—স্যার, বামার ছেলেরা মেরেছে। বামা, বাদল, পটা আর টুটি, চারজনকে স্পষ্ট দেখেছি। এল, আর বোম মারতে শুরু করল ভাইয়াকে লক্ষ্য করে। গুলিও চালাল।
বামা, পটা, টুটি। এদের আসল নাম জানতে চেয়ে লাভ নেই। অতনু বোঝেন, বলতে পারবে না এরা। জেনে নিতে হবে থানার রেকর্ড থেকে, নিশ্চয়ই দু’-চারবার ধরা পড়েছে আগে। তা ছাড়া মস্তানদের তো এরকমই নাম হয়। মা-বাবার দেওয়া ভাল নামটা নিজেরাই ভুলে যায় এরা একটা সময়। নাম হয়তো গোপালচন্দ্র অমুক। পরোটা ভেজে বিক্রি করত। কোনও একটা ঝামেলায় পরোটা ভাজার তাওয়া দিয়েই মাথায় মেরে খুন করেছিল কাউকে। সেই থেকে নাম ‘পরোটা গোপাল’। কিংবা ধরুন, নাম ছিল হরেন্দ্রনাথ তমুক। বোম বাঁধতে গিয়ে বিস্ফোরণে একটা চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অনিবার্য নামকরণ, হাফচোখো হরেন। কিংবা কোনও না কোনও বিচিত্র সংযোগে কারও না কারও নাম ‘বোম বিশু’, ‘ত্যাবড়া তপন’, ‘উল্লু রাজু’। অথবা, গালকাটা গদাই, কানকাটা কানাই, বা হাতকাটা দিলীপ।
থানার নথিপত্র থেকে জানা গেল ভাল নামগুলো। প্রণব নাগ ওরফে বামা, খিদিরপুর এলাকারই হরিসভা লেনের বাসিন্দা। শংকরসুন্দর দত্ত ওরফে টুটি, বাড়ি খিদিরপুরেই। শুভাশিস মুখার্জি ওরফে পটা, স্থানীয় যুবক।
বাদল চিকিৎসাধীন এসএসকেএম-এ। পটা-টুটি-বামা, তিনজনের বাড়িতেই রেইড করা হল। জানাই ছিল, থাকবে না কেউ। পাওয়া গেল না। সোর্স লাগানো হল একাধিক। এলাকার বিভিন্ন ঠেকে সাদা পোশাকে নজরদারি শুরু করলেন গুন্ডাদমন শাখার অফিসাররা। তিনজনই স্থানীয় মস্তান। যত দাদাগিরি, এলাকাতেই। আজ নয় তো কাল, পরশু নয় তরশু, ফিরবেই মহল্লায়। যাবে কোথায়?
যা ভাবা গিয়েছিল, তাই। টুটি এবং পটা ধরা পড়ল ঘটনার দিন পনেরো পর, ২২ ডিসেম্বর। হাওয়া এখনও কতটা গরম, সেটা বুঝতে গভীর রাতে দু’জনে ঢুকেছিল গার্ডেনরিচ এলাকায়। গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এর পিছনে এক গোপন ডেরায় মদের বোতল খুলে বসার আধঘণ্টার মধ্যে খবর চলে এসেছিল সোর্স মারফত। যে রিভলভার দিয়ে পটা গুলি চালিয়েছিল খুনের দিন, সেটা উদ্ধার হল। নিজের বাড়ির কাছেই একটা পুকুরের ধারে পুঁতে রেখেছিল। বাকি ছিল প্রণব ওরফে বামা। জালে উঠল মাঝেরহাট এলাকা থেকে, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই। ’৯৮-এর জানুয়ারি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া মাত্রই হেফাজতে নেওয়া হল বাদলকে। সম্পন্ন হল গ্রেফতারি-পর্ব।
খুনের কারণ? জেরায় জানা গেল, বামার নেতৃত্বে পটা-টুটি-বাদল এবং আরও বেশ কয়েকজন যুবক বছরখানেক হল নিজেদের ‘গ্যাং’ তৈরি করেছিল। যে ‘গ্যাং’-এর মূল উদ্দেশ্যই ছিল, উদয়ের একচ্ছত্র রাজ্যপাটে ভাগ বসানো। মাসছয়েক আগে পোর্টের মালপত্র সরবরাহের একটা বড় অঙ্কের টেন্ডার হয়। এসব টেন্ডারে উদয়ের অর্ডার পাওয়াটা নিয়মে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল এতদিন। নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়েছিল বামা-বাহিনী। তারাও টেন্ডার ফর্ম তুলেছিল, সমানে-সমানে লড়েছিল। অর্ডার শেষ পর্যন্ত উদয়ের টিমই পেয়েছিল, কিন্তু গোকুলে যে প্রতিদ্বন্দ্বীরা বেড়ে উঠছে, সে ইঙ্গিত পেয়ে গিয়েছিলেন ‘উদয় ভাইয়া’। সে-রাতেই উদয় স্বয়ং দলবল নিয়ে বামার বাড়ি গিয়ে শাসিয়ে এসেছিলেন, ‘এই দুঃসাহস যেন আর না হয়!’
ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, আরও ঘোরতর দুঃসাহস দেখিয়েছিল পটা-টুটি-বাদলরা। পরদিন বিকেলে, উদয় তখন অফিসে অনুপস্থিত, সদলবলে হানা দিয়েছিল রামকমল স্ট্রিটে। অফিসে যারা ছিল, তাদের সামনে পিস্তল উঁচিয়ে হুমকি দিয়েছিল, ‘ভাইয়াকে বলে দিস, সে জমানা আর নেই। তোরা থাকলে আমরাও থাকব। কে কবে মাছের চারা ছাড়বে, তার ভরসায় পুকুর কাটব না, বলে দিস।’
এ হুমকির পালটা প্রত্যাঘাত কেন উদয় করেননি, শক্তির বিচারে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও, আন্দাজ করতে পেরেছিলেন অতনু। মারপিট-খুনজখমে জড়িয়ে ফের পুলিশি ঝামেলায় পড়তে চাননি। লোক লাগিয়ে শায়েস্তা করতে পারতেন বামাদের, ইচ্ছে করলেই। করেননি, কারণ, জানতেন, শেষ পর্যন্ত নাম জড়াবেই। অন্য চাল চেলেছিলেন। নিজে থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়ে এসেছিলেন পটাদের নামে। যে খবর আরও খেপিয়ে তুলেছিল বামা-পটার দলবলকে।
চাপা টেনশন একটা ছিলই। যা তুঙ্গে উঠেছিল দিনদশেক আগে। উপলক্ষ, আরেকটা টেন্ডার। দু’পক্ষই ফর্ম জমা দিয়েছিল। কিন্তু বামা-পটা খবর পেয়েছিল, উদয় পোর্ট ট্রাস্টের উপরমহলে কলকাঠি নেড়েছেন। যার ফলে বামাদের জমা দেওয়া ফর্ম বাতিল হতে চলেছে টেকনিক্যাল কারণ দেখিয়ে। ফের বামা-পটা-টুটি-বাদল সটান উদয়ের অফিসে গিয়েছিল। এবারও এমন একটা সময়ে, যখন উদয় অফিসের বাইরে। অ্যাকাউন্ট্যান্টের কপালে রিভলভার ঠেকিয়ে বামা ঠান্ডা গলায় বলেছিল, ‘আমাদের টেন্ডার যদি বাতিল হয়ে যায়, তোর ভাইয়াকেও পেতে দেব না। পরেরবার যখন আসব, চেম্বার খালি করে দিয়ে যাব, মনে রাখিস।’
উদয় শুনেছিলেন সব, খুব গুরুত্ব দেননি। ভেবেছিলেন, রক্ত গরম, তাই ছেলেগুলো একটু বেড়ে খেলছে। থানায় ফের ডায়েরি করিয়েছিলেন নিতাইকে দিয়ে। পুলিশ রেইড করেছিল বামার গ্রুপের প্রত্যেকের বাড়িতে। পায়নি কাউকেই। সেই রেইডের সাতদিনের পরই দুঃসাহসিক উদয়-হত্যা।
