজ পড়তে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে দূরের মসজিদে যেতে হত এর আগে। অসুবিধে হত বয়স্কদের। এখন পাড়ার মধ্যেই প্রার্থনার সুব্যবস্থা। সৌজন্য, আকুঞ্জি পরিবার।
যথেষ্ট ধনী পরিবার ঠিকই। কিন্তু হঠাৎ করে এত টাকা আসছে কোত্থেকে, যে রাতারাতি মসজিদ বানানো হয়ে গেল, বাজারও তৈরি হওয়ার মুখে? ভেড়ির কর্মচারীদের কাছে খোঁজ নিয়ে সোর্স জানাল, ব্যবসা চলছে আগের মতোই। মাছ রপ্তানির পরিমাণ যে হঠাৎ বেড়েছে, এমন নয়। তা হলে?
আকুঞ্জি পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হল বিস্তারিত। এবং যা জানা গেল, তাতে ‘সামান্য আলোর আভাস’ দেখতে পেলেন গোয়েন্দারা, দীর্ঘদিন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ধুঁকতে থাকার পর রোগী জেনারেল বেডে ফেরার ছাড়পত্র পেলে যেমন হয়।
পরিবারের মাথা হলেন মধ্যপঞ্চাশের আবদুল কাদের আকুঞ্জি। চার ছেলে। বড়ছেলের বয়স তিরিশ, নাম আবদুল মাজেদ আকুঞ্জি। মেজোছেলে আঠাশ, নাম আবদুল ওয়াজেদ। সেজোর বয়স হয়েছে চব্বিশ-পঁচিশ, আবদুল ওয়াহেদ। ছোটছেলে স্কুলে পড়ে, আবদুল ওহিদ।
ছোটছেলেকে হিসেবের বাইরে রাখা হল। মাজেদ-ওয়াজেদ-ওয়াহেদ, বড়-মেজো-সেজো-র গতিবিধি কেমন?
জানা গেল, বড় এবং সেজো ভেড়ির কাজেই সাহায্য করে বাবাকে। মেজোছেলে, ওয়াজেদ আকুঞ্জি, নিয়মিত যাতায়াত করে কলকাতায়, ব্যবসার কাজে। কখনও মোটরসাইকেলে করে, কখনও পারিবারিক গাড়িতে। বেশিরভাগ সময়েই কলকাতাতেই থাকে ইদানীং। গত কয়েক মাস পাড়ার লোক খুব বেশি হলে
