দুই, শহরে তো বটেই, গত দশ বছরে রাজ্যের সমস্ত ব্যাংক-ডাকাতির রেকর্ড দেখা খুঁটিয়ে। যারা ধরা পড়েছিল পুরনো মামলায়, তাদের ছবির সঙ্গে কোনও মিল আছে ডাকাতদের? পুরনো গ্যাংগুলোর ‘মোডাস অপারেন্ডি’-র সঙ্গে কোনও সাদৃশ্য? পুরনো কেসে ধৃত ডাকাতদের কারা কারা এখন জামিনে জেলের বাইরে? কী তাদের গতিবিধি? দস্যু রত্নাকর থেকে বাল্মীকিতে রূপান্তরের ঘটনা বাস্তবে তো আর খুব বেশি ঘটে না!
চেষ্টায় ত্রুটি ছিল না anti-dacoity বিভাগের অফিসারদের। কিন্তু বহু চেষ্টাতেও সূত্র ছিল অমিল। প্রায় দু’মাস কেটে গিয়েছিল ট্যাংরার ডাকাতির পর। সমাধান ছিল অধরাই। এবং যত দেরি হচ্ছিল, প্রমাদ গুনছিলেন অফিসাররা। পুলিশে বলা হয়, ‘The best way to prevent the recurrence of a crime is to detect it.’ অপরাধের পুনরাবৃত্তিকে প্রতিহত করার সেরা রাস্তা একটাই। অপরাধের কিনারা করে ফেলা যথাসাধ্য দ্রুত। এক্ষেত্রে ‘ডিটেকশন’ এখনও দূর অস্ত। শহরে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে কয়েকশো ব্যাংক। সর্বত্র সবসময় নজরদারি সম্ভব, সম্ভব এভাবে ‘প্রিভেনশন’? যা মনে হচ্ছে, নতুন কোনও গ্যাং। বেপরোয়া এবং মরিয়া। একটা ক্রাইম করে সাধারণত থেমে যায় না এরা।
থামলও না। ১৯ জুলাইয়ের পর ৬ সেপ্টেম্বর। ট্যাংরার পর আলিপুর। ফেডারাল ব্যাংকের পর স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া। মোমিনপুর ব্রাঞ্চ। সকাল ১১-২৫ থেকে ১১-৪৫, কুড়ি মিনিটের অপারেশন একই কায়দায়। রিভলভারের বাঁটের আঘাত ব্যাংকের অ্যাকাউন্টেন্টের মাথায়। চার লক্ষ আট হাজার চারশো তেরো টাকা লুঠ করে ছ’জনের ডাকাতদল উধাও! একটা মারুতি এবং দুটো মোটরসাইকেলে করে।
আলিপুরের ডাকাতির সপ্তাহ তিনেক পরেই, ২৮ সেপ্টেম্বর, লেক থানা এলাকার স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার শাখায় হানা দিল ডাকাতরা। একটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে। সেই পাঁচ-ছয় জনের দল, সেই একই পদ্ধতি। আচরণ অবশ্য হিংস্রতর। ব্যাংকের নিরাপত্তারক্ষী বাধা দিতে গেছিলেন, সটান গুলি চালিয়ে দিল এক ডাকাত। ভোজালির আঘাতে রক্ত ঝরল আরও তিনজন ব্যাংককর্মীর। গুলিবিদ্ধ নিরাপত্তারক্ষীকে এবং আহত হওয়া বাকিদের যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শরৎ বোস রোডের রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানে, তখন বাজে প্রায় দেড়টা। যার পনেরো মিনিট আগে, সোয়া একটা নাগাদ তিন লক্ষ আটষট্টি হাজার টাকা লুঠ করে চম্পট দিয়েছে ডাকাত দল।
ডাকাতি নম্বর চার, অক্টোবরের ২০ তারিখ। এবার ব্যাংকে নয়। অরবিন্দ সরণির একটা দোকানে। নাম, ‘ইন্ডিয়া ট্রেডিং কোম্পানি’। দুপুর একটার পরে তিনটে মোটরসাইকেল এসে ব্রেক কষল দোকানের সামনে। দোকানের কর্মচারীদের রিভলভার দেখিয়ে ক্যাশবাক্স ভেঙে পাঁচ লক্ষ টাকা লুঠ। এবার রিভলভার-ভোজালির পাশাপাশি নতুন সংযোজন, বোমা। পালানোর আগে দুটো বোমা রাস্তায় ছুড়ল ডাকাতরা। স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হলেন দু’জন পথচারী। ডাকাতদের চেহারার বিবরণ? আশঙ্কা সত্যি হল, মিলে গেল আগের তিনটে ঘটনার সঙ্গে।
পঞ্চম ঘটনা নভেম্বরের সাত তারিখে। এবার টার্গেট সিইএসসি-র গাড়ি। যাচ্ছিল শ্যামবাজারের অফিস থেকে ধর্মতলার সদর দফতর ভিক্টোরিয়া হাউসে। গাড়িতে প্রায় ছাব্বিশ লক্ষ টাকা ছিল। ছিলেন সিইএসসি-র তিনজন কর্মী এবং এক বন্দুকধারী রক্ষী। দুপুর একটা নাগাদ মহাত্মা গাঁধী রোড আর চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের ক্রসিংয়ের কাছে ক্যাশভ্যানের পথ আটকে দাঁড়াল তিনটে মোটরসাইকেল। ড্রাইভারের মাথায় এরপর রিভলভার ঠেকানো, রক্ষীর বন্দুক কেড়ে নেওয়া, এক কর্মীর মাথায় রিভলভারের বাঁট দিয়ে মেরে রক্তপাত ঘটানো এবং পঁচিশ লক্ষ ছিয়ানব্বই হাজার চারশো বারো টাকা নিয়ে তিরবেগে উধাও হয়ে যাওয়া পাঁচ-ছ’জনের দলের। যাদের চেহারার বর্ণনা প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে শুনে পুলিশের সন্দেহের ন্যূনতম অবকাশও থাকল না, এরা ওরাই। একই গ্যাং। পাঁচজন মাঝারি হাইটের, দোহারা চেহারার। একজন বেঁটে, মোটাসোটা।
১৯ জুলাই, ৬ সেপ্টেম্বর, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০ অক্টোবর, ৭ নভেম্বর। চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে পাঁচটা দুঃসাহসিক ডাকাতি। লুঠ প্রায় পঞ্চাশ লাখের কাছাকাছি। যথেচ্ছ গুলি-বোমার ব্যবহার। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, নড়ে গিয়েছিল লালবাজার। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল শহরে। আশঙ্কা-উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ত্রিভুজে দমবন্ধ অবস্থা হয়েছিল গোয়েন্দা বিভাগের অফিসারদের। কারা এরা? এরপর কবে? কোথায়? কখন?
দীর্ঘ বৈঠকের পর লালবাজারের কনফারেন্স রুমে কটাক্ষের সুরে এই প্রশ্নটাই ছুড়ে দিয়েছিলেন সিপি।
—হোয়াট নেক্সট? আমরা কি ছ’নম্বর ডাকাতির জন্য অপেক্ষা করব? আর ছয়ের পর সাত নম্বরের জন্য?
সরকারের উপরমহলে ডাকাতির ঘটনাগুলোর দ্রুত সমাধানে কলকাতা পুলিশের ব্যর্থতার জবাবদিহি করতে করতে সাময়িক ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল সিপি-র। যদিও নগরপাল জানতেন বিলক্ষণ, কী প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছিলেন গোয়েন্দারা। যাঁদের কাছে দুটো ব্যাপার পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল ডাকাতির ঘটনাগুলোর চুলচেরা পোস্টমর্টেমে।
এক, কলকাতার বা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ‘গ্যাং’ এরা। রাজ্যের বাইরের নয়। বিহারের ডাকাত-অধ্যুষিত গয়া-পাটনা-বেগুসরাই-জামুইয়ের নয়। স্পষ্ট বাংলায় কথা বলেছে প্রত্যেকটা ঘটনায়। খোঁজখবরের কেন্দ্রস্থল তাই হওয়া উচিত শহর আর আশেপাশের জেলায়।
