ভেবেচিন্তেই বাছা হয়েছে সময়টা। নির্দিষ্ট খবরের ভিত্তিতে কোনও দুর্ধর্ষ অপরাধীর আস্তানায় রেইড করতে গেলে ওটাই মাহেন্দ্রক্ষণ। ওটাই ব্রাহ্মমুহূর্ত। যাকে ধরতে যাওয়া, তার ঘুমিয়ে থাকার সম্ভাবনা থাকে প্রবল। আর একটা সুবিধে, আশেপাশের বাড়ি-ঘরদোরেও ঘুমিয়ে থাকেন বাসিন্দারা। রাস্তা থাকে শুনশান। পুলিশের গতিবিধির আগাম খবর অপরাধী পেয়ে যাবে স্থানীয় সূত্রে এবং চম্পট দেবে, সে আশঙ্কাও থাকে না বড় একটা।
কড়া নাড়া হল দরজায়। নেড়ে দরজার দু’পাশে ভাগ হয়ে গেলেন ওঁরা। সিনেমায় যেমন হয়। একদিকে চার, অন্যদিকে বাকি চার। উত্তর নেই ভিতর থেকে। ফের ঠক্ ঠক্ দরজায়। এবার জবাব এল।
—কে?
—পুলিশ। লালবাজার থেকে আসছি। দরজাটা খুলুন। দরকার আছে।
সেকেন্ড দশেকের নীরবতার পর ভিতর থেকে ফের ছিটকে এল উত্তর। গলার স্বরে মরিয়া ভাবটা স্পষ্ট।
—পুলিশ হোক আর যে-ই হোক, ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করলেই গুলি করব।
গুলি করার হুমকি যে ফাঁকা আওয়াজ নয়, জানতেনই ঘরের বাইরে থাকা অফিসাররা। যাঁদের কোমরে গোঁজা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে উঠে এল নিমেষে। ট্রিগার স্পর্শ পেল আঙুলের।
দরজা যে ভাঙতে হতে পারে, সেটাও জানার মধ্যেই ছিল। এবং ছিল প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও। শাবল-গাঁইতি আনা হয়েছিল ব্যাগে করে।
প্রয়োজন হল না অবশ্য। তেমন পোক্ত দরজা নয়। সজোরে গোটা দশেক লাথিতেই কলকবজা দেহ রাখল। এবং সঙ্গে সঙ্গে ভিতর থেকে ছুটে এল গুলি। কাঁধ চেপে বসে পড়লেন এক অফিসার। পালটা গুলি চালানো ছাড়া উপায় কী আর?
সত্যিই এসপার-ওসপার!
.
—অনেক আলোচনা হয়েছে। আমি জাস্ট একটা প্রশ্ন করে মিটিং শেষ করব!
নগরপালের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকান লালবাজারের কনফারেন্স রুমে উপস্থিত অফিসাররা। কী প্রশ্ন? থেমে থেমে ঠান্ডা গলায় বলতে থাকেন সিপি।
—হোয়াট নেক্সট? আমরা কি ছ’নম্বর ডাকাতিটার জন্য অপেক্ষা করব? আর ছয়ের পর সাত নম্বরের জন্য?
লালবাজারের কনফারেন্স রুমে নিশ্ছিদ্র নীরবতা নেমে আসে। পিন পড়লেও মনে হবে, চকলেট বোম ফাটল বুঝি। গোয়েন্দা বিভাগের Anti-dacoity বিভাগের সমস্ত অফিসার উপস্থিত। আছেন ডিসি ডিডি। সবার ঠোঁটে যেন সাইলেন্সার লাগিয়ে দিয়েছে কেউ।
কী-ই বা বলবেন ওঁরা সিপি-র প্রশ্নের উত্তরে? বলার মুখ থাকলে তো বলবেন! তিন মাসের মধ্যে পাঁচ-পাঁচটা ডাকাতি শহরের বুকে! এবং ডাকাতদের ধরা তো দূরস্থান, চিহ্নিতই করা যায়নি এখনও। অথচ জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে যখন প্রথম ডাকাতিটা হয়েছিল, গোয়েন্দারা দূরতম কল্পনাতেও ভাবেননি, পরের কয়েক মাসে তাঁরা পেশাগত জীবনের কঠিনতম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন।
.
১৯ জুলাই, ১৯৯৭। শনিবার। ট্যাংরা অঞ্চলের ৫২ডি, রাধানাথ চৌধুরী রোডের ফেডারাল ব্যাংকে কোলাপসিবল গেট বন্ধ করার প্রস্তুতি চলছে। বেলা বারোটা প্রায় বাজতে চলল। শনিবার গ্রাহকদের জন্য ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায় বারোটায়। জনাচারেক গ্রাহক এখনও কাউন্টারে আছেন। ওঁরা কাজ সেরে বেরিয়ে গেলেই ঝাঁপ ফেলে দেওয়া হবে রুটিনমাফিক।
কোথায় কাউন্টার বন্ধ করা, আর কোথায় ঝাঁপ ফেলা! বারোটা বাজার আগেই ব্যাংকের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল ছ’জন যুবক। যাদের চারজনের হাতে রিভলভার। বাকিদের হাতে ছুরি। যে চারজন গ্রাহক ক্যাশ কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁদের দিকে রিভলভার তাক করে আদেশ দিল এক যুবক।
—একটাও শব্দ করবেন না। করলে জানে মেরে দেব। চুপচাপ ওখানে গিয়ে বসে থাকুন। যান ওখানে!
‘ওখানে’ মানে দেওয়ালের এক কোণে। কাঁপতে কাঁপতে সেখানে গিয়ে বসে পড়লেন চারজন। পাহারায় সামনে দাঁড়িয়ে রইল রিভলভারধারী।
ততক্ষণে ব্যাংকের ল্যান্ডলাইনের তার কেটে দিয়েছে যুবকের দল। দুই ক্যাশিয়ারকে টেনে বার করে এনেছে কাউন্টারের ভিতর থেকে। এবং টাকার গোছা গোছা বান্ডিল তিন যুবক ভরতে শুরু করেছে সঙ্গে আনা থলেতে।
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার রামচন্দ্রন নায়ার আর দুই অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার গণপতি পেরুমল এবং সি জে অগাস্টিন হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন কেবিন থেকে। বাইরে কিছু একটা গণ্ডগোলের আভাস পেয়ে, চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে। দুই যুবক নিমেষে রিভলভার মাথায় ঠেকিয়ে দিল রামচন্দ্রন আর পেরুমলের। অগাস্টিন থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে নিজেই মাটিতে বসে পড়লেন।
ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের মাথায় রিভলভার ধরে এরপর স্ট্রংরুমে নিয়ে যাওয়া, ভল্ট খোলানো এবং ডাকাতদলের থলি দ্রুত ভরতি হয়ে যাওয়া টাকার বান্ডিলে। রামচন্দ্রন কিছু একটা বলতে গেলেন। ‘বারণ করলাম না শব্দ করতে?’ বলে রিভলভারের বাঁট দিয়ে সজোরে ভদ্রলোকের কপালে আঘাত করল এক যুবক। রক্তপাত অঝোরে। ব্যাংকের সমস্ত কর্মচারী নিথর বসে রইলেন নিজের নিজের চেয়ারে। চোখেমুখে প্রবল আতঙ্কের আঁকিবুকি নিয়ে।
আধঘণ্টার মধ্যে অপারেশন কমপ্লিট। আট লক্ষ আটচল্লিশ হাজার টাকা লুঠ করে তিনটে মোটর সাইকেলে সওয়ার হয়ে উধাও ডাকাতরা। এন্টালি থানার অফিসাররা যখন খবর পেয়ে এলেন, যখন এসে পৌঁছলেন গোয়েন্দা বিভাগের কর্তারা, তখনও আতঙ্কের ঘোর কাটেনি এলাকায়। তখনও ঘটনার বিবরণ দিতে গলা কাঁপছে ব্যাংকের কর্মচারীদের।
