‘আশেপাশে’ শব্দটা শুনলে এমনিতে মনে হয় কাছেপিঠেই। খুব দূরে নয়, এমন কোনও জায়গা যেন। এক্ষেত্রে কিন্তু নামেই শুধু ‘আশেপাশে’। আসলে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটারের বিস্তীর্ণ এলাকা। উত্তর ২৪ পরগনায় ব্যারাকপুর মহকুমার টিটাগড়, জগদ্দল, নোয়াপাড়া, নৈহাটি, বীজপুর। বারাসত সংলগ্ন এলাকার মধ্যমগ্রাম, আমডাঙা, দেগঙ্গা। সঙ্গে যোগ করুন বসিরহাট এবং বনগাঁ মহকুমার ব্যাপ্ত ভূখণ্ড। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বারুইপুর-জয়নগর-কুলতলি-গোসাবা-বাসন্তী-ক্যানিং-ধামাখালি এবং সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চল। হাওড়া-হুগলি তো আছেই। একদিকে সাঁতরাগাছি-ডোমজুড়-আন্দুল ইত্যাদি। অন্যদিকে চুঁচুড়া-পোলবা-ধনেখালি-মগরা-পাণ্ডুয়া-সিঙ্গুর-চণ্ডীতলা-জাঙ্গিপাড়া প্রভৃতি।
দুই, পাঁচটা ঘটনার একটাতেও মুখ ঢাকা ছিল না ডাকাতদের। অনেকেই দেখেছে চেহারাগুলো। মনে রেখেছে। অন্তত পঞ্চাশ-ষাট জনের সঙ্গে কথা বলে ছবি আঁকানো হয়েছে ছ’জনের। অথচ চিহ্নিত করা যায়নি। না পাওয়া গেছে পুরনো রেকর্ডে, না চিনতে পেরেছে সোর্সরা। নতুন গ্যাং, অথচ প্রতিটা ঘটনায় ‘এ টু জেড’ তুখোড় প্ল্যানিং। সিইএসসি-র টাকা কখন কোন রাস্তা দিয়ে শ্যামবাজার থেকে ধর্মতলা যাবে, খবর ছিল নিখুঁত। অরবিন্দ সরণির দোকানের ক্যাশবাক্স ভাঙলে যে প্রচুর টাকা পাওয়া যাবে, অজানা ছিল না ওদের।
ডাকাতদের ছবি আঁকানোর অবশ্য প্রয়োজনই হত না আজকের দিন হলে। সব ব্যাংকে সিসি টিভি আছে আজকাল। এক মিনিটে ফুটেজ চলে আসে হাতে। ঘটনা ১৯৯৭-এর। তখন না ছিল সিসি টিভি, না ছিল হাতে হাতে মোবাইল ফোন। ‘ইলেকট্রনিক ইনটেলিজেন্স’-এর সুবিধে থেকে বঞ্চিত ছিলেন সে-সময়ের তদন্তকারীরা। ভরসা ছিল শুধু ‘হিউম্যান ইনটেলিজেন্স’। সাদা বাংলায়, সোর্স।
সোর্স। যারা পুলিশকে খবর দেয়। কারা দেয়? অপরাধের খবর, অপরাধীর খবর কি ভারত সেবাশ্রম বা রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা দেবেন? অপরাধ-জগতের সঙ্গে যারা যুক্ত, অতীতে বা বর্তমানে, তারাই দেবে। তারাই দেবে খবর, অপরাধের সূত্রেই যাদের সঙ্গে কখনও কখনও যোগাযোগ হয়েছে পুলিশ অফিসারদের। যোগাযোগ থেকে ক্রমশ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে খবর আদানপ্রদানের।
সোর্স তৈরি করা এবং তাকে লালন করা এক শিল্পবিশেষ। যা আয়ত্ত না করতে পারলে সফল গোয়েন্দা হওয়ার স্বপ্ন দিনের শেষে স্রেফ সোনার পাথরবাটিই। একজন বিশ্বস্ত সোর্স তৈরি করতে কখনও কখনও লেগে যায় এক বছর বা তারও বেশি। এবং এমনও আকছার হয়, সেই সোর্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসারের ব্যক্তিগত স্তরে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। অফিসারের বাড়ির কেউ অসুস্থ হয়েছেন, হয়তো বিরল গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন। সবার আগে সেই সোর্স হাজির হয়ে যায়, ‘কী লাগবে স্যার, আমাকে বলুন।’ এবং প্রাণপাত দৌড়ঝাঁপে জোগাড় করে আনে নির্দিষ্ট গ্রুপের রক্তদাতা।
আবার সোর্সের পারিবারিক সুখদুঃখের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন অফিসাররা। সে সোর্সের ছেলেমেয়েদের জন্য পুজোর জামা কিনে দেওয়াই বলুন বা তাদের স্কুলকলেজে ভরতি হওয়ার জন্য অর্থসাহায্য করা। অবসর নেওয়ার পরও বহু অফিসারের সঙ্গে সুসম্পর্ক থেকে যায় তাঁদের একসময়ের সোর্সদের। যে সম্পর্ক দাতা-গ্রহীতার ঊর্ধ্বে।
সোর্সকে ঠিকঠাক ‘হ্যান্ডল’ করতে না পারলে অবশ্য সেমসাইড গোলের সম্ভাবনা। সুযোগ পেলেই পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে অপব্যবহার করার প্রবণতা থাকে সোর্সদের একটা বড় অংশের। যারা মনে করে, পুলিশ অফিসারদের খবর দিই মানে অন্যত্র যা খুশি করার লাইসেন্স পাওয়া হয়ে গেছে।
অমুক জায়গায় হয়তো চোলাই মদের ঠেক বসেছে। তমুক জায়গায় হয়তো জুয়ার বোর্ড চলছে গোপনে। সোর্স গিয়ে টাকা আদায় করতে শুরু করে। না দিলে পুলিশকে জানিয়ে দেবে, এই ভয় দেখিয়ে। সোর্সকে তাই অনেক সময় ‘ম্যানমার্কিং’ করতে হয় অফিসারদের। এক সোর্সের পিছনে লাগাতে হয় অন্য সোর্স। যাতে কোনও সোর্স উইং দিয়ে ওভারল্যাপে গেলেই খবর আসে, এবং পত্রপাঠ থামিয়ে দেওয়া যায় কড়া ট্যাকলে। যাতে ‘সোর্স’ কোনভাবেই ‘রিসোর্স’ না হয়ে যায়।
পাঁচ সাব-ইনস্পেকটর তদন্ত করছিলেন ডাকাতির পাঁচটা মামলার। এন্টালির কেসের দায়িত্বে ছিলেন ইন্দ্রনীল চৌধুরী। আলিপুরের মামলায় তরুণকুমার দে। লেকের ব্যাংক ডাকাতির তদন্ত করছিলেন রাম থাপা। সিইএসসি-র টাকা লুঠের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন তপন সাহা এবং অরবিন্দ সরণির দোকানে ডাকাতির তদন্তভার ন্যস্ত হয়েছিল শাকিলুর রহমানের উপর। তবে যেহেতু প্রতিটি ঘটনাই সংশয়াতীত ভাবে ছিল একই দলের কীর্তি, তদন্তকারী অফিসাররা একত্রে ঝাঁপিয়েছিলেন সমাধানে। সকলের মধ্যে সমন্বয়ের কাজটা করছিলেন anti-dacoity বিভাগের ওসি বিমল সাহা এবং অ্যাডিশনাল ওসি আমিনুল হক। তদন্তের জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, ছিল বিমল-আমিনুলেরই দায়িত্বে।
যার যেখানে যা সোর্স ছিল, প্রত্যেককে খবর পাঠানো হয়েছিল। নগরপাল ঢালাও বরাদ্দ করেছিলেন ‘সোর্সমানি’। নির্দেশ ছিল স্পষ্ট, সোর্সকে যেখানে ইচ্ছে পাঠাও খবর নিতে। যেখানে ইচ্ছে, যতদিন ইচ্ছে থাকতে হয়, থাকুক। যত খরচ হয় হোক। কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু খবর চাই। পাকা খবর। যে-কোনও মূল্যে।
