পোশাক কেমন ছিল?— হাফ শার্ট আর ট্রাউজার। চেহারা?— মাঝারি হাইট এবং দোহারা গড়ন সবারই। একজন ছাড়া। যে তুলনায় বেঁটে, মোটাসোটা। রামচন্দ্রনের ভাষায়, ‘hefty and bulky’।
কী ভাষায় কথা বলছিল?— পরিষ্কার জড়তাহীন বাংলায়।
কেউ কাউকে নাম ধরে ডেকেছিল, যতক্ষণ ব্যাংকের মধ্যে ছিল? —না।
কারও চেহারায় কোনও বিশেষত্ব চোখে পড়েছিল? টাকমাথা বা গালে আঁচিল? কপালে কাটা দাগ বা টেনে টেনে হাঁটা? কোনও কিছু এমন, যা দিয়ে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা করা যায়? — না, তেমন তো কিছু মনে পড়ছে না!
বয়স? —এই পঁচিশ-তিরিশের মধ্যে হবে আন্দাজ। শুধু ওই বেঁটে মোটা লোকটাকে দেখে বয়স সামান্য বেশি বলে মনে হয়েছে।
আবার দেখলে ওদের চিনতে পারবেন? —হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটা ডেফিনিটলি পারব।
.
ভারতীয় দণ্ডবিধিতে অপরাধের স্তরবিভেদ আছে। Offences against body, অর্থাৎ শারীরিক আঘাতজনিত অপরাধ। খুচরো মারামারি থেকে শুরু করে খুন পর্যন্ত। Offences against property, সম্পত্তির ক্ষতি সংক্রান্ত অপরাধ। পকেটমারি, ছিঁচকে চুরি থেকে ডাকাতি পর্যন্ত।
সম্পত্তিজনিত অপরাধের তালিকায় শীর্ষবাছাই, লেখা বাহুল্য, ডাকাতিই। Offences against property-র মধ্যে সাধারণভাবে কোন অপরাধকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত? বিশ্বের সমস্ত পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের এই প্রশ্নের জবাবে তিন অক্ষরের একটা শব্দই বরাদ্দ থাকে। ডাকাতি।
কেন, সহজবোধ্যই। একটা খুন হওয়ার নানারকম কারণ থাকতে পারে। সে টাকার লোভ বলুন, ব্যক্তিগত দ্বেষ বলুন, প্রেমঘটিত আক্রোশ বলুন বা যৌন-ঈর্ষা। কারণ সে যা-ই হোক, একটা বিচ্ছিন্ন খুন সামগ্রিকভাবে আমার-আপনার মধ্যে নিরাপত্তাবোধের তীব্র অভাব জাগিয়ে তোলে না। কিন্তু ডাকাতি? পাড়ায় যদি একটা দুঃসাহসিক ডাকাতি হয়ে যায়, মারধর করে লুঠপাট চালিয়ে যায় ডাকাতরা? প্রতিবেশীদের মনে অবধারিত তৈরি হয় ভয় আর আতঙ্কের যুগলবন্দি। কাল ওই বাড়িটায় হয়েছে, পরশু যে আমার বাড়িতে হবে না, কী গ্যারান্টি?
এই কারণেই ভারতীয় দণ্ডবিধিতে ‘ডাকাতি’-র চারটি পর্যায় চিহ্নিত করে শাস্তির বিধান রয়েছে। ডাকাতির জন্য জড়ো হওয়া। ডাকাতির জন্য অস্ত্রশস্ত্র সমেত প্রস্তুতি নিয়ে একত্রিত হওয়া। ডাকাতির চেষ্টা। এবং ডাকাতি সংঘটিত করা।
ডাকাতির মধ্যে আবার চরিত্রভেদ রয়েছে। বাড়িতে হতে পারে। দোকানে হতে পারে। পথচলতি গাড়ি থামিয়ে হতে পারে। কিনারা করা কতটা দুরূহ, সেটা যদি মানদণ্ড হয়, তবে পুলিশের কাছে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং হল ব্যাংক-ডাকাতি।
কেন তুলনায় বেশি চ্যালেঞ্জিং? গোপন কিছু নয়। দুর্বোধ্যও নয়। প্রথমত, সব ডাকাত ব্যাংক-ডাকাত নয়, কেউ কেউ ব্যাংক-ডাকাত। ব্যাংক-ডাকাতি একটা ‘specialized crime’, বাড়ি-গাড়ি-দোকানে ডাকাতির থেকে আলাদা। অন্য কোথাও ডাকাতির তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকি আর সাহস লাগে ব্যাংকলুঠে। যা করতে হয়, দিনের বেলায় করতে হয় ডাকাতদের। রাতবিরেতে আচমকা হানা দিয়ে কাজ হাসিল করার গল্প নেই কোনও। এবং যেহেতু দিনের বেলায়, যেহেতু গ্রাহক এবং কর্মীদের উপস্থিতিতে দুষ্কর্ম, ধরা পড়ে যাওয়ার চান্স ঢের বেশি। চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার চান্স বেশি। ডাকাতির সময় প্রতিরোধের মুখে পড়লে কী করব, লুঠের পর কীভাবে কোন রাস্তা দিয়ে কোথায় পালাব যত দ্রুত সম্ভব, কোথায় কীভাবে গা ঢাকা দেব, লুঠের টাকা কার কাছে কতটা থাকবে, সব নিখুঁত ভেবে রাখতে হয় আগে থেকে। সামান্য ভুলচুক হলেই ভরাডুবি অনিবার্য এবং শ্রীঘরযাত্রা।
দ্বিতীয়ত, কোনও বাড়ি বা দোকানে অতর্কিত হামলা করে ‘আলমারির চাবি কোথায়?’ বলা আর ভয় দেখিয়ে টাকাপয়সা-গয়নাগাটি কেড়ে নেওয়ার তুলনায় ব্যাংকলুঠ অনেক বেশি কঠিন। প্রথমটা পাস কোর্স হলে দ্বিতীয়টা অনার্স। আগে থেকে ব্যাংকের অবস্থানগত খুঁটিনাটি জেনে রাখতে হয়। সরেজমিনে দেখে যেতে হয় একাধিকবার। যাকে বলে recce করা।
ঢোকা-বেরনোর গেট কতটা প্রশস্ত, ক’টা ক্যাশ কাউন্টার, কতজন কর্মী, কে কোথায় বসেন, ম্যানেজারের ঘর কোনটা, স্ট্রং রুম কোথায়, সব মাথায় রেখে তবে প্ল্যান করে ব্যাংক-ডাকাতরা। এবং সবচেয়ে জরুরি, ব্যাংকে চড়াও হওয়ার সময়টা। পুরনো রেকর্ড খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, হয় ব্যাংক খোলার সময়, বা বন্ধ হওয়ার সময়, বা ভরদুপুরে সিংহভাগ ব্যাংক-ডাকাতি ঘটে থাকে। এমন একটা সময়ে, যখন গ্রাহকের ভিড় জমাট বাঁধেনি ব্যাংকে। দিনের শুরু বা শেষে যখন কর্মীরাও একটু অগোছালো, একটু ঢিলেঢালা। পেশাদারি প্ল্যানিংয়ে অপরাধটা হয় বলেই ব্যাংক-ডাকাতির কিনারা দুরূহতর হয়ে দাঁড়ায় তুলনামূলক ভাবে।
ফেডারাল ব্যাংকের ডাকাতিটার পর প্রথাসিদ্ধ পথেই এগিয়েছিল গোয়েন্দা বিভাগ। এক, ব্যাংকের কর্মী এবং গ্রাহক যাঁরা ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বিবরণ অনুযায়ী ব্যাংক-ডাকাতদের ছবি আঁকানো, ‘Portrait Parle’। এবং আঁকানোর পর সেই ছবি মিলিয়ে দেখা অতীতে ধরা পড়া ব্যাংক-ডাকাতদের সঙ্গে। ছবি ছড়িয়ে দেওয়া সোর্সদের মধ্যে। সোর্সদের ভূমিকায় পরে আসছি বিস্তারিত। এক লাইনে সেরে দেওয়া যাবে না এই কাহিনিতে।
