বলা হয়, জাস্টিস ডিলেইড ইজ় জাস্টিস ডিনায়েড। ন্যায়বিচারে দেরির অর্থ ন্যায় থেকে বঞ্চিত হওয়াই। ভুল, এই মামলার চূড়ান্ত পরিণতিতে মনে হয়েছিল অতনুর (বর্তমানে গোয়েন্দা বিভাগেরই অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার)। দেরি হয়েছিল, অনেকটাই দেরি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে হয়নি শেষমেশ। বহু চড়াই-উতরাইয়ের পর মিলে গিয়েছিল অপরাধ আর শাস্তির হিসেব। মনে হয়েছিল অতনুর, কেউ না কেউ বোধহয় সবার অলক্ষ্যে জীবনের পাওনাগন্ডার ব্যালান্সশিটে নজর রাখেন আগাগোড়া, দিনের শেষে সব মিলিয়ে দেবেন বলে।
মেলাবেন তিনি মেলাবেন!
২.০৩ ‘দরজা ভাঙলেই গুলি করব!’
[আকুঞ্জি মামলা
বিমল সাহা, অবসরপ্রাপ্ত সহ নগরপাল। যথাক্রমে ১৯৯৮ এবং ২০০৮ সালে পেয়েছেন ভারত সরকারের ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল’ এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রদত্ত পদক।
আমিনুল হক, অবসরপ্রাপ্ত সহ নগরপাল, ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন ভারত সরকারের ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল’।
রাম থাপা, বর্তমানে বড়তলা থানার ওসি, ২০০৪ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রদত্ত ‘সেবা পদক’।
তরুণকুমার দে, ইনস্পেকটর। গোয়েন্দাবিভাগ।
ইন্দ্রনীল চৌধুরী, বৰ্তমানে হেয়ার স্ট্রিট থানার ওসি। ২০০৪ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ‘সেবা পদক’, ২০১৮ সালে সম্মানিত হয়েছেন ভারত সরকারের ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল’-এ।
শাকিলুর রহমান, স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চে সহ নগরপাল হিসাবে কর্মরত।
তপন সাহা, পোর্ট ডিভিশনে সহ নগরপাল পদে কর্মরত।]
তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত
তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত
তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত
তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত…
নয়ের দশকের সেই সুপারহিট গান। লাস্যময়ী রবিনা ট্যান্ডনের লিপে। বাজছে ফুল ভলিউমে। তালে তালে উদ্দাম নাচছেন এক স্বল্পবাস সুন্দরী। যাঁর শরীরী বিভঙ্গের চুম্বক আচ্ছন্ন রেখেছে দর্শকদের। যিনি নাচতে নাচতেই উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দিচ্ছেন মোহিনী ভঙ্গিতে। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছে নিশিবাসর। ঠোক্কর লাগছে গ্লাসে-গ্লাসে। চিয়ার্স! উল্লাস!
ম্যানেজার ব্যস্তসমস্ত তদারকিতে। মধ্য কলকাতার এই বার-কাম-রেস্তোরাঁয় প্রায় দশ বছর হয়ে গেল তাঁর। মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তদেরই ভিড় মূলত এখানে। ‘পুশ-পুল’ লেখা সুইংডোর নেই। এসি নেই। ফটফট করে ইংরেজি-বলা ওয়েটার নেই। যা যা থাকে অভিজাত এলাকার নিশিনিলয়ে, তার কিছুই নেই। তবু শনিবার সন্ধে হলেই স্বল্প পরিসরের এই বার কালো মাথায় টইটম্বুর। রাত ন’টার পর এখানে টেবিল খালি পাওয়া আর রাজ্য লটারিতে ফার্স্ট প্রাইজ়ের মধ্যে তফাত নেই বিশেষ।
—এক মিনিট শুনবেন?
ম্যানেজার ফিরে তাকান প্রশ্নকর্তার দিকে। মধ্যতিরিশের এক সপ্রতিভ যুবক। চোখে রিমলেস চশমা।
—হ্যাঁ বলুন, জায়গা তো এখন দেখছেনই খালি নেই। বাইরে অপেক্ষা করতে হবে।
যুবক হাসেন। গানবাজনা চলছে যা তারস্বরে, হ্যান্ডশেকের দূরত্বেও একে অন্যের কথা শুনতে পাওয়া দুষ্কর। যুবক কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনেন ম্যানেজার ভদ্রলোকের, কিছু একটা বলতে। শোনামাত্র মুখের ভাব বদলে যায় ম্যানেজারের। দ্রুতপায়ে পৌঁছে যান বারের এক প্রান্তের কাঠের পাটাতনের কাছে। যেখানে কোমর দোলাচ্ছেন সুন্দরী যুবতী, গানের সঙ্গে সঙ্গত করতে বসে আছেন বাদ্যযন্ত্রীরা।
গানটা শেষ হওয়ার যা অপেক্ষা। যুবতীর কানে ফিসফিস করেন ম্যানেজার। ত্রস্ত পায়ে মঞ্চ থেকে নেমে আসেন যুবতী। স্বল্পবেশেই বেরিয়ে আসেন বাইরে। চশমা-পরা যে যুবক একটু আগে ম্যানেজারকে কানে কানে কিছু বলার পরই এইসব, তিনিও ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছেন বাইরে। এবং তাঁর পাশে উদয় হয়েছেন শক্তসমর্থ চেহারার আরও চারজন। যাঁদের মধ্যে দু’জন মহিলা।
সোজাসুজি নির্দেশ জারি করেন রিমলেস চশমার যুবক, নর্তকী যুবতীর চোখে চোখ রেখে।
—আপনাকে একবার আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।
যুবতী হতভম্ব। বিস্ময়ের ঘোর কাটতে সময় লাগে একটু।
—মানে? যেতে হবে মানে? কোথায় যেতে হবে? আপনারা কারা? কোথা থেকে আসছেন?
—লালবাজার।
.
.৩৮ রিভলভার। লোডেড। বুশ শার্টের নীচে কোমরে গোঁজা রয়েছে ওঁদের।
‘ওঁদের’ মানে ওঁদের আটজনের। উর্দি পরে আসেননি কেউই। সবাই প্লেন ড্রেসে আজ।
ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার আগে চোখাচোখি হয় ওঁদের। শুধু চোখাচোখিই। কথা হয় না কোনও। যা কথা হওয়ার, হয়ে গেছে আগে। কী কথা?
ঘরের ভিতর যারা আছে, তারা অত্যন্ত মারাত্মক প্রকৃতির। বেপরোয়া। সামান্যতম বিপদের গন্ধ পেলেই ধুমধাড়াক্কা গুলি চালাবে। বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। তেমন বুঝলে সঙ্গে সঙ্গে পালটা গুলি চালাতে হবে। ঘরে ঢোকার এবং বেরনোর এই একটাই রাস্তা। অনেক ভুগিয়েছে এরা। হাড়মাস কালি করে দিয়েছে। যা-ই হয়ে যাক, পালাতে দেওয়া যাবে না। হয় এসপার, নয় ওসপার।
মাঝরাত পেরিয়ে ঘড়িতে প্রায় তিনটে। এমন একটা সময়, যখন স্ট্রিট লাইটগুলো পর্যন্ত সামান্য স্তিমিত। ঢুলছে। এমন একটা সময়, যখন রাস্তার কুকুরগুলোও সাময়িক স্থগিত রেখেছে অপরিচিত আগন্তুক দেখলেই ‘ঘেউ ঘেউ’। জিরিয়ে নিচ্ছে দু’দণ্ড। পাড়া জাগিয়ে চিলচিৎকার করার সময় পরে অনেক পাওয়া যাবে।
