এ মামলা ডিডি নেবে, জানাই ছিল। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব-ইনস্পেকটর অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডেকে গোয়েন্দাপ্রধান জানিয়ে দিলেন, ‘কেসটা তুমি করছ। ডিটেকশন তো হয়েই গেছে ধরে নাও। অ্যারেস্টগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করার চেষ্টা করো। অতনু, আই ওয়ান্ট আ কুইক চার্জশিট, অ্যান্ড কনভিকশন অ্যাট এনি কস্ট।’
—রাইট স্যার।
অতনু মাথা নেড়ে বেরিয়ে আসেন ঘর থেকে। আপাতত প্রথম কাজ, উদয় সিং-এর ঠিকুজিকুষ্ঠি একটু ঝালিয়ে নেওয়া। অপরাধজগতের পরিচিত নাম, গুন্ডাদমন শাখায় খুঁজলেই পুরনো রেকর্ড পাওয়া যাবে নিশ্চিত।
.
উদয় সিং। তিন ভাইয়ের মধ্যে মেজো। সংগ্রাম-উদয়-রঞ্জিত, তিন ছেলেকে নিয়ে বছর পঁচিশ আগে বাবা ছোটু সিং উত্তরপ্রদেশ থেকে কলকাতায় চলে এসেছিলেন জীবিকার খোঁজে। ছোটু কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টে কাজ জুটিয়ে নিয়েছিলেন ঠিকাশ্রমিকের।
তিন ছেলেকে ভরতি করে দিয়েছিলেন স্কুলে। সংগ্রামের পড়াশুনো বেশিদূর এগোয়নি। রঞ্জিত তুলনায় বেশি মনোযোগী ছিল লেখাপড়ায়। উদয়ের অবশ্য তীব্র বিরাগ ছিল বইখাতার প্রতি। পাড়া-বেপাড়ায় ফুটবল খেলে বেড়ানো, সন্ধেবেলায় গঙ্গার পাড়ে বসে বিড়ি-সিগারেট-চোলাই আর পয়সাকড়ি জুটিয়ে এলাকার সিনেমা হলে নুন শো-য় অ্যাডাল্ট ফিলমের আঁচ পোহানো, মোটামুটি এই ছিল উদয়ের কিশোরবেলা।
বড়ছেলে সংগ্রামের বয়স যখন বছর কুড়ি-বাইশ, পরিচিত একজনকে বলেকয়ে ফ্যান্সি
মার্কেটের একটা দোকানে হেল্পারের কাজে লাগিয়ে দিলেন ছোটু সিং। বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিছু তো কাজকর্ম করুক। সে মাইনে যত কমই হোক। সংগ্রাম ক্রমশ টাকা জমিয়ে বছরকয়েকের মধ্যে ফ্যান্সি মার্কেটে একটা দোকান চালু করলেন। নিজের মতো থাকতেন। ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না বিশেষ।
উদয়ের জন্যও ছোটু সিং কাজ দেখলেন গুলমোহর ঘাটের ফুলপট্টিতে। সাপ্লাই যখন আসবে, ট্রাক থেকে দোকানে মাল নামানোর কাজ। উদয় কাজে গেল সুবোধ বালকের মতো। সন্ধেবেলা বাড়ি বয়ে এসে মালিক জানিয়ে দিয়ে গেল ছোটু সিং-কে, ‘কাল থেকে ওর আর আসার দরকার নেই। পাঠাবেন না।’
—কেন?
—আপনার ছেলে অত্যন্ত বেয়াদব। ফুলের ডালা নামানোর সময় ট্রাকের হেল্পারের সঙ্গে সামান্য কারণে তর্ক করেছে। মা-বাবা তুলে যা-তা গালাগালি দিয়েছে। হেল্পারের গায়েও হাত তুলেছে। ওকে আমি কাজে রাখব না।
ছোটু সিং বিস্তর বকাঝকা করলেন উদয়কে। যে বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না বাবার গালমন্দে। আঠারো বছরের উদয় ততদিনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, এসব দু’পয়সার খালাসির কাজ তার জন্য নয়। কে খাটবে এত ফাইফরমাশ? অনেক বড় মাঠ পড়ে আছে তার খেলার জন্য। খেলার নিয়মগুলো শুধু ভাল করে জেনে নিতে হবে।
‘বড় মাঠ’ বলতে কলকাতা বন্দর। ‘খেলা’ বলতে লোহার ছাঁটের নিলাম। ‘নিয়ম’ বলতে সিন্ডিকেটের প্যাঁচপয়জার। না ছিল পড়াশুনোর বালাই, না ছিল কাজকর্ম কোনও। হাতে যে অঢেল সময় থাকত, তার অনেকটাই উদয় কাটাত ডক-এলাকায়। দেখত অবাক হয়ে, লোহার ছাঁট নিলামের দিনের সপ্তাহখানেক আগে থেকে কীভাবে রাতারাতি বদলে যেত জাহাজের আসা-যাওয়া আর রুটিনমাফিক মাল খালাসের রোজকার শান্ত ছবিটা। এলাকায় টেনশনের গন্ধ পেতে ঘ্রাণশক্তি প্রখর হওয়ার প্রয়োজন পড়ত না।
গলায় চেন, হাতে বালা, শরীরে উল্কি, চোখে রোদচশমা। ষন্ডামার্কা চেহারার যুবকদের বাইক-সফর যেন হঠাৎই বেড়ে যেত এলাকায়, লক্ষ করত উদয়। কখনও আসলাম ভাইয়ের ছেলেরা এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, কখনও জিতেন্দর ভাইয়ের লোকজনকে বাইক নিয়ে দেখা যাচ্ছে যত্রতত্র। বাইক-আরোহীদের কোমরের কাছে যেটা উঁচু হয়ে আছে, সেটা কী, বুঝতে বুদ্ধি খরচ করতে হত না। মেশিন!
যত এগিয়ে আসত নিলামের দিন, রাত বাড়লেই ইতিউতি আওয়াজ পাওয়া যেত বোমাবাজির। গুলিরও। নিলামের পরদিন সব শান্ত হয়ে যেত ভোজবাজির মতো। বন্দর এলাকার প্রতিটা গলিঘুঁজি চেনা হয়ে-যাওয়া উদয় দেখত, কোনও না কোনও জায়গায় মোচ্ছব চলছে যুদ্ধজয়ের। বিদেশি মদের ফোয়ারা ছুটছে। উড়ে যাচ্ছে দেদার মুরগি-মটন। ঝাঁ-চকচকে গাড়ি এসে রাতের দিকে থামছে ঠেকের সামনে। ‘ভাই’-দের গাড়ি। কখনও সে ‘ভাই’-এর নাম আসলাম, কখনও জিতেন্দর, কখনও আনোয়ার, কখনও-বা রামাধীর। আসর জমে উঠছে ফের, সুর আর সুরায়। রাত গভীর হলে হুশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে গাড়ি, ভ্রুমমম শব্দে স্টার্ট নিয়ে ছুটছে বাইকের সারি। কোথায় যাচ্ছে ওরা এত রাতে? কানাঘুষোয় শুনত উদয়, গন্তব্য নাকি সোনাগাছি। যেখানে রাত যত বাড়ে, তত নাকি রঙিন হয় দুনিয়া। সুন্দরীদের মেহফিল বসে।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে উদয় ভাবত, আহ, এই তো জীবন। জিন্দগি হো তো অ্যায়সা!
সিনেমায় যা দেখে থাকি আমরা সচরাচর, এরপর অন্ধকার জগতের মোহে আচ্ছন্ন এই জাতীয় ছেলেরা নজরে পড়ে যায় কোনও এক ‘ডন’-এর, কোনও এক ‘ভাই’-এর। তারপর ক্রমশ নিজের যোগ্যতায় ‘ভাই’-এর বিশ্বাসভাজন হয়ে ওঠা। দায়িত্ব আর ক্ষমতা, দুইয়েরই পরিধি স্বাভাবিক নিয়মে বাড়তে থাকা। এবং একটা পর্যায়ের পর উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিজেই ‘ভাই’ হয়ে ওঠার, তৈরি করে ফেলা নিজস্ব অনুগামীদের বলয়। যার ছত্রছায়ায় বড় হয়ে ওঠা, তাকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া।
