তারপর মাৎস্যন্যায়। ছোট মাছ যে ‘বড়’ হয়ে গেছে, সেটা বড় মাছ যতক্ষণে বুঝতে পারে, ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে বেশ খানিকটা। শুরু হয়ে গেছে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর। যেখানে দয়ামায়ার জায়গা নেই, নেই নীতিনিয়মের বালাই। আছে শুধু ‘জোর যার, মুল্লুক তার’-এর আপ্তবাক্য। রামগোপাল বর্মার ‘কোম্পানি’ সিনেমার সেই গানটাই এ দুনিয়ার রিংটোন, ‘সব গন্দা হ্যায় পর ধান্দা হ্যায় ইয়ে’।
সিনেমা এক, আর বাস্তব আরেক। তবে এটা স্বীকার্য, ফিলমের প্রয়োজনে আমদানি করা নাটকীয়তার উপাদানগুলো বাদ দিলে বাস্তবের উদয়দের উত্থানের চিত্রনাট্যও মোটামুটি একই রাস্তা ধরে পথ হাঁটে। পুলিশ রেকর্ডস ঘেঁটে উদয়ের কোনও ‘গডফাদার’-এর খোঁজ অতনু পেলেন না বটে, কিন্তু একটা রেখচিত্র পাওয়া গেল আটের দশকের মাঝামাঝি থেকে বন্দর এলাকার অপরাধজগতে উদয়ের উল্কাসদৃশ উত্থানের।
গার্ডেনরিচ এলাকায় তুমুল মারদাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ে বাইশ বছর বয়সে প্রথম হাজতদর্শন। বছরখানেকের মধ্যেই দোলের দিন ক্লাবে-ক্লাবে মারামারি আর বোমাবাজিতে নেতৃত্ব দিয়ে ফের শ্রীঘরে কিছুদিন। জামিন পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের এক শ্রমিকনেতাকে ভরদুপুরে গুলি করে খুনের চেষ্টা। চেষ্টা নয়, সরাসরি খুনই এর বছরখানেক পরে। দেড় বছর হাজতবাসের পর জামিনে মুক্তি, প্রভাব খাটিয়ে মামলাকে সময়ের হিমঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া। ক্রমে ঢুকে পড়া লোহার ছাঁটের সিন্ডিকেটে, বাহুবলে কায়েম করা দাদাগিরি, হু হু করে সংখ্যা বেড়ে যাওয়া অনুগামীর, এবং উদয় সিং থেকে ‘উদয় ভাই’ হয়ে ওঠা। হিন্দি ছবির ভাষায়, এলাকার ‘বেতাজ বাদশা’।
লম্বায় প্রায় ছ’ফুট। পাথরে কোঁদা শরীর। চওড়া কপাল, ঝাঁকড়ানো চুল। বারো মাস তিনশো পঁয়ষট্টি দিন একই পোশাক। ধবধবে সাদা শার্ট-প্যান্ট। এক কথায়, নায়কোচিত চেহারা ছিল উদয়ের। আর ছিল পোর্ট ডিভিশনের নিম্নমধ্যবিত্ত এলাকায় ‘রবিনহুড’ ইমেজ। মেয়ের বিয়ের টাকা জোগাড় হচ্ছে না, দরিদ্র পিতা শরণাপন্ন হতেন ‘উদয় বেটা’-র। সম্পন্ন বাড়িওয়ালা মস্তান লাগিয়ে উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে, নিরীহ ভাড়াটিয়ার মুশকিল আসান বলতে তখন ‘উদয় ভাইয়া’। পুজোর বিচিত্রানুষ্ঠানে বোম্বের শিল্পী আনার টাকা জোগাড় হচ্ছে না, ভরসার ঠিকানা সেই ‘উদয় ভাই’। যে দু’-চারটে ফোন করলেই স্থানীয় শিল্পপতিরা টাকার থলি নিয়ে হাজির। এবং পুজোয় দেদার নাচাগানা, ব্র্যাকেটে বোম্বে-মার্কা শিল্পীদের উপস্থিতিতে। জনপ্রিয়তায় বন্দর মহল্লায় একজনই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল উদয়ের। উদয় নিজে।
একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর পুলিশ এবং আইনকে এড়াতে উদয়দের মতো লোকের প্রয়োজন পড়েই সামাজিক আব্রুর। সে আব্রু কখনও সরবরাহ করে থাকে ব্যবসাদারের পরিচিতি, কখনও-বা রাজনীতিকের মোড়ক। উদয় প্রথমটা বেছেছিলেন। বাড়ি কিনেছিলেন ১/১ রামকমল স্ট্রিটে। পাশেই আরেকটি দোতলা বাড়ির উপরটা ভাড়া নিয়ে ব্যবসায়িক সংস্থার অফিস খুলেছিলেন। নাম ‘বিকি এন্টারপ্রাইজ’। রঞ্জিতের অফিসও ওখানেই ছিল, ‘মা তারা এন্টারপ্রাইজ’। রঞ্জিত ঝুটঝামেলায় থাকা পছন্দ করতেন না। সোজা পথে ব্যবসা করতেন।
উদয়ের ব্যবসা ইমারতির। বাড়ি তৈরির মালমশলা সাপ্লাইয়ের। সকাল দশটায় রোজ অফিস খোলে, ঝাঁপ পড়ে যায় সন্ধে সাতটা নাগাদ। উদয়কে অষ্টপ্রহর ঘিরে থাকে নরেশ-কল্যাণ-বোম্মাইয়ারা। দিনভর লেগে থাকে লোকের ভিড়। সবাই জানে অলিখিত নিয়মটা, এলাকায় বাড়ি তৈরি করতে গেলে ইট-বালি-সিমেন্ট উদয়দের থেকেই নিতে হবে। যার ঘাড়ে মাথা থাকবে না নেওয়ার, তার বাড়িই উঠবে না। বাংলা হিসেব।
ফুলেফেঁপে উঠেছিলেন উদয়। লোহার ছাঁটের নিলামেও কায়েম রেখেছিলেন একাধিপত্য। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের থেকে তোলাবাজির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত তো ছিলই। কারও সাহস ছিল না পুলিশে অভিযোগ করার। পুলিশের কিছু আইনত করারও ছিল না উদয়ের ব্যাপারে, যতক্ষণ না জমা পড়ছে লিখিত অভিযোগ, যতক্ষণ না উদয় নতুন করে সরাসরি জড়াচ্ছেন মারদাঙ্গায়। উদয় বুদ্ধিমান ছিলেন। ব্যবসার আড়ালেই সব কিছু যখন নির্বিঘ্নে চলছে রক্তপাতহীন, ভালই তো! গত তিন-চার বছরে সবরকম ঝামেলার থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন।
স্ত্রী সমর্থন করতেন না উদয়ের কাজকর্ম। তিতিবিরক্ত হয়ে একটা সময় একমাত্র সন্তানকে নিয়ে উঠে গিয়েছিলেন হাজরার কাছে বাপের বাড়িতে। পরিবার আর ব্যবসা সমার্থক হয়ে গিয়েছিল ঝাড়া হাত-পা উদয়ের কাছে।
তবে ওই যে, ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’। উদয় গত সাত-আট মাস ধরেই খবর পাচ্ছিলেন, এক তরুণ তুর্কির উদয় হয়েছে এলাকায়। ধমকে-চমকে যে তোলাবাজি চালাচ্ছে সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে। একদিন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দল বেঁধে অভিযোগ জানিয়ে গেলেন উদয়ের দরবারে, ‘ভাইয়া, একটু দেখুন। আমরা তো টিকতে পারছি না অত্যাচারে।’ উদয় নড়েচড়ে বসলেন একটু। বোম্বাইয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী নাম রে ছেলেটার? খোঁজখবর নিস তো একটু।’
—নিয়েছি ভাইয়া।
—নামটা কী?
—বামা।
—বামা?
.
অতনুর প্রশ্নের উত্তরে এক মুহূর্তের জন্যও ভাবতে হয় না খুনের প্রত্যক্ষদর্শী রঞ্জিত-গোপাল-কল্যাণ-বোম্বাইয়াদের।
