অক্লান্ত পরিশ্রমে তিন মাসের মধ্যেই চার্জশিট পেশ করেছিলেন অতনু। রঞ্জিত-নিতাই-কল্যাণ-বোম্মাইয়া প্রত্যক্ষদর্শী ছিল খুনের। ঘটনাস্থলের পাশেই ছিল দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের একটা দোকান। সেই দোকানের কর্মী বাচ্চুও দেখেছিল ঘটনাটা। ঘটনাস্থলের কাছেই আগ্নেয়াস্ত্র সহ বাদলের গণপিটুনিতে আহত হওয়ার প্রমাণ তো ছিলই।
উদয়ের সঙ্গে অভিযুক্তদের পুরনো শত্রুতা এবং অফিসে এসে হুমকির উল্লেখ ছিল চার্জশিটে, মোটিভ এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হিসেবে। অনেক জটিল খুনের মামলার তদন্তের অভিজ্ঞতা ছিল অতনুর। সে তুলনায় এটা ছিল ঢের বেশি সরল, সোজাসাপটা। চার্জশিট জমা দেওয়ার সময় ভেবেছিলেন, কনভিকশন নিশ্চিত। ভুল ভেবেছিলেন।
তদন্তপ্রক্রিয়া একটা বৃত্তের মতো। যে বৃত্তের তিনটে অংশ। প্রথম, ঘটে যাওয়া অপরাধ। দ্বিতীয়, অপরাধটা কীভাবে ঘটল, কেন ঘটল, কে ঘটাল, তার অনুসন্ধান। এবং অপরাধীকে চিহ্নিত করা। লিখলাম বটে ‘অপরাধী’, আসলে তো অভিযুক্ত। যতক্ষণ না আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে ধৃত, অভিযুক্তের গায়ে তকমা লাগানো যায় না অপরাধীর। এখানেই বৃত্তের তৃতীয় অংশের প্রবেশ। সাক্ষ্যপ্রমাণ একত্রিত করে পেশ করা চার্জশিট। এবং বিচারপর্বের চাপানউতোর।
আদ্যন্ত রসকষহীন এই তৃতীয় অংশটা। তদন্তপর্বে পুলিশের কাছে বয়ান দেওয়ার সময় যে যা বলেছিলেন, বিচারপর্বে তার অর্ধেকের বেশি সাধারণত মনেই থাকে না সাক্ষীর। কারণ, পুলিশকে বয়ান আর আদালতে সাক্ষ্যদানের মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকে অনেক। দু’-তিন বছর গড়িয়ে যায় কখনও কখনও, কখনও তার ঢের বেশি। বিচারের সময় যখন দিন ধার্য হয় কোনও সাক্ষীর সাক্ষ্যদানের, তদন্তকারীকে খেয়াল রাখতে হয়, দুই বয়ান যেন মিলে যায় হুবহু, অসংগতি যেন না থাকে। মনে করিয়ে দিতে হয়, ‘তখন আমাদের এই বলেছিলেন।’ আগাগোড়াই যোগাযোগ রাখতে হয় সাক্ষীদের সঙ্গে। সে যে যেখানেই থাকুন।
আরও ঝক্কি আছে হাজার। চার্জশিট জমা করার সময় যে সাক্ষীদের সত্যনিষ্ঠ মনে হয়, তাদেরই কেউ কেউ বিচারপর্বে উলটো গাইতে শুরু করে, প্রভাবিত হয়ে পড়ে তদন্ত আর বিচারের মধ্যবর্তী সময়ে। এমনও দেখেছি আমরা, চার্জশিট দেওয়া আর সাক্ষ্যদান শুরু হওয়ার মধ্যে মূল সাক্ষীর সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেছে প্রধান অভিযুক্তের বোনের। এখন সাক্ষী যে শ্যালকের বিরুদ্ধে বিরূপ সাক্ষ্য দেবে না, জানা কথাই।
গোদের উপর বিষফোড়া হয়ে দেখা দেয় পদ্ধতিগত বিলম্ব। যে ডাক্তার কলকাতায় পোস্টমর্টেম করেছিলেন ঘটনার পর, তিনি হয়তো মাঝের বছরগুলোয় বদলি হয়ে গেছেন প্রত্যন্ত কোনও জেলায়, আসতে পারলেন না সাক্ষ্যদানের নির্দিষ্ট দিনে। পরের দিন ধার্য হল মাসদুয়েক পরে। আর, জটিল মামলায় সাক্ষীর সংখ্যা তো থাকে ন্যূনতম পঞ্চাশ-ষাট। প্রত্যেকের সাক্ষ্য, বাদী-বিবাদী পক্ষের উকিলের জেরা… সময় লাগে। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। বস্তুত, বছরের পর বছর যায়। ধৈর্যের ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙতে ভাঙতে পুঁজি একসময় তলানিতে এসে ঠেকে।
তবু মাঠ ছাড়া যায় না। পুরো প্রক্রিয়াটায় লেগে থাকতে হয় শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত। কিনারার কেরামতি অর্থহীন, যদি না দোষী সাব্যস্ত করা যায় অপরাধীকে। বিচারে যদি ছাড়া পেয়ে যায় অভিযুক্ত, দিনের শেষে হাতে পেনসিলও পড়ে থাকে না। ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায়, প্রি-টেস্টে স্টার মার্কস, টেস্টে সব সাবজেক্টে লেটার, কিন্তু মাধ্যমিকে গিয়ে কম্পার্টমেন্টাল।
.
৩০ অগস্ট, ২০০১, যেদিন রায় বেরবে।
আদালত চত্বরে ঢুকেই খটকা লাগে অতনুর। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা একদল যুবকের জটলা এজলাস কক্ষের বাইরে। চেহারায় উগ্রতা, হইহই আড্ডা দিচ্ছে অভিযুক্তদের আইনজীবীর সঙ্গে। বুঝতে অসুবিধে হয় না, এরা বামার আশ্রয়পুষ্ট খুচরো মস্তান। সে হোক, কিন্তু এত ফুর্তি কীসের, আর এত সাজগোজের ঘটাই বা কেন? শাস্তি যাদের আসন্ন, তাদের কাছের লোকদের মুখ চুন করে আদালতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এসেছেন এতদিন। আজ উলটপুরাণ?
কেন ফুর্তি, কেন সাজগোজ, রায়দান শুরু হতেই বুঝতে পারেন অতনু। হতভম্ব হয়ে যান দেখে, আটের দশকের সেই দুই কুখ্যাত পাকিস্তানি আম্পায়ার শাকুর রানা আর খিজার হায়াতকেও লজ্জা দিচ্ছে বিচারকের বক্তব্য। অভিযুক্তদের পক্ষে যিনি যুক্তিজাল সাজাচ্ছেন দৃষ্টিকটু রকমের একপেশে।
গুলিই যদি চলেছিল, কার্তুজের খোল পাওয়া গেল না স্পটে? এই দিয়ে শুরু। সওয়াল-জবাবের সময়ও এ প্রশ্ন উঠেছিল। সরকারি আইনজীবী বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, খোল পাওয়া যায়নি, ঠিকই। কিন্তু তা থেকে গুলি চলেইনি, এটা ভাবা সরলীকরণ হবে। ওইরকম জনবসতিপূর্ণ জায়গা। বোমা-গুলি চলার অন্তত আধঘণ্টা পর পুলিশ এসেছে। আগে গণ্ডগোল সামলেছে। ঘটনার দেড়-দু’ঘণ্টা পরে ভাল করে দেখতে পেরেছে ঘটনাস্থল। যেখানে কমপক্ষে দু’-তিনশো লোক আসা-যাওয়া করেছে তার আগে। খোল কার পায়ের ধাক্কায় কোথায় ছিটকে পড়েছে হয়তো। পাওয়া যায়নি। হতেই তো পারে, অসম্ভব কি?’ রায়ে বিচারক উড়িয়ে দিলেন সেই যুক্তি। লিখলেন, ঘটনায় আদৌ ব্যবহৃতই হয়নি আগ্নেয়াস্ত্র। পুরোটাই সাজিয়ে বলেছে প্রত্যক্ষদর্শীরা।
