কেন সাজিয়ে বলবে? বিচারকের রায়ে যুক্তি, নিহিত স্বার্থের জন্য বলবে। উদয়ের দলের সঙ্গে ব্যবসায়িক শত্রুতা তৈরি হয়েছিল বামার দলের। উদয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের ছেলেদের ফাঁসানোর এই সোনার সুযোগ হাতছাড়া করেনি রঞ্জিত-নিতাই এবং অকুস্থলে উপস্থিত উদয়ের অনুগামীরা। এদের বয়ানের উপর কোনওভাবেই নির্ভর করা চলে না। উদয়কে মেরেছে অন্য কোনও দল, অন্য আততায়ীরা। বামার দল নয়। আর, উদয়ের যা পূর্বইতিহাস, শত্রুসংখ্যা অনেক হওয়াটাই স্বাভাবিক। খুনের মামলা চলছে এখনও উদয়ের নামে। এই লোক অনেকেরই টার্গেট হতে পারে। রঞ্জিত নিজের ভাই, আর নিতাই বহু বছরের কর্মী। প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে এদের সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়।
দোসার দোকানের কর্মচারী বাচ্চু বিচারপর্বে ‘hostile witness’-এর (বিরূপ সাক্ষী) ভূমিকা নেওয়ায় ‘সাজানো গল্পের’ তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে সুবিধে হয়েছিল বিচারকের। বাচ্চু পুলিশকে বলেছিলেন, অভিযুক্তদের দেখলে চিনতে পারবেন। Test Identification Parade-এ বেমালুম অস্বীকার করেছিলেন বামা-টুটিদের চিনতে। অতনু অনেক পরে জানতে চেয়েছিলেন এই ভোলবদলের কারণ। বাচ্চু করজোড়ে জানিয়েছিলেন, ‘উপায় ছিল না স্যার। সাক্ষ্য দেওয়ার আগের দিন বামার দলের ছেলেপুলেরা বাড়িতে এসে বলে গিয়েছিল, “কোর্টে উলটোসিধে বললে বাড়ি জ্বালিয়ে দেব।”’
কিন্তু গণপিটুনিতে রিভলভার সমেত বাদলের আহত হওয়া? এসএসকেএম-এর ডাক্তারের কাছে দেওয়া বয়ান, ‘আমাকে ধাওয়া করে প্রচণ্ড মেরেছে কিছু লোক।’ নস্যাৎ করে দেওয়া হল রায়ে। বলা হল, পুরোটা পুলিশ বানিয়েছে। না হলে পুলিশ বাদলের গণপিটুনির ব্যাপারে একজনও প্রত্যক্ষদর্শীকে আদালতে হাজির করাতে পারল না কেন? বাদল যেটা বলেছে বিচারপর্বে, সেটাই বরং বিশ্বাসযোগ্য। কী? না, পুলিশ কেস সাজাতে বাদলকে তার বাড়ি থেকে তুলে এনে মারধর করে রিভলভার গুঁজে দিয়েছে। ডাক্তারের কাছে কী বয়ান দিতে হবে, সেটা শিখিয়েছে। কথা না শুনলে পুরো পরিবারকে মিথ্যে কেসে জড়িয়ে দেবে বলে শাসিয়েছে। আসলে বাদল স্পটে ছিলই না। বামা-পটা-টুটিও ছিল না।
তা হলে কারা মারল উদয় আর নরেশকে? বিচারকের জবাব তৈরিই ছিল রায়ে। এক ভদ্রলোকের সেলুন ছিল ঘটনাস্থলের ফুটবিশেক দূরে। চার্জশিটে তাঁকে সাক্ষী করেছিলেন অতনু। জেরার সময় অভিযুক্তদের আইনজীবী প্রচুর প্রশ্ন করেছিলেন নেহাতই সাদাসিধে সেলুনমালিককে। যার একটা ছিল, ‘বোমের আওয়াজ শুনেছিলেন যখন, তারপর কোনও গাড়ি যেতে দেখেছিলেন সেলুনের পাশ দিয়ে?’ কত গাড়িরই তো যাতায়াত ওই রাস্তা দিয়ে প্রতি মিনিটে। উত্তরে ভদ্রলোক বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, গাড়ি তো গিয়েছিল একটা বোমের আওয়াজ শোনার পর।’
কিমাশ্চর্যম, সব বাদ দিয়ে শুধু এই সাক্ষ্যকেই হাতিয়ার করে বিচারক রায়ে লিখলেন, আসলে অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা গাড়ি করে এসে বোমা মেরে পালিয়েছে। মিথ্যে কেস সাজিয়ে অভিযুক্তদের ফাঁসানোর অপচেষ্টার জন্য ভর্ৎসনা প্রাপ্য তদন্তকারী অফিসারের।
সুতরাং, ‘after considering all the evidences, oral and documentary, I am of the view that prosecution has failed to prove that the accused persons have committed the murder beyond reasonable doubt.’ বামা-পটা-টুটি বেকসুর খালাস। শাস্তি শুধু বাদলের, অস্ত্র আইনে। মাত্র দু’বছরের কারাদণ্ড।
অতঃপর বেকসুর খালাস, আলিপুর কোর্টে আবির-উৎসব এবং বাক্রুদ্ধ অতনুর প্রতি যথেচ্ছ শ্লেষ-বিদ্রুপ-কটাক্ষ। লালবাজার ‘ফুটে ফুলকপি!’
এতটাই হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলেন অতনু, প্রায় ডিপ্রেশনে চলে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। সাহস জুগিয়েছিলেন নগরপাল স্বয়ং, সিদ্ধান্ত হয়েছিল রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যাওয়ার। ফের শুরু হয়েছিল লড়াই। যে লড়াইয়ে ফের ধৈর্য বন্ধক রাখতে হয়েছিল, যে লড়াই স্থায়ী হয়েছিল প্রায় পাঁচ বছরের কাছাকাছি। শেষমেশ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ একত্রিশ পাতার রায়ে তুলোধোনা করেছিলেন নিম্ন আদালতের রায়কে। স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আগের রায় ছিল প্রভাবিত এবং পূর্বনির্ধারিত, ‘and we believe it will not be unfair on our part if we bring on record that appreciation of evidence done by the learned Judge was, in fact, perverse and in a preconceived manner’… বদলে গিয়েছিল রায়। অতনুর যুক্তিজাল পূর্ণ সমর্থন পেয়েছিল হাইকোর্টের বিচারকদের। যাবজ্জীবন কারাবাসে দণ্ডিত হয়েছিল চার অভিযুক্ত।
হাইকোর্টের রায় বেরিয়েছে একটু আগে। অতনু বেরিয়ে আসেন আদালত চত্বর থেকে। পৌনে পাঁচটা বাজে। বিকেল একটু একটু করে সন্ধেকে জায়গা করে দিচ্ছে ড্রেস রিহার্সালের। গাড়ি ছেড়ে দেন অতনু। কতটাই বা দূরত্ব হাইকোর্ট থেকে লালবাজারের? মাথাটা হালকা লাগছে বহুদিন পর। হাঁটা যাক আজ। বেরনোর মুখে শুনেছেন, অভিযুক্তদের আইনজীবী বলছেন সদম্ভে, সুপ্রিম কোর্টে যাবেন। সে যান। আইনের উপর ভরসা ফিরে এসেছে আজকের রায়ে। যাক না ওরা সুপ্রিম কোর্টে, যাক না!
সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ সহমত পোষণ করেছিল হাইকোর্টের রায়ের সঙ্গে। ফের সমালোচিত হয়েছিল নিম্ন আদালতের বিচার।
